সুন্নাত ও বিদআত

সুন্নাত ও বিদআত

ওয়াহাবীদের বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ হলো ‘বিদআত’। ওয়াহাবী আলেমদের ফতোয়াসমূহ থেকে বোঝা যায় এমন অনেক আমলই যা মুসলমানদের সর্ব সাধারণের কাছে সুন্নাত ও জায়েয বলে পরিগণিত ওয়াহাবীদের পক্ষ থেকে তা বিদআত বলে ঘোষিত হয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো শরীয়তের বিধান বোঝার ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা ও স্থবিরতা। (তাদের গোঁড়ামী ও কূপমণ্ডূকতার কারণেই এক সময় তারা সাইকেলকেও শয়তানের বাহন বলে আখ্যায়িত করেছিল। অবশ্য এখন তাদের আলেমরা সৌদি সরকারের সর্বাধুনিক যানবাহনে আরোহণ করেন এবং তাকে বিদআত বলেন না) তাদের এরূপ চিন্তা-ভাবনার পিছনে বিশেষ কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও থাকতে পারে।
আমরা জানি ইসলামের বিধানসমূহ যা মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে তাকে সহজ শরীয়ত বলে অভিহিত করা হয়েছে। তদুপরি ওয়াহাবিগণ অসংখ্য জায়েয বিষয়কে বিদআতের শ্রেণীতে ফেলে তা হারাম বলে ঘোষণা করেছে। তাই আমরা প্রথমেই সুন্নাত ও বিদআতের সংজ্ঞা ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করব।
শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থে সুন্নাত
সুন্নাত শব্দগতভাবে নিয়ম বা পদ্ধতি অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর বহুবচন হলো সুনান। সুন্নাত শব্দটি পবিত্র কোরআনে আল্লাহর জন্য যেমন ব্যবহৃত হয়েছে তেমনি পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ক্ষেত্রেও এসেছে,যেমন :
سُنَّةَ اللَّـهِ الَّتِي قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلُ  وَلَن تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّـهِ تَبْدِيلًا
“আল্লাহর নীতি পূর্ব হতেই এরূপ (যে,সত্য মিথ্যার উপর বিজয়ী হবে) এবং আল্লাহর নীতিতে কোন পরিবর্তন নেই।”
অন্যত্র বলেছেন : فَقَدْ مَضَتْ سُنَّتُ الْأَوَّلِينَ “(তাদের জন্যও) পূর্ববর্তীদের পথ (পূর্ববর্তীদের জন্য আল্লাহর অনুসৃত রীতি) নির্ধারিত হয়ে গেছে।”
সুন্নাতুল্লাহ্ বা আল্লাহর নীতি বলতে তাঁর গৃহীত প্রজ্ঞাময় রীতি ও পদ্ধতি বোঝানো হয়েছে। আল্লাহর চিরাচরিত নীতি বা রীতি এটাই যে,সময়ের পরিক্রমায় তিনি জাতির পর জাতিকে সৃষ্টি করেন,তাদের উদ্দেশে নবী,ধর্মগ্রন্থ ও শরীয়ত (বিধিবিধান) প্রেরণ করেন,তাদের আল্লাহর আনুগত্যের পথ দেখান এবং এভাবে তাদের পরীক্ষা করেন যাতে করে তারা স্বাধীনভাবে নিজেই নিজের পথকে বেছে নিয়ে ঈমান ও সৎকর্মের পথে অগ্রসর হয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে (আল্লাহর সন্তুষ্টি) পৌঁছতে পারে। কিন্তু পূর্ববর্তী অধিকাংশ জাতির অনুসৃত রীতি এটা ছিল যে,তারা আল্লাহর প্রেরিত নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে অন্যায় ও সীমা লঙ্ঘনের পথ গ্রহণ করত। এভাবে নিজেদের আল্লাহর জন্য একটি নীতির উপযুক্ত করত আর তা হলো আল্লাহর শাস্তির উপযোগী হওয়া। তারা আল্লাহর প্রেরিত নবীদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কারণে আল্লাহর নির্ধারিত আজাবে পরিণত হয়ে ধ্বংস হতো। যেমন আল্লাহ বলেছেন :
وَمَا مَنَعَ النَّاسَ أَن يُؤْمِنُوا إِذْ جَاءَهُمُ الْهُدَىٰ وَيَسْتَغْفِرُ‌وا رَ‌بَّهُمْ إِلَّا أَن تَأْتِيَهُمْ سُنَّةُ الْأَوَّلِينَ أَوْ يَأْتِيَهُمُ الْعَذَابُ قُبُلًا
  “হেদায়েত আসার পর এ প্রতীক্ষাই শুধু মানুষকে বিশ্বাস স্থাপন করতে এবং তাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বিরত রাখে যে,কখন আসবে তাদের কাছে পূর্ববর্তীদের জন্য (আল্লাহর) অনুসৃত রীতি অথবা কখন আসবে তাদের কাছে সরাসরি আজাব।” 

মহানবী (সা.) ও আহলে বাইতের ইমামগণের হাদীসে সুন্নাত শব্দটি দু’টি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে :
ক) কোরআন ব্যতীত যা কিছু মহানবী (সা.) আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের উন্নত জীবনের জন্য এনেছেন। এ অর্থে সুন্নাত একটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ধর্মীয় সকল বিধান-ইবাদত ও লেনদেনসহ যাবতীয় বিধান (ফরজ,মুস্তাহাব,হারাম,মাকরূহ,মুবাহ,চুক্তিসমূহ বৈধ বা অবৈধ হওয়া প্রভৃতি)-এর অন্তর্ভুক্ত।
খ) হাদীসসমূহে সুন্নাত শব্দটি শুধু পছন্দনীয় ও মুস্তাহাব কর্মের ব্যাপারেও ব্যবহৃত হয়েছে।
যদি ‘সুন্নাত’ শব্দটি ‘কিতাব’ শব্দের পাশাপাশি আসে তার অর্থ হলো প্রথমটি। যেমন ইমাম সাদিক (আ.) হতে বর্ণিত হয়েছে :
ما من شیءٍ إلا و فیه کتابٌ أو سُنّةٌ
‘এমন কোন বিষয় নেই যার বিধান ‘কিতাব’ অথবা ‘সুন্নাতে’ বর্ণিত হয় নি।
হাদীসসমূহে ‘সুন্নাত’ শব্দটি দ্বিতীয় অর্থেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন হাদীসে এসেছে- السواک هو من السنّة و مطهرة للفم ‘মিসওয়াক একটি সুন্নাত। তা মুখবিবরকে পরিচ্ছন্ন রাখে।’
অন্যত্র হাদীসে এসেছে-
 من السنّة أن تُصلّی علی محمد و أهل بیته فی کلِّ جمعة ألف مرة
‘এটি সুন্নাত বলে গণ্য যে,প্রতি শুক্রবারে তোমরা এক হাজার বার রাসূল (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের উপর দরূদ পড়বে।’
ফিকাহবিদদের পরিভাষায় সুন্নাত হলো মহানবী (সা.) ও পবিত্র ইমামগণের বাণী (কাওল),কর্ম (ফেল) এবং নীরব সমর্থনের (তাকরীর) বিষয়সমূহ। সকল মুসলমানই মহানবীর নিষ্পাপত্বে বিশ্বাস করে। তাই তাঁর বাণী,কর্ম ও নীরব সমর্থনের সকল বিষয়ই সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু শিয়ারা রাসূলের আহলে বাইতের পবিত্র ইমামগণকেও নিষ্পাপ বলে বিশ্বাস করে সেহেতু তাঁদের বাণী (قول),কর্ম (فعل) এবং নীরব সমর্থনের (تقریر) বিষয়সমূহও সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত মনে করে। কোন বিষয় সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত কিনা তার জন্য দু’টি পথ রয়েছে (১) মুতওয়াতির (বহুল বর্ণিত) হওয়া ও (২) গাইরি মুতাওয়াতির (অপেক্ষাকৃত কম বর্ণিত এবং একক সূত্রে বর্ণিত হাদীসসমূহ)। মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হাদীস হতে মানুষ নিশ্চিত বিশ্বাস লাভ করে যে,তা রাসূল ও ইমামগণ হতে প্রকৃতই বর্ণিত হয়েছে। তাই এরূপ হাদীসের বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। গাইরি মুতাওয়াতির হাদীসসমূহ দু’ভাগে ভাগ করা যায়। কখনো কখনো তার সঙ্গে এমন কিছু সমর্থক ইঙ্গিত থাকে যা মানুষকে হাদীসটি ইমাম হতে বর্ণিত হওয়াকেই প্রতিষ্ঠিত করে। এইরূপ সহায়ক উপাদান বিদ্যমান থাকলে সেরূপ হাদীসও নির্ভরযোগ্য ও পালনীয় বলে গণ্য। কিন্তু যদি কোন হাদীসের সঙ্গে সমর্থনকারী ইঙ্গিত না থাকে ও হাদীসটি ইমাম হতে বর্ণিত হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকে তবে তা নিশ্চিত বর্ণিত বলা যায় না,বরং তা সম্ভাব্য বর্ণিত বলে গণ্য এবং এক্ষেত্রে যদি বর্ণনাকারী ন্যায়পরায়ণ (আদেল অর্থাৎ শিয়া ইমামী নির্ভরযোগ্য রাবী) ও বিশ্বস্ত হয় তবেই শুধু তা গ্রহণযোগ্য হবে।

শাব্দিক অর্থে বিদআত (بِدعَت)
বিদআতের শাব্দিক অর্থ হলো অভূতপূর্ব ও নতুন কোন বিষয়। এ শব্দটি শাব্দিক অর্থে সাধারণত কর্তার পূর্ণতা ও সৃষ্টিশীল বৈশিষ্টের ইঙ্গিতবহ। (بَدِیع) শব্দের অর্থ হলো অভিনব ও নজীরবিহীন,এ শব্দটি যখন মহান আল্লাহর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় তখন তার অর্থ হলো মহান আল্লাহ বিশ্বকে কোন পূর্ববর্তী নজীর ছাড়াই কারো সাহায্য ব্যতীত ও কোন প্রাথমিক উপাদান ভিন্নই সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ তিনি সৃষ্টির ক্ষেত্রে কোন নমুনারই অনুসরণ করেন নি।
বিদআত শব্দটি হাদীস গ্রন্থসমূহে সাধারণত শরীয়ত ও সুন্নাতের বিপরীতে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ এমন কিছু করা যা ইসলামী শরীয়ত ও মহানবী (সা.)-এর সুন্নাতের পরিপন্থী বলে গণ্য। হযরত আলী (আ.) বলেছেন :
إنّما النّاس رجلان متبع شرعة و مبتدع بدعة
অর্থাৎ ‘মানুষ দু’ধরনের : হয় শরীয়তের অনুসারী নতুবা ধর্মের মধ্যে নতুন কিছুর উদ্ভাবক’।
অন্যত্র তিনি মহানবীর নবুওয়াত সম্পর্কে বলেছেন :
إظهر به الشرائع المجعولة و قمع به البدع المدخولة
‘মহান আল্লাহ মহানবীর মাধ্যমে মানব জাতিকে তাদের অজানা ও ভুলে যাওয়া শরীয়তের সাথে পরিচিত করিয়েছেন (অজানা বিধানসমূহকে তাদের সামনে প্রকাশ করেছেন) এবং পূর্ববর্তী শরীয়তসমূহের মধ্যে যে বিদআত ও নব উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ সংযোজিত হয়েছিল তা হতে পরিশুদ্ধ করেছেন।’
অন্যত্র আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) বলেছেন :
ما أحدثت بدعة إلا ترک بها سنّة
‘এমন কোন বিদআতই (নব উদ্ভাবিত বিষয়ই) শরীয়তে প্রবেশ করে নি যার দ্বারা কোন না কোন সুন্নাত উপেক্ষিত ও পদদলিত না হয়েছে।’১০

পারিভাষিক অর্থে বিদআত

ফিকাহ্শাস্ত্রবিদ এবং মুহাদ্দিসগণ বিভিন্নভাবে বিদআতকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এখানে আমরা এরূপ কয়েকটি সংজ্ঞা উপস্থাপন করছি :
১। ইবনে রাজাব হাম্বালী বলেছেন : ‘বিদআত হলো নব উদ্ভাবিত বিষয় যার শরীয়তগত কোন ভিত্তি ও দলিল-প্রমাণ নেই। যদি কোন কিছুর শারয়ী দলিল থাকে তবে তা বিদআত বলে গণ্য নয়,যদিও শাব্দিক অর্থে তা বিদআত হয়ে থাকে।’১১
২। ইবনে হাজার আসকালানী বলেছেন : ‘বিদআত হলো নব উদ্ভাবিত এমন বিষয় যার কোন শরীয়তগত প্রমাণ ও দলিল নেই। যদি শরীয়তে তার সপক্ষে কোন দলিল থাকে তবে তা বিদআত বলে গণ্য হবে না।’১২
৩। সাইয়্যেদ মুর্তাজা বলেছেন : ‘বিদআত হলো ধর্মে কিছু সংযোজন বা বিয়োজন করে তাকে ধর্মের সাথে সম্পর্কিত করা।’১৩
৪। আল্লামা মাজলিসী বলেছেন : ‘শরীয়তের ক্ষেত্রে বিদআত হলো এমন বিষয় যা রাসূলের মৃত্যুর পর ধর্মে সংযোজন করা হয়েছে এবং এর সপক্ষে কোন প্রমাণ কোরআন ও সুন্নাহয় নেই। তবে তা সাধারণ কোন বিষয়ের অন্তর্র্ভুক্ত হলে বিদআত হবে না।’১৪
হাদীসশাস্ত্র ও ফিকাহবিদদের বর্ণিত সংজ্ঞাসমূহ হতে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে,বিদআত পারিভাষিক অর্থে ধর্মে কোরআন ও সুন্নাহর দলিল ব্যতিরেকে কোন নতুন বিধান সংযোজন বা বিয়োজন।
সুতরাং এমন কোন বিষয় (বাণী ও কর্ম) যার শরীয়তে পূর্ব নজীর নেই কিন্তু কোরআন ও সুন্নাহয় তার সপক্ষে দলিল-প্রমাণ রয়েছে অথবা তার ইঙ্গিত রয়েছে তবে তা বিদআত বলে গণ্য হবে না। যদিও মুজতাহিদ কোরআন ও সুন্নাহ হতে বিধান বের করতে ভুল করে থাকেন এবং হাদীস হতে সঠিক অর্থ উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হয়ে থাকেন। কারণ ইজতিহাদের ক্ষেত্রে আল্লাহ অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে শাস্তি দিবেন না।
এখানে উল্লেখ্য যে,বুদ্ধিবৃত্তিক অকাট্য বিধানও কোরআন ও সুন্নাহ কর্তৃক সমর্থিত হয়েছে। অকাট্য বুদ্ধিবৃত্তি শরীয়তের বিধানের অন্যতম উৎস। যদি বুদ্ধিবৃত্তিক অকাট্য দলিলের ভিত্তিতে কোন নতুন ধর্মীয় বিধান হস্তগত হয়,তবে তা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হবে না।

বিদআত হারাম
ধর্মের মধ্যে নতুন কিছুর সংযোজন বা বিয়োজন এ অর্থে বিদআত হারাম কর্ম বলে বিবেচিত। কারণ শরীয়তের বিধান প্রণয়নের দায়িত্ব এককভাবে শুধুই আল্লাহর এবং তাঁর ইচ্ছা ও অনুমতি ব্যতীত শরীয়তের বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার কারো নেই। পবিত্র কোরআন ধর্মীয় পুরোহিতদের অন্ধ অনুসরণের কারণে ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের তীব্র সমালোচনা করেছে এবং তাদের নিরঙ্কুশ কর্মবিধায়ক নির্ধারণ করার কারণে ভর্ৎসনা করে বলেছে,
اتَّخَذُوا أَحْبَارَ‌هُمْ وَرُ‌هْبَانَهُمْ أَرْ‌بَابًا مِّن دُونِ اللَّـهِ
“তারা আল্লাহর পরিবর্তে তাদের ধর্মযাজক ও সংসার বিরাগী পুরোহিতদের নিজেদের পালনকর্তা বলে গ্রহণ করেছে।” ১৫
যদিও ইহুদী আলেমরা তাঁদের অনুসারীদের নিজেদের উপাসনার দিকে আহ্বান করতেন না কিংবা তাঁদের অনুসারীরাও তাঁদের উপাসনা করত না,কিন্তু তাঁরা আল্লাহর হালাল করা বস্তুকে হারাম এবং হারাম করা বস্তুকে হালাল বলে ঘোষণা করতেন। জনসাধারণ তা জানা সত্ত্বেও তাঁদের আনুগত্য করত ও তাঁদের কথা শুনত। এ কারণেই এ আনুগত্যকে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিপালক গণ্যকারী বলেছেন যা প্রকৃতপক্ষে একরূপ উপাসনার নামান্তর।’১৬
খ্রিষ্টানদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন,
 وَرَ‌هْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ
 “আর বৈরাগ্য,তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছিল যা আল্লাহ তাদের জন্য নির্ধারণ করেন নি।”১৭
সহীহ হাদীসসমূহেও কঠোরভাবে বিদআতকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন,کل بدعةٍ ضلالة، و کلّ ضلالة سبیلها فی النار ‘প্রতিটি বিদআতই স্পষ্ট বিচ্যুতি এবং প্রতিটি বিচ্যুতির পরিণতিই জাহান্নাম।’১৮

বিদআতের উপাদানসমূহ
হাদীস ও ফিকাহ্শাস্ত্রবিদদের উপস্থাপিত সংজ্ঞা হতে আমরা বলতে পারি,বিদআতের তিনটি মৌলিক উপাদান রয়েছে :
১। যদি কেউ কোন বিধান বা আদেশকে ধর্মের উপর আরোপ করে অথবা কোন ধর্মীয় বিধিকে ধর্ম বহির্ভূত বলে ঘোষণা করে তা বিদআত হবে। যেমন যদি কেউ الصلوة خیرٌمن النوم-কে আজানের অংশ বলে ঘোষণা করে অথবা ‘মুতা বিবাহ’যা রাসূলের  যুগে বৈধ ঘোষিত ছিল তা অবৈধ বলে ঘোষণা করে। মহান আল্লাহ মুশরিকদের এ জন্য তিরস্কার করেছেন যে,তারা তাঁর প্রতি মিথ্যা আরোপ করত।
  قُلْ آللَّـهُ أَذِنَ لَكُمْ أَمْ عَلَى اللَّـهِ تَفْتَرُ‌ونَ  “বলুন,আল্লাহ কি তোমাদের অনুমতি দিয়েছেন নাকি তোমরা আল্লাহর উপর অন্যায় মিথ্যারোপ করে থাক।”১৯
অন্যত্র বলেছেন,
 فَوَيْلٌ لِّلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَـٰذَا مِنْ عِندِ اللَّـهِ لِيَشْتَرُ‌وا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا
 “তাদের জন্য দুর্ভোগ যারা নিজ হাতে গ্রন্থ লিখে,অতঃপর বলে,এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। যাতে করে এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ গ্রহণ করতে পারে।” ২০
২। বিদআত তখনই নিন্দনীয় ও হারাম হবে যখন তার প্রণনয়নকারী তার নষ্ট ও বিকৃত বিশ্বাস অথবা শরীয়তে অবৈধ ঘোষিত কোন কর্ম সমাজে প্রচার করবে। কেবল এরূপ বিশ্বাস পোষণ বা গোপনে এরূপ কর্ম সম্পাদন কোন বিষয় বিদআত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
মুসলিম নিজ সূত্রে মহানবী (সা.) হতে বর্ণনা করেছেন,
 من دعا ألی ضلالة کان علیه من الإثم مثل آثام من یتبع لا ینقص ذلک من آثامهم شیئا
‘যে কেউ বিচ্যুতির দিকে আহ্বান করবে,তার গুনাহ ঐ সকল ব্যক্তির গুনাহের সমান যারা ঐ কাজে তাকে অনুসরণ করবে অবশ্য ঐ গুনাহের অনুসরণকারীদের পাপ হতে এতে কিছুই কম করা হবে না।’২১
এই হাদীসটিতে বিদআতের প্রতি আহ্বানের উল্লেখ রয়েছে যা তা প্রচারের দিকটির প্রতি ইশারা করছে।
৩। দ্বীনের মধ্যে উদ্ভাবিত বিষয়টি বিদআত হতে হলে এর কোরআন ও সুন্নাহ্ভিত্তিক কোন দলিল থাকা চলবে না। বিদআতের পারিভাষিক যে সংজ্ঞা আমরা উল্লেখ করেছি তা হতে স্পষ্ট বোঝা যায় কোন বিষয় বিদআত হওয়ার এটি অন্যতম শর্ত। তাই দু’টি বিষয় বিদআতের অন্তর্ভুক্ত নয় :
ক) নব উদ্ভাবিত বিষয়টি অভিনব হলেও তার জন্য শরীয়তে বিশেষ দলিল বিদ্যমান রয়েছে,যদিও তা রাসূলের জীবদ্দশায় না ঘটে থাকে। যেমন রাসূলের জীবদ্দশায় মদীনায় কখনোই ভূমিকম্প হয় নি। তাই ‘সালাতুল আয়াত’ যা ভীতিকর যে কোন কারণে পড়া হয় এক্ষেত্রে পড়া হয় নি,কিন্তু পরবর্তীতে কুফায় একবার ভূমিকম্প হলে ইবনে আব্বাস ভূমিকম্পের জন্য আয়াতের নামায পড়েন।
খ) এমন সকল বিষয় যা ইসলামের সর্বজনীন নীতির অধীন। ঐ সর্বজনীন বিধানই ইসলামী শরীয়তের রক্ষক ও নিশ্চয়তা দানকারী ঐ অর্থে যে,শরীয়তে বিদ্যমান সর্বজনীন দলিলসমূহই নতুন উদ্ভাবিত বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। এটিই ইসলামী বিধানের গতিশীলতার টিকে থাকার রহস্য। এ কারণেই শরীয়তে উদ্ভূত নতুন কোন বিষয়কে এ নীতির ভিত্তিতে ধর্মীয় বলে ঘোষণা করা হলে যদি তার জন্য বিশেষ কোন বিধান শরীয়তে (কোরআন ও সুন্নাহতে) পাওয়া না যায়,কিন্তু তা ঐ সর্বজনীন দলিলসমূহের আওতায় পড়ে,তবে তা বিদআত বলে গণ্য হবে না। যেমন  আল কোরআনের এ আয়াতটি :
وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ
 “তোমাদের শত্রুদের জন্য তোমাদের সাধ্যমত সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখ।” ২২
 ইসলামের প্রাথমিক যুগে অবতীর্ণ হলেও যেহেতু এর আহ্বান সর্বজনীন ও সাধ্যমত সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার বিষয়টি বর্তমানে তৎকালীন সময়ের হতে ভিন্নরূপ। তাই এখন কোন মুসলিম দেশের উচিত হবে শত্রুদের সন্ত্রস্ত রাখতে আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম,যেমন,ট্যাংক,যুদ্ধ বিমান,নৌবহর ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র প্রস্তুত রাখা। সহীহ বুখারীতে রাসূল (সা.) হতে বর্ণিত হয়েছে যে,তিনি বলেছেন : ‘তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম যে নিজে কোরআন শিক্ষা লাভ করে এবং অন্যকে তা শিক্ষাদান করে।’এখন যদি কেউ আধুনিক পদ্ধতিতে কোরআন শিক্ষা করে তবে তা ঐ নির্দেশের বহির্ভূত বলে গণ্য হবে না। কারণ তা এই সর্বজনীন নির্দেশের অন্তর্গত। এ যুক্তিতে ইবনে তাইমিয়া ও ওয়াহাবীদের ঘোষিত অনেক বিষয়ই বিদাআতের সীমার বাইরে পড়বে। যেমন,কবরের উপর সৌধ নির্মাণ,আল্লাহর ওলীদের জন্য শোক পালন,তাঁদের জন্মদিনে উৎসব পালন ইত্যাদি। কারণ এর সবগুলোই মহান আল্লাহর সর্বজনীন বিধান নিম্নোক্ত আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হবে :
وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ‌ اللَّـهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ
“এবং কেউ আল্লাহর নামযুক্ত বস্তুসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে তা তো তার হৃদয়ের আল্লাহ্ভীতি প্রসূত।”  ২৩
বিদআতের প্রকারভেদ
পূর্ববর্তী আলোচনা হতে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়েছে যে শরীয়তের দৃষ্টিতে বিদআত নিন্দনীয় (অপছন্দনীয়) একটি বিষয় এবং তা শরীয়তের বিধান মতে হারামের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং বিদআতকে হাসান (পছন্দনীয়) ও কাবিহ (অপছন্দনীয়) এ দু’ভাগে ভাগ করা সঠিক নয়। কিন্তু আহলে সুন্নাতের আলেমদের মতে বিদআত ‘হাসান’ও ‘কাবিহ’এ দু’ভাগে বিভক্ত। ২৪
বিদআতকে বৈধ ও অবৈধ অর্থাৎ পছন্দনীয় ও অপছন্দনীয় এরূপ বিভাজনের কোন বৈধতা নেই। কারণ বিদআত হলো এমন বিষয় যার কোন শরীয়তগত ভিত্তি নেই অর্থাৎ এমন কোন বিধান সৃষ্টি করা যার উৎস কোরআন ও সুন্নাতে খুঁজে পাওয়া যায় না,তা-ই বিদআত। তাই এরূপ বিধান নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয় ও হারাম বলে গণ্য।

কোন বিষয় বা কর্মে মোবাহের কর্মগত বিধান
(যে ক্ষেত্রে শরীয়ত কোন বিষয়কে সুস্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করে নি সেক্ষেত্রে ঐ বিষয়টি বৈধ হওয়ার সার্বিত নীতি)
উসূলশাস্ত্রের পণ্ডিতগণ বলে থাকেন,‘কোন বিষয় বা কর্মের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো বৈধতার নীতি অর্থাৎ যদি কোন বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে নিষেধাজ্ঞা না থাকে তবে সেক্ষেত্রে বৈধতার অথবা স্বাধীনতার সর্বজনীন নীতি কার্যকর হবে। যাকে উসূলশাস্ত্রের পরিভাষায় আসালাতুল হিল্লিয়াত (বৈধতার সর্বজনীন নীতি) অথবা আসালাতুল জাওয়ায বলা হয়। স্বাধীনতার সর্বজনীন নীতি (আসালাতুল বারায়াত) হতেও এ বিষয়টি প্রমাণিত হয়। এ নীতি মতে যে বিষয়ে শরীয়তের প্রবর্তক করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়কে বর্ণনা করেন নি সে বিষয়টি শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ বলে গণ্য অর্থাৎ সেক্ষেত্রে শরীয়তের অনুসারীদের স্বাধীনতা রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেছেন :
قُل لَّا أَجِدُ فِي مَا أُوحِيَ إِلَيَّ مُحَرَّ‌مًا عَلَىٰ طَاعِمٍ يَطْعَمُهُ إِلَّا أَن يَكُونَ مَيْتَةً أَوْ دَمًا مَّسْفُوحًا أَوْ لَحْمَ خِنزِيرٍ‌ فَإِنَّهُ رِ‌جْسٌ أَوْ فِسْقًا أُهِلَّ لِغَيْرِ‌ اللَّـهِ
“আপনি বলে দিন ;যা কিছু বিধান ওহীর মাধ্যমে আমার কাছে পৌঁছেছে,তন্মধ্যে আমি কোন হারাম খাদ্য পাই না কোন ভক্ষণকারীর জন্য যা সে ভক্ষণ করে;কিন্তু মৃত অথবা প্রবাহিত রক্ত অথবা শুকরের মাংস-এটা অপবিত্র ও অবৈধ-অথবা যবেহ করা জন্তু যা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয় সে কারণে।”২৫
ড. ইউসুফ কারদ্বাভী বলেছেন,‘ইসলাম সর্বপ্রথম যে নীতি প্রবর্তন করেছে তা হলো সকল বস্তু ও কল্যাণকর বিষয়ের ক্ষেত্রে বৈধতার সর্বজনীন নীতি এবং যে বিষয়গুলো শরীয়তের প্রবর্তক সুস্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করেন নি,তার ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা হতে মুক্তির নীতি।’২৬
রাসূল (সা.)-এর আহলে বাইতের অনুসৃত নীতিও সুন্নাত বলে গণ্য এবং তা শরীয়তের নীতি নির্ধারক।
এমন অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলোকে ওয়াহাবীরা এজন্য বিদআত বলে থাকে যে,তারা রাসূলের আহলে বাইতের সুন্নাতকে শরীয়তের জন্য নীতি নির্ধারক ও সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না। অথচ সহীহ হাদীসসমূহে তাদের অনুসৃত কর্ম ও নীতিও শরীয়তের নির্ধারক ও সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত ঘোষিত হয়েছে। এখানে আমরা এরূপ কয়েকটি দলিলে প্রতি ইশারা করছি।

১। আয়াতে তাত্বহীর
মহান আল্লাহ বলেছেন :
إِنَّمَا يُرِ‌يدُ اللَّـهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّ‌جْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَ‌كُمْ تَطْهِيرً‌ا
“নিশ্চয় আল্লাহ চান হে (নবীর) আহলে বাইত! তোমাদের হতে সকল অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।” ২৭
সহীহ মুসলিম হযরত আয়েশা সূত্রে বর্ণনা করেছে যে,একদিন সকালে মহানবী (সা.) গৃহ হতে বের হলেন এবং তখন তাঁর কাঁধে সেলাইবিহীন বিশেষ চাদর ছিল। (অতঃপর যখন তিনি বসলেন) তখন হাসান ইবনে আলী এসে ঐ চাদরের ভিতর প্রবেশ করল,তারপর হুসাইন তাতে প্রবেশ করল,তারপর ফাতেমা আসলে তাঁকেও চাদরে আবৃত করলেন,অতঃপর আলী আসলে তাঁকেও তাতে আবৃত করলেন। তাঁরা সকলে প্রবেশ করলে রাসূল এ আয়াতটি পাঠ করলেন,২৮
إِنَّمَا يُرِ‌يدُ اللَّـهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّ‌جْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَ‌كُمْ تَطْهِيرً‌ا
আয়াতটির লক্ষণীয় বিষয়সমূহ :
প্রথমত আয়াতটিতে ((إنّما)) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে যা দ্বারা বিধানকে নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর জন্য সীমিত করা হয় এবং এটি সীমিতকরণের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যকরণশাস্ত্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আয়াতটিতে আল্লাহর ইচ্ছা বিশেষ ব্যক্তিবর্গের (আহলে বাইতের) জন্য নির্দিষ্ট ঘোষিত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত আয়াতটিতে আল্লাহর ইচ্ছা অবশ্যম্ভাবী ইচ্ছার (ইরাদায়ে তাকভীনি) অন্তর্ভুক্ত যার কোন ব্যত্যয় হয় না,إنّما أمره اذا أراد شیئاً أن یقول له کن فیکن “কিছু করার ইচ্ছা করেন তখন বলেন : ‘হও’,অতঃপর তা হয়ে যায়।”
আয়াতটিতে (আয়াতে তাত্বহীরে) আল্লাহর অবশ্যম্ভাবী ইচ্ছার (ইরাদায়ে তাকভীনী) প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে,কেননা তা শরীয়তের বিধানগত ইচ্ছার (ইরাদায়ে তাশরীয়ী) অন্তর্ভুক্ত হলে যাতে বান্দার স্বাধীনতা রয়েছে সকল বান্দাই তার অন্তর্ভুক্ত হতো ও এরূপ পবিত্রতার আকাঙ্ক্ষা সবার জন্য প্রযোজ্য হতো। সেক্ষেত্রে আলাদাভাবে আহলে বাইতকে উল্লেখ মূল্যহীন হয়ে পড়ত। অর্থাৎ এ আয়াতে বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহর বিশেষ অলঙ্ঘনীয় ইচ্ছার প্রতিফলনের কথা বলা হয়েছে।
তৃতীয়ত আয়াতটিতে যে رجس বা অপবিত্রতার কথা বলা হয়েছে তার অর্থ এমন অপবিত্রতা যা বস্তুর প্রতি অন্যদের ঘৃণার উদ্রেক করে। তাই কোরআন رجس শব্দটি বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থাৎ বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক উভয় অপবিত্রতার ক্ষেত্রেই ব্যবহার করেছে। যেমন :
أَوْ لَحْمَ خِنزِيرٍ‌ فَإِنَّهُ رِ‌جْسٌ
“অথবা শুকরের মাংস,নিশ্চয়ই তা অপবিত্র” এবং
وَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَ‌ضٌ فَزَادَتْهُمْ رِ‌جْسًا إِلَىٰ رِ‌جْسِهِمْ وَمَاتُوا وَهُمْ كَافِرُ‌ونَ

“এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি (সন্দেহ ও কপটতার) রয়েছে তা তাদের অপবিত্রতার উপর অপবিত্রতা বৃদ্ধি করতে থাকে এবং তারা কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।” (সূরা তওবা: ১২৫)
 এর বিপরীতে পবিত্রতাও বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক উভয় বিষয়ে হতে পারে। আল্লামা তাবাতাবায়ী বলেছেন: রিজস বা অপবিত্রতা হলো এমন আত্মিক অনুভূতি ও প্রভাব যা বিভ্রান্ত ও বিচ্যুত বিশ্বাস এবং নিকৃষ্ট কর্ম হতে উদ্ভূত। আলোচ্য আয়াতে رجس শব্দটির পূর্বে ال এসেছে যা ‘আলিফ ওয়া লামে জিন্স’নামে অভিহিত তা সকল প্রকৃতির অপবিত্রতাকে শামিল করে। তাই আয়াতে আত্মিক অপবিত্রতা অর্থাৎ বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বা কর্মের ক্ষেত্রে ভুলের কারণ হতে পারে এমন সকল অপবিত্রতা হতেও মুক্তি ও পবিত্রতার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এবং এরূপ পবিত্রতা কেবল ঐশী নিষ্পাপত্বের (স্রষ্টা প্রদত্ত পবিত্রতার) ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য অর্থাৎ ব্যক্তির মধ্যে এমন আত্মিক অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছে যা তাকে ভ্রান্ত বিশ্বাস ও অসৎ কর্ম হতে নিবৃত রাখে।’২৯
যে বিশিষ্ট ব্যক্তি আল্লাহর অলঙ্ঘনীয় ইচ্ছার অধীনে সকল প্রকার ত্রুটি ও পাপ-পঙ্কিলতা হতে মুক্ত ঘোষিত হয়েছেন,নিঃসন্দেহে তাঁরা নিষ্পাপ ও পবিত্র এবং যে কোন পবিত্র ও নিষ্পাপ ব্যক্তির কর্ম ও নীতি আল্লাহর ইচ্ছার অধীনে হওয়ায় সুন্নাত ও সকলের জন্য প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গণ্য। তাই আল্লাহর নবীর আহলে বাইতের সদস্যদের অনুসৃত নীতিও সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত ও প্রামাণ্য দলিল বলে গণ্য।

২। হাদীসে সাকালাইন
তিরমিযী তাঁর সহীহ গ্রন্থে হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ্ আনসারী হতে বর্ণনা করেছেন যে,মহানবী (সা.)-কে বিদায় হজ্জ্বের সময় উটের পিঠে বসে বক্তব্য দিতে দেখলাম ও তাঁকে বলতে শুনলাম :
‘হে লোকসকল! আমি তোমাদের মাঝে দু’টি মূল্যবান ও ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছি। যদি তোমরা তা আঁকড়ে ধর,তাহলে কখনোই বিভ্রান্ত হবে না : আল্লাহর কিতাব ও আমার রক্ত সম্পর্কীয় আহলে বাইত।’৩০
হাদীসটি হতে বিভিন্নভাবে মহানবীর আহলে বাইতের নিষ্পাপত্ব প্রমাণ করা যায়। হাদীসটিতে কোরআন ও আহলে বাইতকে একত্রে উল্লেখ করে উভয়কে আঁকড়ে ধরতে বলা হয়েছে। তাই কোরআন যেরূপ সকল প্রকার ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে,আহলে বাইতও সেরূপ সকল ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে।
তথ্যসূত্র
১। সূরা ফাত্হ : ২৩।
২। সূরা আনফাল : ৩৮।
৩। সূরা কাহ্ফ : ৫৫।
৪। উসুলে কাফী,১ম খণ্ড,পৃ. ১৭৬,কিতবু ফাজলুল ইলম,বাবুর রাদ ইলাল কিতাব ওয়াস সুন্নাহ,হাদীস নং ৪।
*যেসব রেওয়ায়েতে সুন্নাত ও বিদআত শব্দ পাশাপাশি এসেছে তাতেও সুন্নাত এ প্রথম অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।
৫। ওয়াসায়িলুশ শিয়া,১ম খণ্ড,পৃ. ৩৪৭।
৬। ওয়াসায়িলুশ শিয়া,১ম খণ্ড,পৃ. ৩৪৭।
৭। অভিধান গ্রন্থসমূহ দ্রষ্টব্য। আল আইন,মুফরাদাত লি রাগিব ইসফাহানী,লিসানুল আরাব প্রভৃতি,‘بدع’  ধাতু।
৮ । নাহজুল বালাগা,খুতবা নং ১৭৬।
৯। প্রাগুক্ত,খুতবা নং ১৬১।
১০। প্রাগুক্ত,খুতবা নং  ১৪৫।
১১। জামেয়ুল উলুম ওয়াল হিকাম,পৃ. ১৬০।
১২। ফাতহুল বারী,১৭তম খণ্ড,পৃ. ৯।
১৩। রিসালাতু শারিফ আল মুরতাজা,২য় খণ্ড,পৃ. ২৬৪।
১৪। বিহারুল আনওয়ার,৭৪তম খণ্ড,পৃ. ২০২।
১৫ । সূরা তাওবা : ৩১।
১৬। উসূলে কাফী,৪র্থ খণ্ড,কিতাবুল ঈমান ওয়াল কুফর,শিরক অধ্যায়;তাফসীরে তাবারী,১ম খণ্ড,পৃ. ৮০।
১৭। সূরা হাদীদ : ২৭।
১৮। উসূলে কাফী,১ম খণ্ড,পৃ. ১৬৪,কিতাবুল ফাজলিল ইলম,বিদআত অধ্যায়,হাদীস নং-৮।
১৯। সূরা ইউনুস : ৫৯।
২০। সূরা বাকারা : ৭৯।
২১। সহীহ মুসলিম,৮ম খণ্ড,পৃ. ৬২,কিতাবুল ইলম। সহীহ বুখারী,৯ম খণ্ড,বাবুল ইতিসাম বিল কিতাব ওয়াস সুন্নাহ (কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণের অপরিহার্যতা অধ্যায়)
২২। সূরা আনফাল : ৬০।
২৩। সূরা হাজ্জ্ব : ৩২।
২৪। ইবনে আসির,আন নেহায়া,১ম খণ্ড,পৃ. ৭৯।
২৫। সূরা আনআম : ১৪৫।
২৬। আল হালাল ওয়াল হারাম,পৃ. ৩৩-৩৫।
২৭। সূরা আহযাব : ৩৩।
২৮। সহীহ মুসলিম,৭ম খণ্ড,পৃ. ১৩০।  
২৯। তাফসীরে আল মিযান,১৬তম খণ্ড,পৃ. ৩১২।
৩০। সহীহ তিরমিযী,৫ম খণ্ড,পৃ. ৬২১।

 

মন্তব্য

একটি মন্তব্য

* একটি তারকা চিহ্নিত ফিল্ড অবশ্যই মান থাকা আবশ্যক।