পবিত্র কোরআন মজিদে মাহদীইজম

পবিত্র কোরআন মজিদে মাহদীইজম
আহলিল বাইত (আ.)-এর সম্পর্কে কোরআন কারিমে অনেক আয়াত এসেছে যেমন ছয়টি আয়াত সুরা আনয়াম-এ এই বিষয়ে বলা হয়েছে। (সুরা: আনয়াম আয়াত সমুহ: ৩১-৪০-৪৪-৮৯-১১৫-১৫৮)
আল্লাহর শেষ প্রতিনিধি পৃথিবীর এক মহান সত্য যার প্রতি কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং ওই সকল আয়াতের ব্যাখ্যায়ও বহু রেওয়ায়াত বর্ণিত হয়েছে নিম্নে তার কিছু তুলে ধরা হল:
১. (حتى اذا جائتهم الساعه بغتة)
সে সময়, যখন অতর্কিতেই কিয়মত দিবস ঘনিয়ে আসবে। সুরা আনয়াম, আয়াত-৩১।
 (الساعه) এ শব্দটি শেষ যমানার নিদর্শন ও লক্ষ্যগুলির প্রতি ইংগিত করে, যেগুলি ইমাম মাহ্‌দী (আ.)-এর আবির্ভাবের পূর্বে প্রকাশ পাবে। আল-মাহ্‌দী ফিল কোরআন, পৃ. ৪৩।
২. (قل أرايتكم عذاب الله! أو أتتكم الساعه)
হে মোহাম্মাদ বল; কখনও কি চিন্তা করেছো, যদি আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর তার আযাব নাযিল করে অথবা কিয়ামতের সময় স্থিত হয়...। সুরা আনয়াম, আয়াত-৪০।
হযরত মোহাম্মাদ (সা.)-এর থেকে একটি রেওয়ায়েতে কিয়ামতের সময় সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে দশটি চিন্থ ও নিদর্শন বলা হয়েছে যা কিয়ামত বাস্তবায়ন হওয়ার পূর্বেই ঘটবে আর সেগুলি ইমাম মাহ্‌দী (আ.)-এর আবির্ভাবের লক্ষণ। এ বিষয়ে বিস্তারিত দেখুন: আল-মাহ্‌দী ফিল কোরআন, পৃ.-৪৫।
৩.
فلما نسوا ما ذكراو به فتحنا عليهم أبواب كل شيء حتى اذا فرحوا بماأوتوا أخذناهم بغته فاذا هم مبلسون
যখন (উপদেশগুলির কোন ফায়দা হয়নি) ও যা কিছু স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল তা ভুলে গিয়েছিল, তখন নেয়ামতের (যে সমস্ত) দরজাগুলি তাদের জন্য খুলে দিয়েছিলাম, ও তারা এ কারনে আনন্দিত হয়, (ও শুধুমাত্র সেগুলিকেই আকড়ে ধরেছিল) হঠাৎ করেই সেগুলিকে নিয়ে তাদেরকে কঠিনভাবে শাস্তি দিয়েছি, আর এ সময় সবাই আশা হারিয়ে নিরাশ হয়ে গিয়েছিল ও সমস্ত প্রত্যাশার দরজাগুলি তাদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। সুরা আনয়াম, আয়াত-৪৪।
আবি হামযা ইমাম বাকের (আ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করে যে:
ইমাম (আ.) (أخذهم بغته فاذا هم مبلسون) সম্পর্কে বলেন: এই অংশের অর্থ হচ্ছে, কায়েমের (ইমাম মাহ্‌দী (আ.)-এর) কিয়াম (অভ্যুত্থান) করা। গায়াতুল মারাম, পৃঃ-২২৬ ও তাফসীরে ছাফি, খন্ড-২, পৃ.-১৭৩ ।
৪. (فان يكفر بها هولاء فقد وكلنا بها قوماً ليسوا بها بكافرين.)
যদি কেউ সে বিষয়টির উপর অবিশ্বাস করে ( অসুবিধা নই) কারন কিছু রক্ষক তার তত্ত্বাবধকের জন্য পাঠিয়েছি, যারা তার প্রতি অকৃতজ্ঞ নই। সুরা আনয়াম, আয়াত-৮৯।
ইমাম সাদীক (আ.) এই অংশের (قوماً ليسوا بها بكافرون) ব্যাখ্যাতে বলেন: এই অংশটি ইমাম   মাহ্‌দী (আ.)-এর সঙ্গী-সাথীদেরকে ইংগিত করে বলা হয়েছে। ইয়ানাবিউল মাওয়াদ্দাহ, পৃ. ৪২২ ও গায়াতুল মারাম, পৃ. ২২৬।
৫- (و تمت كلمه ربك صدقاَ و عدلا لا مبدل لكلماته و هو السميع العليم.)
তোমার আল্লাহর কালাম সততা ও আদালতের সাথে সম্পন্ন হয়েছে এবং কেউ তার কালামকে রুপান্তরিত করতে পারবে না। তিনি সর্বশ্রোতা ও জ্ঞানী। সুরা আনয়াম, আয়াত-৪৪
দশের অধিক হাদীসে এসেছে যে ( و تمت كلمة ربك...) এই আয়াতটি প্রত্যেক ইমামের (আ.) দুই বাহু অথবা দুই কাঁধের মাঝখানে লেখা আছে এবং আহলি বাইত (আ.) গণের যিয়ারত গুলিতে “আল্লাহ” শব্দটি তাদের জন্য গৃহীত হয়।(نحن الكلمات التامات) আমরাই সমস্ত (শব্দ) বাণীর পূর্ণতা । এবং ইমাম আলী (আ.) তাদের মধ্যে প্রথম ও হযরত ইমাম মাহ্‌দী (আ.) তাদের মধ্যে শেষ ব্যাক্তি। তাফসির আতিবুল বায়ান, খন্ড: ৫, পৃ. ১৮০
৬-
يوم يأتي بعض آيات ربك لا ينفع نفساَ اينمانها لم تكن آمنت من قبل او كسبت فى ايمانها خيرأَ قل النتظروا انا منتظرون
যে দিন এই সমস্ত আয়াত ও লক্ষনগুলি বাস্তবায়ন হবে তখন যারা পূর্বে ঈমান আনেনি, তাদের ঈমান আনাতে বা কোন প্রকার নেক কাজ করাতে কোন লাভ হবেনা। বল যদি তোমাদের এমন কোন চাওয়া থেকে থাকে তাহলে অপেক্ষায় থাক আর আমরাও তোমাদের উপযুক্ত শাস্তি দেবার অপেক্ষায় আছি।
আলী ইবনে রোবাব ইমাম সাদিক (আ.)-এর কাছ থেকে বর্ননা করে যে, ইমাম (আ.) এই আয়াত সম্পর্কে বলেছেন: এখানে (آيات) শব্দের অর্থ হচ্ছে ইমাম মাহ্‌দী (আঃ)। অতপর বলেন, ইমাম (আ.) এর আবির্ভাব ও কিয়ামের সময় যারা পূর্বে ঈমান আনে নি তারা তখন ঈমান আনলেও কোন উপকারে আসবে না, যদিও বা পূর্বে অন্যান্য ইমাম (আ.) গণের প্রতি ঈমান এনে থাকে। আরো বলেন, সৌভাগ্য সেই ইমাম প্রেমিকদের যারা ইমাম (আ.)-এর আবির্ভাবের অপেক্ষায় থাকে এবং যখন তিনি আসবেন তখন তার আনুগত্যে ও তার হুকুম মেনে চলবে, তারা কোন কিছুর ভয় পায়না ও কখনও দুঃখিত ও ব্যথিত থাকেনা। ইয়ানাবিউল মাওয়াদ্দাহ্‌, পৃ.-৪২২,ও তাফসির বোরহান, খন্ড-১, পৃ. ৫৬৪, ও গায়াতুল মারাম, পৃ.-২২৬, ও বিহারুল আনওয়ার, খন্ড- ১, পৃ.-৫১।
৭- সুরা রা’দ: (انما انت منذر و لكل قوم هاد.)
কোরআন কারিমের অন্যান্য সুরা গুলির মত এই সুরার সাত নম্বর আয়াতেও আহলিল বাইত (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছে আয়াতটি নিন্মরুপ:
একমাত্র তিনিই সতর্ককারী এবং প্রত্যেক গোষ্ঠির জন্য হেদায়াতকারী আছে। সুরা রা’দ, আয়াত-৭
জমিন কখনই আল্লাহ তায়ালার হুজ্জাত হতে খালি থাকবে না।
আবদুল্লাহ ইবনে আববাস বলেন: হযরত মোহাম্মাদ (সা.) বলেছেন: আমি আম্বিয়াদের সাইয়্যেদ (শ্রেষ্ট) ও আলী ইবনে আবি তালিব আউসিয়াদের সাইয়্যেদ (শ্রেষ্ট) আর এটিও সত্য যে আমার উত্তরাধিকারী বার জন এবং তারা প্রত্যেকেই তাদের নিজ জামানার হেদায়াতকারী,তাদের প্রথম ব্যাক্তি আলি ইবনে আবি তালিব (আ.) এবং সর্বশেষ কায়েম আলে মোহাম্মাদ ইমাম মাহ্‌দী (আ.)। আলি ও আল-ওয়াসিয়্যাহ, পৃ.-৪৯, ও তাফসির সাফি, খন্ড- ৩, পৃ.- ৫৯।
যেমন সূরা আম্বিয়ার ১০৫ নং আয়াতে বলা হচেছ:
﴿وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِن بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصَّالِحُونَ﴾
নিশ্চয়ই আমরা তৌরাতের পর যাবুরে উল্লেখ করেছি যে, যোগ্যতা সম্পন্ন বান্দারা পৃথিবীর আমাদের উত্তরাধিকারী হবে৷
ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:
ইমাম মাহদী (আ.) ও তাঁর সাহায্যকারীরা হচেছন সেই যোগ্য বান্দা যারা পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবেন (তাফসীরে কুম্মী খণ্ড- ২, পৃ.-৫২)৷
৮- সূরা কাসাসের ৫ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে:
﴿وَنُرِيدُ أَن نَّمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الْأَرْضِ وَ نَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَ نَجْعَلَهُمُ الْوَارِثِينَ﴾
এবং আমরা ইচছা করলাম যাদেরকে পৃথিবীর বুকে (বঞ্চিত) হীনবল করা হয়েছিল তাদেরকে নেতৃত্ব দান করতে এবং উত্তরাধিকারী করতে৷
ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:
বঞ্চিত বা হীনবল বলতে রাসূল (সা.)-এর আহলে বাইতকে বোঝানো হয়েছে৷ অনেক প্রচেষ্টা ও কষ্টের পর আল্লাহ এই বংশের মাহদী (আ.)-কে প্রেরণ করবেন এবং তাকে উচচ মর্যাদা দান করবেন এবং শত্রুদেরকে কঠিন ভাবে লাঞ্চিত করবেন (গাইবাতে শেখ তুসী হাদীস ১৪৩, পৃ.-১৮৪)৷ 
৯- সূরা হুদের ৮৬ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে:
﴿بَقِيَّةُ اللّهِ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ﴾
আল্লাহর গচিছত সম্পদই তোমাদের জন্য যতেষ্ট যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক৷
ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:
ইমাম মাহদী (আ.) আবির্ভূত হওয়ার পর কাবা গৃহে হেলান দিয়ে প্রথমে উক্ত আয়াতটি তেলাওয়াত করবেন৷ অতঃপর বলবেন:
انا بقية الله فی ارضه و خليفته و حجته عليکم
আমিই পৃথিবীর বুকে আল্লাহর গচিছত সম্পদ, তোমাদের প্রতি তাঁর উত্তরাধিকারী এবং হুজ্জাত৷
অতঃপর যারা তাঁকে সালাম করবে তারা বলবে:
السلام عليک يا بقية الله فی ارضه
আপনার প্রতি সালাম, হে পৃথিবীর বুকে আল্লাহর গচিছত সম্পদ (কামালুদ্ দ্বীন খণ্ড- ১, বাব ৩২, হাদীস ১৬, পৃষ্ঠা ৬০৩)৷
১০- সূরা হাদীদের ১৭ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে:
﴿اعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ يُحْيِي الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ﴾
জেনে রাখ আল্লাহই ধরিত্রীকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন৷ আমি নির্দশনগুলি তোমাদের জন্য বিশদভাবে ব্যক্ত করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার৷
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

আল্লাহ তাআলা ইমাম মাহদী (আ.)-এর নিষ্ঠার মাধ্যমে পৃথিবীকে পূনর্জীবিত করবেন৷ কেননা অত্যাচারিদের অত্যাচারের মাধ্যমে পৃথিবী মৃত্যুবরণ করেছিল (গাইবাতে নোমানী পৃ.-৩২)৷

মন্তব্য

একটি মন্তব্য

* একটি তারকা চিহ্নিত ফিল্ড অবশ্যই মান থাকা আবশ্যক।