ইমামত ও মাহদীইজম

ইমামত ও মাহদীইজম

বিশেষ লক্ষ্যণীয় বিষয়টি হল এই যে, শিয়া সুন্নির পার্থক্যটা শুধুমাত্র ব্যক্তি রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারীকে নিয়ে নয় বরং প্রত্যেকের দৃষ্টিতে ইমামের অর্থ, বিষয়বস্তু এবং পদমর্যাদাও ভিন্ন৷ আর এ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই দুই মাঝহাবকে একে অপর থেকে পৃথক করেছে৷

বিষয়টির স্পষ্টতার জন্য ইমাম ও ইমামতের অর্থকে বিশ্লেষণ করব যার মাধ্যমে দৃষ্টিভঙ্গিসমূহের ভিন্নতা সুস্পষ্ট হবে৷ "ইমামতের" আভিধানিক অর্থ হল পথপ্রদর্শন বা নেতৃত্ব এবং "ইমাম" তাঁকে বলা হয় যিনি কোন সম্প্রদায়কে একটি নির্দিষ্ট পথে পরিচালনা করার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন৷ তবে ইসলামী পরিভাষায় ইমামতকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে৷
আহলে সুন্নতের দৃষ্টিতে ইমামত হচেছ পার্থিব হুকুমত (ঐশী পদমর্যাদা নয়) যার মাধ্যমে ইসলামী সমাজ পরিচালিত হবে৷ যেহেতু প্রতিটি জাতিরই নেতার প্রয়োজন রয়েছে ইসলামী সমাজও রাসূল (সা.)-এর পর নিজেদের জন্য অবশ্যই একজন নেতা নির্বাচন করবে৷ তবে তাদের দৃষ্টিতে যেহেতু ইসলামে নেতা নির্বাচনের কোন বিশেষ ব্যবস্থা নেই কাজেই বিভিন্ন পন্থায় রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারী নির্বাচন করা যেতে পারে৷ যেমন: অধিকাংশের ভোটের মাধ্যমে অথবা সমাজের বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের মতামতের ভিত্তিতে বা কখনো পূর্ববর্তী খলিফার ওসিয়াতের মাধ্যমে এমনকি কখনো আবার সামরিক অদ্ভুত্থানের মাধ্যমে৷      
কিন্তু শিয়া মাযহাব ইমামতকে নবুয়্যতের ধারার ধারাবাহিকতা এবং ইমামকে আল্লাহর হুজ্জাত ও মানুষের সাথে আল্লাহর সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম মনে করেন৷ তাদের বিশ্বাস হল এই যে, "ইমাম" শুধুমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত হবেন এবং ওহীর বার্তা বাহক মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে পরিচয় লাভ করবেন৷ ইমামতের সুউচচ মর্যাদার কারণেই শিয়া মাযহাব ইমামকে মুসলমানদের পরিচালক এবং ঐশী হুকুম-আহকাম বর্ণনাকারী, কোরআনের বিশ্লেষণকারী এবং সৌভাগ্য অর্জিত পথের দিক নির্দেশক মনে করেন৷ অন্য কথায় শিয়া মাযহাবের সাংস্কৃতিতে ইমাম হলেন মানুষের দ্বীন ও দুনিয়া সংক্রান্ত সকল সমস্যার সমাধানকারী৷ অর্থাৎ সুন্নি মাযহাবের সম্পূর্ণ বিপরীত কেননা তারা বিশ্বাস করে যে, খলিফার দায়িত্ব হল সে শুধুমাত্র শাসন করবে এবং মানুষের পার্থিব সমস্যার সমাধান করবে৷
ইমামের প্রয়োজনীয়তা
দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ স্পষ্ট হওয়ার পর এই প্রশ্নটির জবাব দেওয়া সমিচীন মনে করছি যে কোরআন এবং রাসূল (সা.)-এর সুন্নত থাকা সত্ত্বেও (যেমনটি শিয়া মাযহাব বিশ্বাস করে) ইমাম বা নেতার কি প্রয়োজন?
ইমামের অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তার জন্য অসংখ্য দলিল প্রমাণ রয়েছে তবে আমরা এখানে একটি অতি সাধারণ দলিল বর্ণনা করেই ক্ষান্ত হব৷ নবীর প্রয়োজনীয়তার জন্য যে সকল দলিল উপস্থাপন করা হয়েছে তা ইমামের প্রয়োজনীয়তার দলিলও বটে৷ এক দিকে যেহেতু ইসলাম সর্ব শেষ দ্বীন এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর সর্ব শেষ নবী সেহেতু ইসলামকে অবশ্যই কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের সকল সমস্যার সমাধান দিতে হবে, অপর দিকে আল কোরআনে (ইসলামের) মৌলিক বিষয়, আহকাম সম্পর্কিত নির্দেশাবলী এবং ঐশী তথ্যাবলী বর্ণিত হয়েছে এবং তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের দায়িত্ব রাসূল (সা.)-এর উপর অর্পিত হয়েছে৷ এটা স্পষ্ট যে রাসূল (সা.) মুসলমানদের নেতা হিসাবে সমাজের প্রয়োজনীয়তা এবং ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী আল্লাহর আয়াতকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন৷ অতএব তাঁর এমন যোগ্য উত্তরাধিকরীর প্রয়োজন যিনি তাঁর মত আল্লাহর অসীম জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত থাকবেন, তাহলেই তিনি রাসূল (সা.) যে সকল বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে যান নি তার ব্যাখ্যা দিতে পারবেন এবং ইসলামী সমাজের সকল যুগের সকল সমস্যার সমাধান করতে পারবেন৷ এমন ইমামই রাসূল (সা.)-এর রেখে যাওয়া দ্বীন ইসলামের রক্ষী এবং কোরআনের প্রকৃত মোফাস্সের৷ আর তাঁরাই পারেন ইসলামকে সকল প্রকার শত্রুর হাত থকে রক্ষা করে কিয়ামত পর্যন্ত পাক ও পবিত্র রাখতে৷
তাছাড়া ইমাম একজন পূর্ণমহামানব হিসাবে মানুষের জন্য একটি পরিপূর্ণ আদর্শ এবং মানুষ এমন একটি আদর্শের প্রতি বিশেষভাবে নির্ভরশীল৷ এভাবে তাঁর সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনায় উপযুক্ত মানুষ হিসাবে গড়ে উঠতে পারবে৷ এই ঐশী পথপ্রদর্শকের ছত্র ছায়ায় থেকে চারিত্রিক অবক্ষয় এবং বাহ্যিক শয়তান থেকে নিরাপদ থাকতে পারবে৷
উপরুক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মানুষের জন্য ইমামের প্রয়োজনীয়তা অতি জরুরী৷ তাই নিম্নে ইমামের কিছু বৈশিষ্ট বর্ণিত হল:
* নেতৃত্ব এবং সমাজ পরিচালনা (সরকার গঠন)৷
* রাসূল (সা.)-এর দ্বীন ও শরীয়তের রক্ষণাবেক্ষণ এবং কোরআনের সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান৷
* মানুষের আত্মশুদ্ধি এবং হেদায়াত৷   
ইমামের বৈশিষ্ট্যসমূহ 
রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারী যিনি দ্বীনের অব্যাহত ধারার কর্ণধর, মানুষের সমস্যার সমাধানকারী, এক ব্যাতিক্রমধর্মী ব্যাক্তিত্ব এবং মহান ইমাম ও নেতা হিসাবে নিঃসন্দেহে তিনি বহুমূখী গুণাবলীর অধিকারী৷ এখানে ইমামের উল্লেখযোগ্য কিছু গুণাবলী আপনাদের সামনে তুলে ধরা হল৷
তাকওয়া, পরহেজগারি এবং এমন নিঃস্কলুষ যে তাঁর দ্বারা সামান্যতম কোন গোনাহ সংঘটিত হয় নি৷
তাঁর জ্ঞানের উৎস হচেছ রাসূল (সা.) এবং তা ঐশী জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত৷
অতএব তিনি সকলের পার্থিব, আধ্যাত্মিক, দ্বীন এবং দুনিয়ার সকল ধরনের (প্রশ্নের) সমাধানকারী৷ 
তিনি ফযিলত এবং শ্রেষ্টতম চারিত্রিক গুনাবলিতে সু-সজ্জিত৷
তিনি মানবজাতিকে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম৷
উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এমন ধরনের ব্যক্তি নির্বাচন করা মানুষের জ্ঞান ও ক্ষমতার ঊর্ধে৷ একমাত্র আল্লাহ্ই তাঁর অসীম জ্ঞানের মাধ্যমে রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারী নির্বাচন করে থাকেন৷ সুতরাং ইমামের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল যে, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত ও নির্ধারিত হবেন৷ যেহেতু উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ অধিক গুরুত্ববহ তাই প্রতিটি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল:
১) - ইমামের জ্ঞান
ইমাম যেহেতু মানুষের নেতার আসনে সমাসীন সেহেতু অবশ্যই তাঁকে দ্বীন সম্পর্কে সার্বিকভাবে জানতে হবে, দ্বীনের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকতে হবে৷ তাঁকে কোরআনের তফসীর এবং রাসূল (সা.)-এর সুন্নতের উপর পূর্ণ দখল থাকতে হবে৷ দ্বীনি শিক্ষার বর্ণনা ও জনগণের বিভিন্ন বিষয়ে সকল প্রকার প্রশ্নের জবাব দিতে হবে এবং তাদেরকে উত্তমভাবে পথপ্রদর্শন করতে হবে৷ এটা স্পষ্ট যে কেবল মাত্র এধরনের ব্যক্তিই সর্বসাধারণের বিশ্বস্ত এবং আশ্রয় স্থান হতে পারেন আর এ ধরনের পাণ্ডিত্ব একমাত্র ঐশী জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত থাকার মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে৷ ঠিক একারণেই শিয়া মাযহাবের অনুসারীগণ বিশ্বাস করেন যে, ইমাম (আ.) তথা রাসূল (সা.)-এর প্রকৃত প্রতিনিধিগণের জ্ঞান আল্লাহ প্রদত্ত৷
হযরত আলী (আ.) প্রকৃত ইমামের চি‎হ্ন সম্পর্কে বলেছেন:
ইমাম হালাল হারাম, বিভিন্ন ধরনের আহকাম, আদেশ, নিষেধ এবং জনগণের সকল প্রয়োজন সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী অবহিত (মিযানুল হিকমা খণ্ড-১, হাদীস-৮৬১)৷
২) - ইমামের ইসমাত (পবিত্রতা)
ইমামের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবং ইমামতের মৌলিক শর্ত হচেছ "পবিত্রতা" আর তা সত্যের জ্ঞান ও বলিষ্ঠ ইচছা (দৃঢ় মনবল) থেকে সৃষ্টি হয়৷ ইমাম এ দুই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়ার কারণে সকল প্রকার গোনাহ এবং ত্রুটি থেকে বিরত থাকেন৷ ইমাম ইসলামী শিক্ষার পরিচয় এবং বর্ণনা ও পালন করার ক্ষেত্রে, এবং ইসলামী সমাজের উন্নতি ও ক্ষতি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে ত্রুটি মুক্ত ও নিস্পাপ৷ ইমামের পবিত্রতার জন্য (কোরআন এবং হাদীসের আলোকে) বুদ্ধিবৃত্তিক এবং উদ্ধৃতিগত দলিল রয়েছে৷ উল্লেখযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলসমূহ নিম্নরূপ:
ক) দ্বীন এবং দ্বীনি কর্মকাণ্ড (ইসলামী সাংস্কৃতি) রক্ষার্থে ইমামের নিস্পাপ হওয়া একান্ত প্রয়োজন৷ কেননা দ্বীনকে বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করা এবং জনগণকে হেদায়াত করার দায়িত্বভার ইমামের উপর ন্যাস্ত৷ এমনকি ইমামের কথা, আচরণ এবং অন্যদের কার্যকলাপকে অনুমোদন করা বা না করাও সমাজে প্রভাব বিস্তার করে৷ সুতরাং ইমামকে দ্বীন সম্পর্কে জানতে হবে এবং আমলের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে ত্রুটি মুক্ত এবং নিস্পাপ হতে হবে আর তাহলেই তিনি তাঁর অনুসারীদেরকে সঠিক পথে হেদায়াত করতে পারবেন৷
খ) সমাজে ইমামের প্রয়োজনীয়তার অপর একটি যুক্তি হল যে, জনগণ দ্বীন সম্পর্কে জানতে এবং তা বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে ত্রুটি মুক্ত নয়৷ এখন যদি মানুষের নেতাও এমনটি হন তাহলে মানুষ কিভাবে তার প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করবে? অন্য কথায় ইমাম যদি মাসুম না হন তাহলে মানুষ তার অনুসরণ এবং নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে দ্বিধায় পড়বে (তাছাড়া ইমাম যদি মাসুম না হন তাহলে আর একজন ইমামের শরণাপন্ন হতে হবে যে মানুষের সমস্যার সমাধান করতে পারবে৷ যদি সেও মাসুম না হয় তাহলে আর একজন ইমামের প্রয়োজন দেখা দিবে এভাবে একর পর এক চলতে থকবে এবং দর্শনের দৃষ্টিতে তা বাতিল বলে গন্য হয়েছে)৷
কোরআনের আয়াত থেকেও প্রমাণিত হয় যে, ইমামকে অবশ্যই মাসুম তথা নিস্পাপ হতে হবে৷ সূরা বাকারার ১২৪ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-কে নবুয়ত দান করার পরও অনেক পরীক্ষা নিয়ে তবেই তাঁকে ইমামতের পদমর্যাদা দান করেন৷ তখন হযরত ইব্রাহীম (আ.) আল্লাহর কাছে প্রার্থণা করলেন যে, হে আল্লাহ এই মর্যাদাকে আমার বংশধরের জন্যেও নির্ধারণ করুন৷ আল্লাহ তাআলা বললেন: আমার এ প্রতিশ্রুতি (ইমামতের পদমর্যাদা) জালিমদের প্রতি প্রযোজ্য হবে না৷
পবিত্র কোরআনে শিরক সর্বাপেক্ষা বড় জুলুম হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং আল্লাহর নির্দেশ লপঘন (গোনাহে লিপ্ত হওয়া) করাও নিজের প্রতি অত্যাচারের অন্তর্ভূক্ত৷ প্রতিটি মানুষই তাদের জীবনে কোন না কোন গোনাহে লিপ্ত হয়েছে, সুতরাং সেও জালিমদের অন্তর্ভূক্ত এবং কখনোই সে ইমামতের পদমর্যাদা লাভের উপযুক্ত নয়৷
অন্যকথায় নিঃসন্দেহে হযরত ইব্রাহীম (আ.) তাঁর ওই ধরনের বংশধরের জন্য দোয়া করেন নি যারা সারা জীবন গোনাহে লিপ্ত ছিল এবং যারা প্রথমে ঈমানদার ছিল পরে গোনাহগার হয়েছিল৷ সুতরাং দুই শ্রেণীর লোকরা অবশিষ্ট থাকে যথা:
১.     যারা প্রথমে গোনাহগার ছিল কিন্তু পরবর্তীতে তওবা করে সৎকর্মশীল হয়েছে৷
২.     যারা কখনোই গোনাহে লিপ্ত হয় নি৷
    আল্লাহ রাববুল আলামিন কোরআনপাকে প্রথম শ্রেণীর লোকদেরকে বাদ দিয়েছেন এবং ইমামতের পদমর্যাদাকে শুধুমাত্র দ্বিতীয় শ্রেণীর মহামানবদের জন্য নির্ধারণ করেছেন৷     
গ) - ইমামের সামাজিক দ্বায়িত্ব ও কর্মতৎপরতা
মানুষ সামাজিক জীব৷ সমাজ মানুষের চিন্তা-চেতনা এবং আচরণে বহুমুখী প্রভাব বিস্তার করে থাকে৷ তাই সঠিক প্রশিক্ষণ এবং সমাজকে আল্লাহর সান্ন্যিধ্যের পথে পরিচালনা করার জন্য উপযুক্ত সামাজিক ক্ষেত্র প্রস্তুত করা একান্ত প্রয়োজন৷ আর তা কেবল ঐশী (ইসলামী) রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সম্ভব৷ সুতরাং ইমাম তথা জনগণের নেতাকে অবশ্যই সমাজ পরিচালনা করার ক্ষমতা থাকতে হবে এবং কোরআনের শিক্ষা ও রাসূল (সা.)-এর সুন্নতের আলোকে এবং উপযুক্ত ও কার্যকরি উপকরণের সাহায্যে ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করতে হবে৷
ঘ) - মহান চারিত্রিক গুণাবলিতে গুনান্বিত হওয়া
ইমাম যেহেতু সমাজের নেতা সে জন্য তাঁকে অবশ্যই সকল প্রকার ত্রুটিমুক্ত এবং চারিত্রিক কলঙ্ক মুক্ত হতে হবে৷ পক্ষান্তরে তাঁকে সকল প্রকার চারিত্রিক গুণাবলীর সর্বোচচস্থানে অবস্থান করতে হবে৷ কেননা তিনি পরিপূর্ণ মানুষ (আদর্শ মহাপুরুষ) হিসাবে অনুসারীদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকেন৷
ইমাম রেযা (আ.) বলেছেন, "ইমামের বৈশিষ্ট্য রয়েছে; তিনি সর্বাধীক জ্ঞানী, পরহেজগার, মহানুভব, সাহসী, দানশীল এবং ইবাদতকারী" (মায়ানী আল আখবার খণ্ড- ৪, পৃষ্টা ১০২৷ )৷
তাছাড়া তিনি রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারী এবং তার দায়িত্ব হল মানুষের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান করা৷ সুতরাং তার নিজেকে অবশ্যই সবার আগে সু-চরিত্রের অধিকারী হতে হবে৷
ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:
যে (আল্লাহর নির্দেশে) মানুষের ইমাম হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছে তাঁর প্রথম দায়িত্ব হল সবার পূর্বে নিজেকে গঠন করা এবং অবশ্যই কথার পূর্বে কর্মের মাধ্যমে মানুষকে প্রশিক্ষণ দান করা (মিযানুল হিকমাহ বাব ১৪৭, হাদীস ৮৫০৷
ঙ) - ইমাম আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত হন:
শিয়া মাযহাবের দৃষ্টিতে ইমাম তথা রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারী কেবলমাত্র আল্লাহর নির্দেশ ও তাঁর অনুমোদনেই নির্ধারিত হয়ে থাকে এবং অতঃপর রাসূল (সা.) তাঁকে পরিচয় করান৷ সুতরাং এক্ষেত্রে (ইমাম নির্বাচনে) কোন দল বা গোত্রের বিন্দুমাত্র ভুমিকা নেই৷
ইমাম যে আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত হবেন তার অনেক যুক্তি রয়েছে যেমন:
১. কোরআনের ভাষায় একমাত্র আল্লাহই সকল কিছুর উপর ক্ষমতা রাখেন এবং সকলকে অবশ্যই তাঁর আনুগত্য করতে হবে৷ এটা স্পষ্ট যে, আল্লাহ যাকে ইচছা এই ক্ষমতা (যোগ্যতা এবং প্রয়োজনানুসারে) দান করতে পারেন৷ সুতরাং যেমনভাবে রাসূলগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়ে থাকেন, ইমামও আল্লাহর নির্দেশে জনগণের উপর নেতৃত্ব পেয়ে থাকেন৷
২. ইতিপূর্বে আমরা ইমামের জন্য ইসমাত (পবিত্রতা) এবং ইলম (জ্ঞান) বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দিয়েছি৷ এটা স্পষ্ট যে, এই সকল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তিকে পাওয়া এবং চেনা একমাত্র আল্লাহর পক্ষেই সম্ভব৷ কেননা তিনি সকল কিছুর উপর সম্যক জ্ঞাত৷ কোরআনপাকে আল্লাহ তাআলা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-কে বলেন:
"আমি তোমাকে মানবজাতির জন্য ইমাম (নেতা) নির্বাচন করলাম" (সূরা বাকারা আয়াত নং ১২৪)৷  
একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুন্দর বাণী:
এ আলোচনার শেষে ইমামের মর্যাদা এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে হযরত ইমাম রেযা (আ.)-এর বাণীর অংশ বিশেষ বর্ণনা করা উপযুক্ত মনে করছি যা নিম্নে তুলে ধরা হল:
"যারা ইমামত সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করে এবং মনে করে যে ইমামত হচেছ নির্বাচনের বিষয়, তারা অজ্ঞ৷ জনগণের পক্ষে সম্ভবই নয় যে তারা ইমামের মর্যাদাকে উপলব্ধি করবে৷ অতএব কিরূপে সম্ভব যে তাদের ভোটে ইমাম নির্বাচিত হবেন?"
"নিঃসন্দেহে ইমামতের মর্যাদা, আসন এবং গভীরতা মানুষের বুদ্ধি ও নির্বাচন ক্ষমতার অনেক উর্দ্ধে৷"
নিঃসন্দেহে ইমামত, এমন একটি পদমর্যাদা যাকে আল্লাহ তাআলা নবুয়্যাত ও খুল্লাত অর্থাৎ খলিলুল্লাহর পর তৃতীয় মর্যাদা হিসাবে হযরত ইব্রাহীম (আ.)-কে দান করেছেন৷ ইমামত হচেছ আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-এর খলিফা এবং আলী (আ.)-এর পদমর্যাদা ও হযরত ইমাম হাসান ও ইমাম   হুসাইন (আ.)-এর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ৷ সত্যি বলতে ইমামত হচেছ দ্বীনের কাণ্ডারি, ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক উপাদান, দুনিয়ার মঙ্গল এবং মুমিনদের সম্মানের স্থান৷ অনুরূপভাবে ইমাম থাকার কারণেই ইসলামী রূপরেখা রক্ষিত এবং তাকে মেনে নেয়াতেই নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, জিহাদ কবুল হয়ে থাকে৷ 
ইমাম আল্লাহ বর্ণিত হারাম ও হালালকে ব্যাখ্যা করেন৷ আল্লাহর আদেশ নিষেধকে মেনে চলেন এবং আল্লাহর দ্বীনকে সমর্থন করেন৷ তিনি পরিপূর্ণ জ্ঞানের মাধ্যমে এবং সুন্দর যুক্তির মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর   রাস্তায় দাওয়াত করেন৷
ইমাম উদিত সূর্যের ন্যায় যার জ্যোতি সারা বিশ্বকে আলোকিত করে কিন্তু সে নিজে সবার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে৷ ইমাম উজ্জল চন্দ্র, জলন্ত প্রদ্বীপ, দ্বীপ্তিময় জ্যোতি, বিষম অন্ধকারে পথপ্রদর্শনকারী নক্ষত্র৷ মোটকথা তিনি সকল প্রতিকুলতা থেকে মুক্তিদানকারী স্বর্গিয় দূত৷
ইমাম উত্তম সাথী, দয়ালু পিতা, সহোদর ভ্রাতা এবং ছোট্ট শিশুর জন্য মমতাময়ী মাতা৷ তিনি মহা বিপদের দিনে অসহায়দের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র৷ ইমাম এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি সকল প্রকার গোনাহ এবং ত্রুটি হতে মুক্ত৷ তিনি বিশেষ জ্ঞান, আত্মশুদ্ধি এবং ধৈর্যের প্রতীক৷ ইমাম যুগের শ্রেষ্ঠ মানুষ এবং কেউই তাঁর নিকটবর্তী হওয়ার যোগ্যতা রাখে না এবং কোন পণ্ডিতই তাঁর সমকক্ষ হতে পারে না৷ কেউ তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না এবং কেউ তাঁর অনুরূপ নয়৷
সুতরাং কার পক্ষে ইমামকে চেনা সম্ভব অথবা কে পারে ইমাম নির্বাচন করতে? আফসোস, হায় আফসোস! এখানেই মানুষ বুদ্ধি হারিয়ে হতবাক হয়ে যায়৷ এখানেই চোখের জ্যোতি হারিয়ে যায়, বড় ছোট্ট হয়ে যায়, বিচক্ষণরা হকচকিয়ে যায়, বক্তারা নির্বাক হয়ে যায়, কেননা তারা কেউই ইমামের একটি ফযিলত এবং বৈশিষ্ট্যকে বর্ণনা করতে অক্ষম এবং তারা সকলেই তাদের দূর্বলতাকে একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছেন (কাফী খণ্ড- ১, বাব ১৫, হাঃ ১, পৃষ্ঠা ২৫৫)৷   
শিয়া মাযহাবের শেষ ইমাম এবং রাসূল (সা.)-এর বারতম উত্তরাধিকারী ২২৫ হিজরীর ১৫ই শাবান শুক্রবার প্রভাতে (৮৬৮ খ্রীষ্টাব্দে) ইরাকের সামের্রা শহরে জন্মগ্রহণ করেন৷
শিয়া মাযহাবের একাদশ ইমাম হযরত হাসান আসকারী (আ.) তাঁর মহান পিতা৷ মাতা হযরত নারজিস খাতুন৷ নারজিস খাতুনের পিতা হলেন রোমের যুবরাজ, আর মাতা আশ্ শামউন সাফার বংশধর হযরত ঈসা (আ.)-এর ওয়াসি এবং নবীগণের বন্ধু হিসাবে পরিচিত৷ নারজিস খাতুন স্বপ্নের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর নির্দেশ অনুযায়ী যুদ্ধের ময়দানে যান এবং সেখানে অন্যান্য মুসলমানদের সাথে বন্দি হন৷ ইমাম হাদী আন্ নাকী (আ.) একজনকে প্রেরণ করেন এবং সে নারজিস খাতুনকে কিনে সার্মেরায় ইমামের বাড়িতে নিয়ে আসে (কামালুদ্ দ্বীন খণ্ড- ২, বাব ৪১, হাদীস ১, পৃষ্ঠা ১৩২)৷
এসম্পর্কে আরও কয়েকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৫, হাদীস ২৯, পৃ.-২২, এবং হাদীস ১৪ পৃ.-১১) তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল হযরত নারজিস কিছুদিন যাবৎ ইমাম হাদী (আ.)-এর বোন হযরত হাকিমা খাতুনের বাড়িতে ছিলেন এবং তিনি তাকে অনেক কিছু শিক্ষা-দীক্ষা দিয়েছিলেন৷ হযরত হাকিমা খাতুন নারজিস খাতুনকে অধিক সম্মান করতেন৷ নারজিস খাতুন হলেন সেই রমনী যার প্রশংসা করে পূর্বেই রাসূল (সা.) (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৫, হাদীস ২৯, পৃ.-২২, এবং হাদীস ১৪ পৃ.-১১), আলী (আ.) (গাইবাতে শেখ তুসী হাদীস ৪৭৮, পৃ.-৪৭) ও ইমাম জাফর সাদিক (আ.) (কামালুদ্ দ্বীন খণ্ড- ২, বাব ৩৩, হাদীস ৩১, পৃষ্ঠা ২১) হতে হাদীস বর্ণিত হয়েছে৷ তাকে সর্বোত্তম দাসী এবং তাদের নেত্রী হিসাবেও উল্লেখ করা হয়েছে৷
উল্লেখ্য যে ইমাম মাহদী (আ.)-এর মাতা আরও কয়েকটি নামে যেমন: সুসান, রেহানা, মালিকা এবং সাইকাল (সাকিল) নামে পরিচিত৷
নাম, কুনিয়া ও উপাধি
ইমাম মাহদী (আ.)-এর নাম ও কুনিয়া (যে নাম "আব" অথবা "উম" দিয়ে শুরু হয়ে থাকে যেমনঃ আবা আবদিল্লাহ ও উম্মুল বানিন) রাসূল (সা.)-এর নাম ও কুনিয়ার অনুরূপ৷ কিছু সংখ্যক হাদীসে তাঁর আবির্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত তাকে নাম ধরে ডাকতে নিষেধ করা হয়েছে৷
ইমাম যামানার প্রসিদ্ধ উপাধিসমূহ হচেছ: মাহ্দী, কায়েম, মুনতাযার, বাকিয়াতুল্লাহ, হুজ্জাত, খালাফে সালেহ, মানসুর, সাহেবুল আমর, সাহেবুয্ যামান এবং ওলী আসর আর সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হল মাহ্দী৷ 
প্রতিটি উপাধিই মহান ইমাম সম্পর্কে এক বিশেষ বাণীর বার্তাবাহক৷
ঐ মহান ইমামকে "মাহ্দী" বলা হয়েছে৷ কারণ তিনি নিজে হেদায়াত প্রাপ্ত এবং অন্যদেরকে সঠিক পথে হেদায়াত করবেন৷ তাঁকে "কায়েম" বলা হয়েছে৷ কেননা তিনি সত্যের জন্য সংগ্রাম করবেন৷ তাঁকে "মুনতাযার" বলা হয়েছে৷ কেননা সকলেই তাঁর জন্য অপেক্ষা করে আছে৷ তাঁকে "বাকিয়াতুল্লাহ" বলা হয়েছে৷ কেননা তিনি হচেছন আল্লাহর হুজ্জাত এবং গচিছত শেষ সম্পদ৷
"হুজ্জাত" অর্থাৎ সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর স্পষ্ট দলিল এবং "খালাফে সালেহ"-এর অর্থ হচেছ আল্লাহর ওয়ালিগণের উত্তরাধিকারী৷ তিনি "মানসুর" কেননা আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করবেন৷ তিনি "সাহেবুল আমর" কেননা ঐশী ন্যায়পরায়ণ সরকার গঠনের দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যান্ত হয়েছে৷ তিনি "সাহেবুয্ যামান" এবং "ওয়ালি আসর" কেননা তিনি হচেছন তাঁর সময়ের একছত্র অধিপতি৷   
জন্মের ঘটনা
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) হতে বহুসংখ্যক হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে তাঁর বংশ হতে মাহ্দী নামক একজন ব্যক্তি অদ্ভুথ্যান করবেন এবং তিনি অত্যাচারের ভিতকে সমূলে উৎপাটন করবেন৷ অত্যাচারী আববাসীয় শাসকরা এঘটনা জানতে পেরে ইমাম মাহদী (আ.)-কে তাঁর জন্মলগ্নেই হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়৷ সুতরাং ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর সময় থেকে মাসুম ইমামগণের জীবন-যাপন কড়া সীমাবদ্ধতার মধ্যে চলে আসে এবং ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর সময়ে এ পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে পৌছায়৷ এমনকি ইমাম (আ.)-এর গৃহের অতি সামান্য আসা যাওয়ার বিষয়ও শাসকবর্গের নখদর্পনে থাকত৷ অতএব এমতাবস্থায় শেষ ইমাম তথা ঐশী নবজাতকের জন্ম গোপনে বা লোকচক্ষুর আড়ালে হওয়াটাই বাঞ্চনীয়৷ ঠিক একারণেই ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর অতি নিকট আত্মীয়রাও ইমাম মাহদী (আ.)-এর জন্মের ঘটনা সম্পর্কে জানতেন না৷ এমনকি জন্মের কয়েক ঘন্টা পূর্বেও হযরত নারজিস খাতুনের গর্ভবতী অবস্থা পরিদৃষ্ট ছিল না৷
হযরত ইমাম মুহাম্মদ তকী আল জাওয়াদ (আ.)-এর কন্যা হাকিমাহ বলেন যে, ইমাম হাসান আসকারী (আ.) তাকে বললেন:
"ফুপি আম্মা আজকে ১৫ই শাবান, আমাদের সাথে ইফতার করুন৷ কেননা, আজ রাতে (রাতের শেষ ভাগে) আল্লাহ তার বরকতময় হুজ্জাতকে দুনিয়াতে প্রেরণ করবেন৷"
আমি বললাম: "এই বরকতময় নবজাতকের জননী কে?"
ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বললেন: "নারজিস৷"
আমি বললাম: "কিন্তু আমি তো তার কোন আলামত দেখছি না!"
ইমাম (আ.) বললেন: "কল্যাণ এর মধ্যেই নিহিত, আমি যা বলেছি তা ঘটবেই ইনশা আল্লাহ৷"
আমি নারজিস খাতুনের ঘরে প্রবেশ করে সালাম করে বসলাম, সে আমার পায়ের থেকে জুতা খুলে বলল: শুভ রাত্র হে আমার, নেত্রী৷
আমি বললাম: "তুমি আমার এবং আমাদের পরিবারের মহারাণী৷"
নারজিস খাতুন বললেন: "না! আমি কোথায় আর এ মর্যাদা কোথায়৷"
আমি বললাম: "হে আমার কন্যা! আল্লাহপাক তোমাকে আজ রাত্রে এমন একটি সন্তান দান করবেন যে দুনিয়া ও আখেরাতের নেতা৷"
একথা শোনার পর সে বিনয় ও লাজুকতার সাথে বসে পড়ল৷ আমি নামায-কালাম পড়ে ইফতার করে শুয়ে পড়লাম৷
মধ্যরাত্রে উঠে তাহাজ্জতের নামায পড়লাম৷ নারজিস ঘুমাচিছল কিন্তু বাচচা হওয়ার কোন আলামত দেখতে পেলাম না৷ নামায শেষে পুনরায় শুয়ে পড়লাম৷
কিছুক্ষণ পর ঘুম ভেঙ্গে গেল দেখলাম নারজিস নামায পড়ছে কিন্তু বাচচা হওয়ার কোন আলামত দেখতে পেলাম না৷ তখন আমার সন্দেহ হল ইমাম হয়ত ঠিক বুঝতে পারে নি৷
এমন সময় ইমাম হাসান আসকারী (আ.) তাঁর শোয়ার ঘর থেকে উচচস্বরে বললেন,
لا تعجلي يا عمه فانّ الامر قد قرب
"ফুপি আম্মা ব্যস্ত হবেন না বাচচা হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে৷"
একথা শোনার পর আমি সুরা সাজদা এবং সুরা ইয়াছিন পড়তে লাগলাম৷ এর মধ্যে হটাৎ নারজিস লাফিয়ে উঠলে আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম তোমার ব্যথা অনুভব হচেছ? বলল, "হ্যাঁ ফুপি৷"
আমি বললাম: চিন্তার কোন কারণ নেই ধৈর্য ধর, তোমাকে যে সুসংবাদ দিয়েছিলাম এটা তারই পূর্বাভাস৷
অতঃপর আমি ও নারজিস সামান্য ঘুমালাম, জেগে দেখি সেই চোখের মণি জন্মগ্রহণ করেছে এবং সেজদা করছে৷ তাকে কোলে নিয়ে দেখলাম সম্পুর্ণ পাক ও পবিত্র কোন ময়লা তার গায়ে নেই৷ এমন সময় ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বললেন, "ফুপি আম্মা আমার সন্তানকে আমার কাছে নিয়ে আসুন৷"
আমি নবজাতককে তাঁর কাছে নিয়ে গেলাম তিনি শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে নিলেন এবং নিজের জিহবাকে তার মুখে দিলেন এবং চোখে ও কানে হাত বুলালেন এবং বললেন:
تكلم يا بنيّ
"আমার সাথে কথা বল হে আমার পুত্র৷"
পবিত্র শিশুটি বলল: 
اشهد ان لا اله الا الله وحده لا شريك له و اشهد محمد رسول الله
অতঃপর ইমাম আলী (আ.) সহ সকল ইমাম (আ.) গণের উপর দরুদ পাঠ করলেন৷
ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বললেন: "ফুপি! তাকে তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে যান সে মাকে সালাম করবে, তারপর আমার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসুন৷"
তাকে তার মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম, সে মাকে সালাম করল নারজিস সালামের উত্তর দিল এবং আবার তাকে তাঁর পিতার কাছে নিয়ে গেলাম৷

হাকিমা খাতুন বলেন: "পরের দিন আমি ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর কাছে গিয়ে সালাম করলাম এবং ঘরে ঢুকে নবজাতককে দেখতে পেলাম না৷ ইমামের কাছে জানতে চাইলাম, ইমাম মাহ্দী কোথায়, তাঁকে দেখছিনা কেন, তাঁর কি হয়েছে?

ইমাম বললেন: "ফুপি, তাকে তাঁর কাছে শপে দিয়েছি যার কাছে হযরত মুসার মাতা মুসা (আ.)-কে শপে দিয়েছিলেন৷"

হাকিমা খাতুন বলেন: "সপ্তম দিনে আবার ইমামের বাসায় গেলাম এবং ইমাম আমাকে বললেন: "ফুপি, আমার সন্তানকে আমার কাছে নিয়ে আসুন! আমি তাঁকে ইমামের কাছে নিয়ে আসলাম৷ ইমাম বললেন: "হে আমার সন্তান! কথা বল! শিশুটি মুখ খুললেন এবং কালিমা শাহাদত পাঠ করলেন৷ অতঃপর মহানবী ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি দরুদ পাঠ করলেন৷ অতঃপর এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন:
﴿بِسْمِ اللّهِ الرّحْمَنِ الرّحيمِ * وَ نُريدُ أَنْ نَمُنّ عَلَي الّذينَ اسْتُضْعِفوا فِي الْأَرْضِ وَ نَجْعَلَهُمْ أَئِمّةً وَ نَجْعَلَهُمُ الْوَرِثينَ وَ نُمَكنَ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَ نُرِيَ فِرْعَوْنَ وَ هَمَنَ وَ جُنوذَهُما مِنْهُمْ ما كانوا يَحْذَرونَ﴾
"আমি ইচছা করলাম পৃথিবীতে যাদেরকে হীনবল করা হয়েছিল, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে নেতৃত্ব দান করতে এবং উত্তরাধিকারী করতে এবং তাদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে, আর ফিরাউন হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে যা তাদের নিকট তারা আশঙ্কা করত" (সূরা কাসাস আয়াত নং ৫, ৬/ কামালুদ্দিন, খণ্ড-২, বাবে ৪২, হাদীস নং-১, পৃ.-১৪৩)৷
আকৃতি এবং বৈশিষ্ট্য
রাসূল (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত (আ.)-এর বাণীতে ইমাম মাহদী (আ.)-এর আকৃতি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে তার কিছু এখানে তুলে ধরছি:
তাঁর চেহারা যুবক এবং গৌরবর্ণেও, কপাল প্রশস্ত ও উজ্বল, ভ্রু চাঁদের মত, চোখের রং কালো ও টানা টানা, টানা নাক ও সুন্দর, দাঁতগুলো চকচকে৷ ইমামের ডান চোয়ালে একটি কালো তিল আছে এবং কাধের মাঝে নবীগণের মত চিহ্ন আছে৷ তাঁর গঠন সুঠাম ও আকর্ষণীয়৷
পবিত্র ইমামদের পক্ষ থেকে তাঁর সম্পর্কে যে সকল বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে তার কিছু এখানে তুলে ধরা হল:
ইমাম মাহদী (আ.) তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েন, সংযমি এবং সাধারণ, ধৈর্যশীল এবং দয়ালু, সৎকর্মশীল ও ন্যায়পরায়ন৷ তিনি সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধনভান্ডার৷ তাঁর সম্পূর্ণ অস্তিত্ব জুড়ে পবিত্রতা এবং বরকতের ঝর্ণাধারা৷ তিনি জিহাদী ও সংগ্রামী, বিশ্বজনীন নেতা, মহান বিপ্লবী এবং তিনি প্রতিশ্রুত শেষ সংষ্কারক ও মুক্তিদাতা৷ সেই জ্যোর্তিময় অস্তিত্ব রাসূলের বংশধর, হযরত ফাতিমাতুয্ যাহরার সন্তান এবং সাইয়্যেদুশ্ শুহাদা হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর নবম বংশধর৷ তিনি মক্কা শরিফে আবির্ভূত হবেন এবং তাঁর হাতে থাকবে রাসূল (সা.)-এর ঝাণ্ডা৷ তিনি সংগ্রামের মাধ্যমে আল্লাহর দ্বীনকে রক্ষা করবেন ও আল্লাহর শরিয়তকে সারাবিশ্বে প্রচলিত করবেন৷ এ পৃথিবী অন্যায় অত্যাচারে পরিপূর্ণ হওয়ার পর তিনি তা ন্যায়-নীতিতে পরিপূর্ণ করবেন (মুনতাখাবুল আছার দ্বিতীয় অধ্যায় পৃ.-২৩৯-২৮৩)৷
ইমাম মাহদী (আ.)-এর জীবনি তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত:
১৷ গুপ্ত অবস্থা: জন্মের পর থেকে ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর শাহাদত পর্যন্ত তিনি গুপ্ত অবস্থায় জীবন-যাপন করেন৷
২৷ অদৃশ্যকাল: ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর শাহাদতের পর থেকে শুরু হয়েছে এবং আল্লাহর নির্দেশে আবির্ভাব হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তা চলতে থাকবে৷

৩৷ আসরে যহুর (আবির্ভাবের সময়): অদৃশ্যকাল শেষ হওয়ার পর মহান আল্লাহর ইচছায় তিনি আবির্ভূত হবেন এবং পৃথিবীকে সুখ-শান্তি ও সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ করবেন৷ কেউই তাঁর আবির্ভাবের সময়কে জানেন না৷ ইমাম মাহদী (আ.) নিজেই বলেছেন, যারা তাঁর আবির্ভাবের সময়কে নির্ধারণ করবে তারা মিথ্যাবাদী (ইহতিজাজা, খণ্ড-২, পৃ.-৫৪২)৷

মন্তব্য

একটি মন্তব্য

* একটি তারকা চিহ্নিত ফিল্ড অবশ্যই মান থাকা আবশ্যক।