ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমত

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমত

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমত

মেঘ ও কালো পর্দা সরে যাওয়ার পর বিশ্বের সূর্য তাঁর চেহারা উম্মচোন করবেন এবং গোটা বিশ্বকে তাঁর জ্যোতিতে আলোকিত করবেন৷ হ্যাঁ, অন্যায় ও ফ্যাসাদের সাথে সংগ্রাম করার পর ন্যায়বিচারের হুকুমতের পালা আসবে৷ তখন ন্যায়বিচার হুকুমতের আসনে উপবিষ্ট হবেন এবং প্রতিটি জিনিসকে তার উপযুক্ত স্থানে স্থান দান করবেন ও প্রত্যেকের অধিকারেকে ন্যায়ের ভিত্তিতে বন্টন করবেন৷

মোটকথা পৃথিবী ও তার অধিবাসীরা সত্য ও ন্যায়পরায়ন হুকুমত দেখতে পাবে এবং সেখানে কারো প্রতি সামান্যতম জুলুম করা হবে না৷ সে হুকুমতে থাকবে ঐশী সৌন্দর্য এবং তার ছায়াতলে মানুষ তার সকল অধিকার খুঁজে পাবে৷

এ অধ্যায়ে আমরা চারটি প্রসঙ্গে আলোচনা করব:

১- ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন হুকুমতের উদ্দেশ্যসমূহ৷

২- বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের কার্যক্রমসমূহ৷

৩- ঐশী ন্যায়পরায়ন হুকুমতের সাফল্য ও অবদানসমূহ৷

৪- ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের বৈশিষ্ট্যসমূহ৷

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন হুকুমতের উদ্দেশ্যসমূহ

সমগ্র সৃষ্টির উদ্দেশ্য যেহেতু পূর্ণতায় পৌছানো এবং আল্লাহর নৈকট্যলাভ আর এ মাহান উদ্দেশ্যে পৌছানোর জন্য প্রয়োজন তার সরঞ্জাম প্রস্তুত করা৷ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন হুকুমতের উদ্দেশ্য হচেছ আল্লাহর নৈকট্যলাভ এবং তাতে উপণীত হতে সকল প্রতিকুলতাকে অপসারণ করা৷

মানুষ যেহেতু শরীর ও আত্মা দিয়ে তৈরী কাজেই তার প্রয়োজনও, পার্থিব ও আধ্যাত্মিক দুই ভাগে বিভক্ত৷ সুতরাং পূর্ণতায় পৌছানোর জন্য দুদিকেই সমানভাবে অগ্রসর হতে হবে৷ ন্যায়পরায়ণতা যেহেতু ঐশী হুকুমতের মূলমন্ত্র কাজেই তা মানুষের দুদিকেই উন্নত করার জামানত দিতে পারে৷

সুতরাং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন হুকুমতের উদ্দেশ্য হচেছ মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতি, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও তার প্রসার৷

ক) - আধ্যাত্মিক উন্নতি

উপরোক্ত উদ্দেশ্যসমূহের গুরুত্ব ও মর্যাদাকে উপলব্ধি করার জন্য আমাদেরকে অবশ্যই তাগুতি হুকুমতসমূহের দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে৷

মানুষের জীবনে ঐশী হুকুমত ব্যতীত, আধ্যাত্মিকতা এবং আধ্যাত্মিক মর্যাদা কোন অবস্থানে ছিল? এমনটাই নয় কি যে, মানবতা লোপ পেয়েছিল, সর্বদা মানুষ আসৎ পথে চলত, নফসের তাড়নায় এবং শয়তানের প্ররচনায় জীবনের সকল মর্যাদাকে ভুলে গিয়ে মানুষ তাদের সকল ইতিবাচক গুনকে নিজের হাতে কামনা-বাসনার গোরস্থানে দাফন করে রেখেছিল? পবিত্রতা, শালিনতা, সত্যবাদিতা, সৎকর্ম, সাহয্য-সহযোগিতা, ত্যাগ-তিতিক্ষা, দানশীলতা ও বদান্নতার স্থানে ছিল নফসের তাড়না, কামনা-বাসনা, মিথ্যাচার, স্বার্থপরতা ও সুযোগসন্ধান, খিয়ানত, পাপাচার এবং উচচাভিলাস৷ মোটকথা তুগুতি হুকুমতকালীন সময়ে মানুষের জীবনে আধ্যাত্মিকতা তার শেষ প্ররহর গুনছিল এবং এমনকি কিছু কিছূ স্থানে ও কিছু কিছূ মানুষের ক্ষেত্রে তার (আধ্যাত্মিকতার) কোন অস্থিত্বই ছিল না৷

ইমাম মাহদী (আ.)-এর বিশ্বজনীন হুকুমতে মানুষেল জীবনের এ অধ্যায়কে জীবিত এবং তাতে প্রাণ সঞ্চার করার জন্য চেষ্টা করা হবে৷ এর মাধ্যমে প্রকৃত জীবনের মিষ্টি স্বাদ মানুষকে আস্বাদন করাবেন এবং সকলকে স্মরণ করিয়ে দিবেন যে, প্রথম থেকেই তাদেরকে এমন পবিত্রতাকে অনুভব করার কথা ছিল৷

﴿يَأَيهَا الّذينَ أَمَنوا اسْتَجيبوا لِلّهِ وَ لِلرّسولِ إِذا ذَعاكُمْ لِما يُحْييكُمْ﴾

হে মুমিনগণ! রাসূল যখন তোমাদেরকে এমন কিছুর দিকে আহবান করে যা তোমাদেরকে প্রাণবন্ত করে, তখন আল্লাহ ও রাসূলের আহবানে সাড়া দিবে (সূরা আনফাল আয়াত নং ২৪)৷

মানুষের আত্মিক দিকটা যেহেতু তাদেরকে অন্যান্য পশুদের থেকে পৃথক করে সুতরাং তা মানুষের বৃহদাংশ তথা প্রধান অংশকে গঠন করে৷ কেননা, মানুষ আত্মার অধিকারী হওয়ার কারণেই মানুষ হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছে এবং এদিকটাই তাকে আল্লাহর নৈকট্যলাভে সাহায্য করে থাকে৷

এ কারণেই আল্লাহর ওয়ালীর হুকুমতে মানুষের অস্তিত্বের এ দিকটিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং আত্মিক মর্যাদা ও মানবীয় গুনাবলী জীবনের প্রতিটি দিকে প্রাধান্য পাবে৷ আন্তরিকতা, আত্মত্যাগ, সত্যবাদিতা এবং সকল উত্তম গুনাবলী সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে৷

তবে এ উদ্দেশ্যে পৌঁছানোর জন্য একটি গঠনমূলক কর্মসূচীর প্রয়োজন রয়েছে যা পরবর্তীতে বর্ণিত হবে৷

খ) - ন্যায়পরায়ণতার প্রসার

যুগ যুগ ধরে মানুষের উপর যে বড় ধরনের অপরাধটি সংঘটিত হচেছ তা হল জুলুম ও অত্যাচার৷ মানুষ সর্বদা তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং মানুষের পার্থিব ও আত্মিক অধিকার কখনোই ন্যায়ের ভিত্তিতে বন্টিত হয় নি৷ সর্বদা ভরাপেটদের পাশাপাশি খালিপেটদেরকে (ক্ষুধাদর্থদেরকে) দেখা গেছে এবং বড় বড় প্রাসাদ ও অট্টালিকার পাশাাপশি শত-সহস্র মানুষকে পথে-ঘাটে শুয়ে থাকতে দেখা গেছে৷ শক্তিশালী ও বিত্তশালীরা দূর্বলদেরকে দাস হিসাবে ব্যবহার করেছে৷ কৃষ্ণাঙ্গরা শেতাঙ্গদের কাছে অত্যাচারিত হয়েছে৷ মোটকথা সর্বদা ও সর্বত্র দূর্বলদের অধিকারকে খর্ব করা হয়েছে এবং জালেমরা তাদের অসাধু চাহিদাকে চরিতার্থ করেছে৷ মানুষ সর্বদা ন্যায়পরায়ণতা ও সাম্যের জন্য প্রহর গুনেছে এবং ন্যায়বিচার সম্পন্ন হুকুমতের জন্য অধির আগ্রহে প্রতীক্ষা করেছে৷

এই প্রতীক্ষার শেষ হচেছ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়পরায়ণ শাসনব্যাবস্থা৷ তিনি মহান ন্যায়পরায়ণ নেতা হিসাবে সারা বিশ্বে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করার জন্য দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়েছেন৷ বিভিন্ন রেওয়ায়াতও সে সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে৷

ইমাম হুসাইন (আ.) বলেছেন: যদি মহাপ্রলয়ের মাত্র একটি দিনও অবশিষ্ট থাকে আল্লাহ তাআলা সে দিনকে এত বেশী দীর্ঘায়ীত করবেন যে, আমার বংশ থেকে একজন আবির্ভূত হবে এবং পৃথিবী যেমন অন্যায়-অত্যাচারে ভরে গিয়েছিল তেমনিভাবে ন্যায়নীতিতে ভরে তুলবেন৷ রাসূল (সা.)-এর কাছে আমি এমনটি শুনেছি (কামালুদ্দিন, খণ্ড-১, বাব ৩০, হাঃ ৪ এবং ৫৮৪)৷

এ ধরনের আরও বহু রেওয়ায়াত রয়েছে যেখানে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের ছায়াতলে বিশ্বজনীন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও অত্যাচারকে নির্মূল করার সংবাদ দেওয়া হয়েছে৷

এটা জানা প্রয়োজন যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়পরায়ণতার বৈশিষ্ট্যটি এত বেশী স্পষ্ট যে, কিছু িুকছু দোয়াতেও তাঁকে ওই উপাধিতে ভুষিত করা হয়েছে:

اللهم و صلی علی ولی امرک القائم المومل والعدل المنتظر

হে আল্লাহ আপনার ওয়ালী আমরের উপর দরুদ পাঠ করুন যিনি আদর্শ সংগ্রাম করবেন এবং সবার প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচার (মাফাতীহ্ আল জিনান দোয়ায়ে ইফতিতাহ্)৷

হ্যাঁ তিনি ন্যায়বিচারকে তাঁর বিপ্লবের মূলমন্ত্র করেছেন৷ কেননা, ন্যায়বিচার হচেছ মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের প্রাণ এবং ন্যায়পরায়ণতা ব্যতীত পৃথিবী ও তার অধিবাসীরা প্রাণহীন মানুষ যাদেরকে কেবল জীবিত মনে করা হয়ে থাকে৷

ইমাম কাযিম (আ.) নিম্নলিখিত আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে বলেছেন:

﴿اعْلَموا أَنّ اللّهَ يُحْيِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِها قَدْ بَيّنَا لَكُمُ الْأَيَتِ لَعَلّكُمْ تَعْقِلونَ﴾

এ আয়াতের অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ জমিনকে পানি দিয়ে জীবিত করেন বরং তিনি এমন ধরনের মহাপুরুষদেরকে (এখানে মহাপূরুষ বলতে ইমাম মাহদী (আ.) ও তাঁর সাথীদেরকে বোঝানো হয়েছে৷ তাফসীরে বোরহান খণ্ড- ৭, পৃ.-৪৪৬) প্রেরণ করেন যারা ন্যায়পরায়ণতাকে জীবিত করেন৷ অতঃপর (সমাজে) ন্যায়বিচার জীবিত হওয়ার মাধ্যমে জমিন জীবিত হয়৷

জমিন জীবিত হওয়া বলতে বোঝানো হয়েছে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়বিচার হচেছ সর্বজনীন ন্যায়বিচার যা কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়৷

বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের কার্যক্রমসমূহ

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সংগ্রামী উদ্দেশ্যের সাথে পরিচিত হওয়ার পর এই উদ্দেশ্যে উপণীত হওয়ার জন্য তার কার্যক্রমসমূহ নিয়ে আলোচনার পালা আসে৷ আর এর মাধ্যমেই আবির্ভাবের মুহুর্তের কর্মসূচীর পরিচিতি পেলেই আবির্ভাবের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত কি করা প্রয়োজন তার আর্দশ গ্রহণ করা সম্ভব৷ এভাবে যারা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর প্রতীক্ষায় রয়েছে তারা তাঁর প্রশাসনিক কর্মসূচীর সাথে পরিচিত হতে পারবে এবং নিজেদেরকে ও সমাজকে সে পথে অগ্রসরীত হতে প্রস্তুত করবে৷

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমত সম্পর্কে যে সকল রেওয়ায়াত বর্ণিত হয়েছে তা থেকে বোঝা যায় যে, তাঁর হুকুমতের প্রধান তিনটি কর্মসূচী রয়েছে এবং তা হচেছ: সাংস্কৃতিক কর্মসূচী, সামাজিক কর্মসূচী এবং অর্থনৈতিক কর্মসূচী৷

অন্য কথায় বলতে গেলে মনুষ্য সমাজ যেহেতু কোরআন ও আহলে বাইতের আদর্শ থেকে পিছিয়ে পড়েছে সুতরাং একটি বড় ধরনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রয়োজন রয়েছে যার মাধ্যমে মানুষ কোরআন ও ইত্রাতের কোলে ফিরে আসবে৷

অনুরূপভাবে একটি পরিপূর্ণ সামাজিক কর্মসূচী এ জন্য প্রয়োজন যে, সমাজে এমন একটি সঠিক সমাজ ব্যবস্থার দরকার যার মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি মানুষ তার নিজেস্ব অধিকার প্রাপ্ত হবে৷ কেননা, এত দিন ধরে যে অন্যায় ও অবিচার চলে আসছে অর্থাৎ ঐশী অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে এবং জালেমী পদ্ধতি সমাজকে নিষ্ঠুর পর্যায়ে নিয়ে গেছে একটি ন্যায় ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থাই তা থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে পারে৷

একটি আদর্শ সভ্য সমাজ গড়ে তোলার জন্য একটি সুষ্ট অর্থনৈতিক কর্মসূচীরও প্রয়োজন রয়েছে৷ যার মাধ্যমে পার্থিব সকল সুযোগ-সুবিধা সমভাবে সাবর মধ্যে বন্টিত হবে৷ অন্য কথায় এমন একটি গঠনমূলক অর্থ ব্যবস্থার প্রয়োজন যার মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত পার্থিব সকল সুযোগ-সুবিধা সমভাবে সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে বন্টিত হবে৷

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সমাজিক কর্মসূচীর সংক্ষিপ্ত বর্ণনার পর পবিত্র ইমাম (আ.)-গণের রেওয়ায়েত অনুসারে তার ব্যাখ্যা দান করা হল:

(ক)- সাংষকৃতিক কর্মসূচী: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন শাসন ব্যাবস্থায় সকল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানুষের জ্ঞান ও আমল বৃদ্ধির পথে অনুষ্ঠিত হবে এবং মুর্খতার সাথে সার্বিকভাবে মোকাবেলা করা হবে৷

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়নিষ্ঠ শাসনব্যাবস্থার প্রধান প্রধান সাংস্কৃতিক কর্মসূচী হচেছ:

১- কোরআন ও সুন্নত জীবন্তকরণ: যুগ যুগ ধরে যখন কোরআন বঞ্চিত ও একাকি হয়ে পড়েছে এবং জীবন পাতার এক কোণে ফেলে রেখেছিল এবং সকলেই তাকে ভুলে গিয়েছিল; আল্লাহর শেষ হুজ্জাতের হুকুমতের সময়ে কোরআনের শিক্ষা মানুষের জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রবেশ করবে৷ সুন্নত যা হচেছ মাসুমদের বাণী, কার্যকলাপ এবং তাকরির, তা সর্বত্র উত্তম আদর্শ হিসাবে মানুষের জীবনে স্থান পাবে এবং সবার আচরণও কোরাআন ও হাদীসের আলোকে পরিমাপ করা হবে৷

ইমাম আলী (আ.), ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর কোরআনী হুকুমতকে স্পষ্ট ভাষায় এভাবে বর্ণনা করেছেন: যখন মানুষের নফস হুকুমত করবে তখন (ইমাম মাহ্দী আবির্ভূত হবেন) এবং হেদায়াত ও সাফল্যকে নফসের স্থলাভিষিক্ত করবেন৷ যেখানে ব্যক্তির মতকে কোরআনের উপর প্রাধান্য দেওয়া হত তা পরিবর্তন হয়ে কোরআনকে সমাজের উপর হাকেম করা হবে (নাহজুল বালাগা খোতবা ১৩৮)৷

তিনি অন্যত্র আরো বলেছেন: আমি আমার শিয়াদেরকে দেখতে পাচিছ যে, কুফার মসজিদে তাবু বানিয়ে কোরআন যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছিল সেভাবে জনগণকে শিক্ষা দিচেছ (গাইবাতে নোমানি বাব ২১, হাঃ ৩, পৃ.-৩৩৩)৷

কোরআন শেখা এবং শিক্ষা দেওয়া কোরআনের সাংস্কৃতির প্রসার ও সমাজের সর্বস্তরে কোরআনের কতৃত্বের পরিচায়ক৷

২- মারেফাত ও আখলাকের প্রসার : পবিত্র কোরআন ও আহলে বাইতের শিক্ষাতে মানুষের চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে৷ কেননা, মানুষের উদ্দেশ্যের পথে অগ্রগতি ও উন্নতির মূলমন্ত্র হচেছ তার উত্তম চরিত্র৷ রাসূল (সা.) নিজেও তাঁর নবুয়্যতের উদ্দেশ্যকে চারিত্রিক গুনাবলীকে পরিপূর্ণতায় পৌঁছানো বুঝিয়েছেন (রাসূল (সা.) বলেছেন: انمابعثتلاتمممکارمالاخلاق নিঃসন্দেহে আমি চারিত্রিক গুনাবলীকে পরিপূর্ণতায় পৌঁছানোর জন্য প্রেরিত হয়েছি৷ মিযানুল হিকমা খণ্ড- ৪, পৃ.-১৫৩০) পবিত্র কোরআনও রাসূল (সা.)-কে সবার জন্য উত্তম আদর্শ হিসাবে আখ্যায়িত করেছে (لقدکانلکمفیرسولاللهاسوةحسنة সূরা আহযাব আয়াত নং ২১) কিন্তু অত্যান্ত দুঃখের সাথে বলতে হয় যে, মানুষ কোরআন ও আহলে বাইত থেকে দূরে সরে গিয়ে নষ্টামির নোংরা জ্বলে হাবুডুবু খাচেছ৷ আর এই চারিত্রিক অবক্ষয়ই ব্যক্তি ও সমাজের পতনের মূল৷

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর শাসনব্যাবস্থায় যা কিনা ঐশী ও আদর্শ হুকুমত সেখানে চারিত্রিক গুনাবলীর প্রসার সবকিছুর উপর প্রাধান্য পাবে৷

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

اذا قام قائمنا وضع يده علی رووس العباد فجمع به عقولهم و اکمل به اخلاقهم

যখন আমাদের কায়েম কিয়াম করবেন তখন তাঁর পবিত্র হাতকে মানুষের মাথায় বুলাবেন এবং তাদের বিবেককে একত্রিত করবেন ও তাদের চরিত্রকে পরিপূর্ণ করবেন (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৫২, পৃ.-৩৩৬)৷

এই সুন্দর উপমা থেকে বোঝা যায় যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের মাধ্যমে যা কিনা চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক হুকুমত সেখানে মানুষের বিবেক ও চরিত্রের পূর্ণতার ব্যাবস্থা থাকবে৷ কেননা, যেহেতু মানুষের খারাপ চরিত্র তার খারাপ ও ভণ্ড মানষিকতার ফল, অনুরূপভাবে মানুষের সুন্দর ও আদর্শ চরিত্রও তার সুস্থ মস্তিষ্কের ফল৷

অন্যদিকে কোরআনের হেদায়েতপূর্ণ ঐশী পরিবেশ মাপনুষকে সৎকর্মের দিকে পরিচালিত করে৷ সুতরাং মানুষেকে ভিতর ও বাহির থেকে শুধু সুন্দর্যের দিকে পরিচালিত করে আর এভাবেই গোটা বিশ্ব, মানবিক ও ঐশী গুনাবলীতে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে৷

৩- জ্ঞানের প্রসার: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের অপর সাংস্কৃতিক কর্মসূচী হচেছ জ্ঞানের বিপ্লব৷ ইমাম মাহ্দী (আ.) তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম (ইমাম আলী (আ) বলেছেন: তার জ্ঞান তোমাদের সবার চেয়ে বেশী৷ গাইবাতে নোমানি, বাব ১৩, হাঃ ১)৷ তাঁর সময়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ঘটবে৷

রাসূল (সা.) ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আগমনের সুসংবাদ দেওয়ার সাথে সাথে এটাও বলেছেন:

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ঔরসের নবম সন্তান হচেছন ইমাম মাহ্দী৷ সমগ্র বিশ্ব অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা তাঁর মাধ্যমে পুনরায় সমগ্র বিশ্বকে আলোকিত করবেন৷ অন্যায়-অত্যাচারে পূর্ণ হওয়ার পর তিনি তা ন্যায়নীতিতে পূর্ণ করবেন৷ অনুরূপভাবে সমগ্র বিশ্ব অজ্ঞতায় পূর্ণ হওয়ার পর তিনি তাকে জ্ঞানের আলোতে আলোকিত করবেন (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৩৬, পৃ.-২৫৩৷ কামালুদ্দিন খণ্ড- ১, বাব ২৪, হাঃ ৫, পৃ.-৪৮৭)৷

এই জ্ঞানের বিপ্লব সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য, সেখানে নারী-পুরুষের কোন ভেদাভেদ থাকবে না৷ বরং নারীরাও দ্বীনি শিক্ষার চরম শিখরে পৌঁছবে৷

ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের সময়ে তোমাদেরকে জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হবে এবং এমনকি নারীরা ঘরে বসে কিতাব ও সুন্নত অনুসারে বিচার করবে (গাইবাতে নোমানি ২৩৯৷ বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৫২, পৃ.-৩৫২)৷

এটা থেকে প্রমাণ হয় যে, সে সময়ে তারা কোরআনের আয়াত ও আহলে বাইতের রেওয়ায়াত সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করবে৷ কেননা, বিচার করা একটি অতি কঠিন কাজ৷

৪-বিদয়াতয়ের সাথে সংগ্রাম: বিদয়াত হচেছ সুন্নতের বিপরীত যার অর্থ দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু প্রবেশ করানো৷ অনুরূপভাবে ব্যক্তিগত চিন্তা-চেতনাকে দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করানো৷

ইমাম আলী (আ.) বিদয়াতকারীদের সম্পর্কে বলেছেন: বিদয়াতকারী তারা যারা আল্লাহ ও তাঁর কিতাবের নির্দেশ অমান্য করে এবং তাঁর রাসূল (সা.)-এর বিরোধিতা করে৷ তারা নিজেদের নফসের তাড়নায় চলে যদিও তাদের সংখ্যা অধিক হোক না কেন (মিযানুল হিকমা হাঃ ১৬৩২)৷

সুতরাং বিদয়াত হচেছ আল্লাহ, কোরআন ও রাসূলের বিরোধিতা করা এবং নফসের তাড়নায় ব্যক্তি কেন্দ্রিকভাবে চলা৷ তবে কোরআন ও হাদীসের ভিত্তিতে নতুন কিছু বের করার সাথে বিদয়াতের অনেক পার্থক্য রয়েছে৷ বিদয়াত আল্লাহর বিধান ও রাসূলের সুন্নতকে ধবংস করে এবং কোন কিছুই বিদয়াতের ন্যায় ইসলামকে ক্ষতি করে না৷

হযরত আলী (আ.) বলেছেন:

ما هدم الدين مثل البدع

কোন কিছুই বিদয়াতের ন্যায় দ্বীনকে ধবংস করে না (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৭৮, পৃ.-৯১)৷

এ কারণেই দ্বীনদারদেরকে বিদয়াতকারীদের সাথে লড়তে হবে এবং তাদের ধোকার পর্দা উম্মোচন করতে হবে৷ তাদের অসৎ পথকে মানুষকে দেখিয়ে দিতে হবে এবং এভাবেই জনগণকে গোমরাহি থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব৷

রাসূল (সা.) বলেছেন: যখন উম্মতের মধ্যে বিদয়াত প্রকাশ পাবে তখন আলেমদের কর্তব্য হচেছ তাদের জ্ঞানের প্রকাশ ঘটানো৷ যদি কেউ এমনটি না করে তাহলে তার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হবে (মিযানুল হিকমা হাঃ ১৬৪৯)৷

পরিতাপের সাথে বলতে হয় যে, রাসূল (সা.)-এর পর তাঁর সম্পষ্ট পথ থাকার পরও কতধরনের বিদয়াত যে দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! এভাবে তারা দ্বীনের সঠিক চেহারাকে পাল্টে দিয়েছে, ইসলামের উজ্জল চেহারাকে নফসের কালো কাপড়ে ঢেকে ফেলেছে৷ যদিও পবিত্র ইমামরা ও পরবর্তীতে আলেমরা অনেক চেষ্টা করেছেন কিন্তু তার পরও বিদয়াত থেকে গেছে এবং তা অদৃশ্যকালীন সময়ে আরও বেশী বেড়ে গেছে৷

বর্তমানে বিশ্ব অপেক্ষায় আছে যে, বিশ্বমানবের মুক্তিদাতা তথা প্রতিশ্রুতি মাহদী আসবেন ও তাঁর হুকুমতের ছায়তলে সুন্নতসমূহ জীবিত হবে এবং বিদয়াতসমূহ বিতাড়িত হবে৷ নিঃসন্দেহে ইমাম মাহদী (আ.) বিদয়াত ও সকল গোমরাহির সাথে সংগ্রাম করবেন এবং হেদায়াতের পথকে সবার জন্য প্রস্তুত করবেন৷

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

ولا يترک بدعة الا ازالها و لا سنة الا اقامها

তিনি সকল বিদয়াতকে উৎখাত করবেন এবং সকল সুন্নতকে প্রতিষ্ঠিত করবেন (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৫৮, হাঃ ১১, পৃ.-১১)৷

(খ)- অর্থনৈতিক কর্মসূচী: একটি সুস্থ সমাজের পরিচয় হচেছ তার সুস্থ অর্থব্যবস্থা৷ যদি দেশের সকল সম্পদকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় এবং তা একটি বিশেষ গোষ্ঠির হাতে সীমাবদ্ধ না থাকে বরং সরকার দেশের সকল শ্রেণীর মানুষের উপর দৃষ্টি রাখে ও সবার জন্য সম্পদের এ উৎস থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ করে দেয় তাহলে এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে যেখানে আধ্যাত্মিক উন্নতির সুযোগও বেশী হবে৷ পবিত্র কোরআন ও মাসুমগণের হাদীসেও অর্থনৈতিক দিক ও মানুষের জীবনের উন্নতির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে৷ সুতরাং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর কোরআনী হুকুমতে বিশ্বের অর্থ ব্যবস্থা ও মানুষের জন্য গঠনমূলক কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে৷ যার মাধ্যমে প্রথমত: উৎপাদন খাত পরিপূর্ণতা পাবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার হবে৷ দ্বিতীয়ত: অর্জিত অর্থ ও সম্পদ সবার মধ্যে শ্রেণী নির্বিশেষে সমভাবে বন্টিত হবে৷

এখানে আমরা রেওয়ায়াতের আলোকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের অর্থনীতিকে জানার চেষ্টা করব:

১- প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার: অর্থনৈতিক একটি সমস্যা হচেছ প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার না করা৷ না মাটির সঠিক ব্যবহার হচেছ না পানিকে মাটির উর্বরতার জন্য সঠিকভাবে কাজে লাগানো হচেছ৷ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের বরকতে আকাশ উদারভাবে বৃষ্টি দিবে এবং মাটিও উদারভাবে ফসল দান করবে৷

ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:

ولو قد قائمونا لانزلت السماء قطرها و لاخرجت الارض نبتها

আমাদের কায়েম যখন কিয়াম করবে তখন আকাশ উদারভাবে বৃষ্টি দিবে এবং মাটিও উদারভাবে ফসল দান করবে (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ১০, পৃ.-১০৪, খিসাল ৬২৬)৷

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের সকল সম্পদ ইমামের হাতে থাকবে এবং তিনি তা দিয়ে একটি সুষ্ট অর্থব্যবস্থা গড়ে তুলবেন৷

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

تطوی له الارض و نظهر له الکنوز

ভূমি পেচিয়ে উঠবে এবং তার মধ্যে লুকাইত সকল সম্পদ প্রকাশিত হবে (কামালুদ্দিন খণ্ড- ১, বাব ৩২, হাঃ ১৬, পৃ.-৬০৩)৷

২- সম্পদের সঠিক বন্টন: পুজবাদি অর্থ ব্যবস্থার মূল সমস্যা হচেছ একটি বিশেষ গোষ্ঠির হাতে সম্পদ কুক্ষিগত হওয়া৷ সর্বদাই এমনটি ছিল যে, সমাজের এক দল প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জনসাধারণের সম্পদকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করত৷ ইমাম মাহ্দী (আ.) তাদের সাথে সংগ্রাম করবেন এবং জনসাধারণের সম্পদকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিবেন৷ এভাবে তিনি হযরত আলী (আ.)-এর ন্যায়বিচারকে সবার কাছে প্রমাণ করবেন৷

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

اذا قام قائم اهل البيت قسم بالسوية و عدل فی الرعية

রাসূল (সা.)-এর আহলে বাইতের কায়েম যখন কিয়াম করবেন সম্পদের সঠিক বন্টন করবেন এবং সবার সাথে ন্যায়ভিত্তিক আচরণ করবেন (গাইবাতে নোমানি, বাব ১৩, হাঃ ২৬, পৃ.-২৪২)৷

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময়ে সাম্য ও সৌহার্দ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সকলেই তাদের ঐশী ও মানবিক অধিকার প্রাপ্ত হবে৷

রাসূল (সা.) বলেছেন: আমি তোমাদেরকে মাহ্দীর সুসংবাদ দান করছি৷ আমার ইম্মতে তার আগমন ঘটবে, সে সম্পদের সঠিক বন্টন করবে৷ একজন সাহাবি জিজ্ঞাসা করল: তার অর্থ কি? রাসূল (সা.) বললেন: অর্থাৎ মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা করবে (বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড- ৫১, পৃ.-৮১)৷

এই সাম্যের ফলাফল হচেছ সমাজ থেকে দারিদ্রতা দুরিভূত হবে এবং শ্রেণী বৈষম্য দূর হয়ে যাবে৷

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন: ইমাম মাহ্দী (আ.) সবার সাথে সমান আচরণ করবেন যার ফলে সমাজে আর কোন যাকাত প্রাপ্ত লোকের সন্ধান পাওয়া যাবে না (বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড- ৫১, পৃ.-৩৯০)৷

৩- উন্নয়ন প্রকল্প: সাধারণ হুকুমতসমূহে সমাজের একটি অংশ উন্নত হয়ে থাকে৷ এ উন্নতি কেবলমাত্র সরকার ও তার আসে-পাশের লোকজনদের জন্য হয়ে থাকে৷ অনুরূপভাবে যাদের সম্পদ এবং ক্ষমতার জোর আছে কেবলমাত্র তারাই এ উন্নতির ভাগিদার হয়ে থাকে এবং অন্য সকল শ্রেণীর লোকরা তা থেকে বঞ্চিত হয়৷ কিন্তু ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময়ে উৎপাদন ও বন্টন সমতার সাথে হবে এবং গোটা বিশ্ব উন্নতির মুখ দেখবে৷

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

فلا يبقی فی الارض خراب الا عمر...

পৃথিবীর কোথাও অনুন্নত কিছুই থাকবে না, সারা বিশ্ব উন্নতিতে ভরে যাবে (কামালুদ্দিন, খণ্ড- ১, বাব ৩২, হাঃ ১৬, পৃ.-৬০৩)৷

(গ)- সামাজিক কর্মসূচী: সমাজের উচছৃপখল ও দুস্কৃতিকারীদের সাথে আচরণের বিভিন্ন পদ্ধতি আছে৷ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়পরায়ণ হুকুমতে সুশিল সমাজ গঠনের জন্য কোরআন ও আহলে বাইতের নির্দেশ মোতাবেক কর্মসূচী গ্রহণ করা হবে৷ আর তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের জীবনপ্রণালী আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য প্রস্তুত হবে৷ যে বিশ্ব ঐশী হুকুমতের আয়ত্বে থাকবে সেখানে সৎকর্মের বিকাশ ঘটবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনত ব্যবহার করা হবে৷ সেখানে সবার অধিকারকে সমানভাবে প্রদান করা হবে এবং সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা প্রকৃতার্থে বাস্তবায়িত হবে৷

এখন এ বিষয়টিকে আমরা রেওয়ায়াতের আলোকে পর্যবেক্ষণ করব:

১- ন্যায় কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধের প্রসার: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতে ন্যায় কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ বিশেষভাবে প্রসার লাভ করবে৷ এ ওয়াজিব সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে:

﴿كُنْتُمْ خَيْرَ أُمّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَاسِ تَأْمُرونَ بِالْمَعْروفِ وَ تَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَ تُؤْمِنونَ بِاللّهِ﴾

তোমরাই শ্রেষ্ঠ ইম্মত; মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে৷ তোমরা সৎকার্যের নির্দেশ দান কর, অসৎকার্যে নিষেধ কর এবং আল্লাহে বিশ্বাস কর (সূরা আলে ইমরান আয়াত নং ১১০)৷

এর মাধ্যমে আল্লাহর সকল ওয়াজিব প্রতিষ্ঠিত হবে (এই ওয়াজিব সম্পর্কে ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন: ন্যায় কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ এমন একটি ওয়াজিব যার মাধ্যমে আল্লাহর সকল ওয়াজিব প্রতিষ্ঠিত হবে৷ মিযানুল হিকমা খণ্ড- ৮, পৃ.-৩৭০৪) এবং ন্যায় কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ না করার কারণে পৃথিবীতে এত বেশী অন্যায় ও অত্যাচার বৃদ্ধি পেয়েছিল৷

সর্বোত্তম ন্যায় কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ করার সর্বোত্তম পন্থা হচেছ যে, বাষ্ট্র প্রধানরা এ কাজ করবে৷

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

المهدی و اصحابه يَأْمُرونَ بِالْمَعْروفِ وَ يَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ

মাহ্দী ও তাঁর সাহায্যকারীরা ন্যায় কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ করবেন (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৫১, পৃ.-৪৭)৷

২- ফ্যাসাদ ও চারিত্রিক অবনতীর সাথে সংগ্রাম: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময়ে অন্যায় কাজের নিষেধ কেবলমাত্র মুখেই করা হবে না বরং কার্যত অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে৷ যার ফলে সমাজে আর কোন ফ্যাসাদ ও চারিত্রিক অবনতী দেখতে পাওয়া যাবে না এবং এবং সমাজ সকল প্রকার পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র হয়ে যাবে৷

দোয়া নুদবাতে এ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে:

اين قاطع حبائل الکذب والافتراء اين طامس آثار الزيغ والاهواء

তিনি কোথায় যিনি মিথ্যা ও অপবাদকে নির্মূল করবেন? তিনি কোথায় যিনি সকল অধপতন এবং অবৈধ কামনা-বাসনাকে ধবংস করবেন (মাফাতিহ আল জিনান, দোয়া নুদবা)৷

৩- আল্লাহর বিধানের প্রয়োগ: সমাজের উচছৃপখল ও দুস্কৃতিকারীদের সাথে আচরণের বিভিন্ন পদ্ধতি আছে৷ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়পরায়ণ হুকুমতে সুশিল সমাজ গঠনের জন্য কোরআন ও আহলে বাইতের নিদের্শ মোতাবেক কর্মসূচী গ্রহণ করা হবে৷ অনুরূপভাবে মানুষের সকল চাহিদা মেটানো ও সমাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কার্যত সকল অন্যায়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে৷ কিন্তু এর পরও যদি কেউ অন্যায়ে লিপ্ত হয়, অন্যের অধিকার নষ্ট করে এবং আল্লাহর বিধি লপঘন করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে৷

এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন: সে আল্লাহর বিধান প্রয়োগ করবে (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৫২, বাব ২৭, হাঃ ৪)৷

৪- বিচার বিভাগিয় ন্যায়পরায়ণতা: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের প্রধান কর্মসূচী হচেছ সমাজের সর্বস্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা৷ তিনি পৃথিবীকে অন্যায়-অত্যাচারে পূর্ণ হওয়ার পর ন্যায়নীতিতে পূর্ণ করবেন৷ ন্যায়পরায়ণতার একটি বিশেষ ক্ষেত্র হচেছ বিচার বিভাগ৷ কেননা, এ বিভাগে অনেককেই তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে৷ অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ কেড়ে নেওয়া, রক্তপাত ঘটানো এবং নির্দোষিদের সম্মান নষ্ট করা হয়েছে! দুনিয়ার বিচারে দূর্বলদেরকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং সর্বদা শক্তিশালী ও জালেমদের পক্ষে রায় গোষণা করা হয়েছে৷ এভাবে তারা অনেক মানুষের জান ও মালের ক্ষতি সাধন করেছে৷ অনেক বিচারকরাও তাদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য অন্যায় বিচার করেছে৷ অনেক নির্দোষিদেরকে ফাসির কাষ্ঠে ঝোলানো হয়েছে এবং অনেক দোষিদেরকে বেকুসুর খালাস করা হয়েছে৷

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়নিষ্ঠ হুকুমতে সকল অন্যায়-অত্যাচারের অবসান ঘটবে৷ তিনি যেহেতু আল্লাহর ন্যায়বিচারের বাস্তব চিত্র তাই ন্যায়পরায়ন বিচারালয় গড়ে তুলবেন এবং সেখানে ন্যায়নিষ্ঠ, সৎকর্মশীল ও খোদাভীরু বিচারকদেরকে নিয়োগ করবেন৷ পৃথিবীর কোথাও কারো প্রতি সমান্যতম জুলুম হবে না৷

ইমাম রেযা (আ.) এ সম্পর্কে বলেছেন:

فاذا خرج اشرقت الارض بنور ربها و وضع ميزان العدل بين الناس فلا يظلم احد احداً

তিনি যখন কিয়াম করবেন পৃথিবী আল্লাহর নুরে আলোকিত হয়ে যাবে৷ তিনি ন্যায়ের মানদণ্ডকে এমনভাবে স্থাপন করবেন যে কেউ কারো প্রতি সামান্যতম জুলুম করতে পারবে না (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৫২, পৃ.-৩২১)৷

এ রেওয়ায়াত থেকে বোঝা যায় যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়বিচার এত বেশী ব্যাপক যে অত্যাচারীদের অত্যাচারের পথ বন্ধ হয়ে যাবে৷ এভাবে অন্যায়ের পথ সম্পূর্ণরূপে রুদ্ধ হয়ে যাবে৷



ঐশী ন্যায়পরায়ণ হুকুমতের সাফল্য ও অবদানসমূহ

কোন ব্যক্তি বা দল ক্ষমতায় পৌঁছানোর আগে তার সরকারে কর্মসূচীকে বর্ণনা করে৷ কিন্তু সাধারণত ক্ষমতায় আসার পর তার কর্মসূচীর কিছুই বাস্তবায়ন করে না এবং মনকি পূর্বের দেওয়া সকল ওয়াদা বেমালুম ভুলে যায়৷

কর্মসূচী বাস্তবায়ণ না করতে পারার কারণ হচেছ হয়ত কর্মসূচী গঠনমূলক ছিল না অথবা এ কর্মসূচী পরিপূর্ণ ছিল না এবং অধিকংশ ক্ষেত্রে যোগ্যতার অভাবে এমনটি হয়ে থাকে৷

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের সকল উদ্দেশ্য ও কর্মসূচী গঠনমূলক ও বাস্তবমুখী যার মূলে রয়েছে মানুষের বিকেব, সকলেই যার প্রতীক্ষায় ছিল৷ ইমামের সকল কর্মসূচী কোরআন ও সুন্নত মোতাবেক এবং তা সম্পূর্ণটাই বাস্তবায়ন হওয়ার উপযোগি৷ সুতরাং এ মহান বিপ্লবের সাফল্য অতি ব্যাপক৷ এক কথায় ইমাম মাহদী (আ.)-এর হুকুমতের সাফল্য মানুষের সকল পার্থিব ও আধ্যাত্মিক সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট৷

রেওয়ায়াতের আলোকে আমরা এখন তার আলোচনা করব:

১- ব্যাপক ন্যায়বিচার: বিভিন্ন রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর মহান বিপ্লবের প্রধান সাফল্য হচেছ সর্বজনীন ন্যায়পরায়ণতা৷ হুকুমতের উদ্দেশ্য নামক অধ্যায়েও আমরা এ সম্পর্কে আলোচনা করেছি৷ এ অধ্যায়ে আমরা তার সাথে এ বিষয়টিকেও যোগ করতে চায় যে, কায়েমে আলে মুহাম্মদ (আ.)-এর হুকুমতে সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার একটি মূলমন্ত্র হিসাবে বিরাজ করবে এবং ছোট, বড় সব ধরনের প্রতিষ্ঠানেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে৷ এমনকি মানুষের আচরণও ন্যায়ের ভিত্তিতে হবে৷

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) এ সম্পর্কে বলেছেন: আল্লাহর শপথ! ন্যায়বিচারকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিব যেমনভাবে ঠাণ্ডা ও গরম মানুষের ঘরে প্রবেশ করে (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৫২, পৃ.-৩৬২)৷

ঘর সমাজের একটি ছোট্ট জায়গা আর সেটাই যখন ন্যায়পরায়ণ হয়ে উঠবে এবং পরিবারের সকলেই সবার সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করবে তা থেকে বোঝা যায় যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন হুকুমত ক্ষমতা বা আইনের বলে চলবে না বরং কোরআনের নির্দেশ অনুসারে ন্যায়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে (পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছেঃ اناللهيأمربالعدلوالاحسان নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা ও সদাচরণের নির্দেশ দেন৷ সূরা নাহল আয়াত নং ৯০)৷ জনগণকে সেভাবেই গড়ে তোলা হবে এবং সকলেই তাদের ঐশী দায়িত্ব পালন করবে৷ সকলের অধিকারকেই সম্মান দেওয়া হবে৷

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতে ন্যায়বিচার একটি মূল সাংস্কৃতি হিসাবে স্থান পাবে এবং মুষ্টিমেয় কিছু লোক যারা ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিবে এবং কোরআনের শিক্ষা থেকে দুরে থাকবে তারাই কেবল এর বিরুদ্ধাচারণ করবে৷ তবে ন্যায়পরায়ণ হুকুমত তাদের বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ নিবে এবং তাদেরকে কোন সুযোগ দেওয়া হবে না, বিশেষ করে তাদেরকে হুকুমতে প্রভাব ফেলতে বাঁধা দেওয়া হবে৷

হ্যাঁ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতে ন্যায়পরায়ণতা এভাবেই প্রভাব বিস্তার করবে আর এভাবেই ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিপ্লবের মহান উদ্দেশ্য বাস্তবাইত হবে৷ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং অন্যায়-অত্যাচার চিরতরে বিদায় নিবে৷

২- চিন্তা, চরিত্র ও ঈমানের বিকাশ: পূর্বেই বলা হয়েছে যে, সমাজের মানুষের সঠিক প্রশিক্ষণ, কোরআন ও আহলে বাইতের সাংস্কৃতির প্রসারের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়৷ বিভিন্ন রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতে চিন্তা, চরিত্র ও ঈমানের ব্যাপক বিকাশ ঘটবে৷

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

যখন আমাদের কায়েম কিয়াম করবেন নিজের হাতকে মানুষের মাথায় বুলিয়ে দিবেন এবং তার বরকতে তাদের জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক ও চিন্তাশক্তি পুরিপূর্ণতায় পৌঁছবে (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৫২, হাঃ ৭১, পৃ.-৩৩৬)৷

ভাল ও সৌন্দর্যসমূহ বিবেক পরিপূর্ণ হওয়ার মাধ্যমে অর্জিত হয়৷ কেননা, বিবেক হচেছ মানুষের অভ্যান্তরীণ নবী৷ তা যদি মানুষের শরীর ও জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে মানুষের কর্মও সঠিক পথে পরিচালিত হবে, আল্লাহর বান্দায় পরিণত হবে এবং সৌভাগ্যবাণ হবে৷

ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর কাছে প্রশ্ন করা হল যে, বিবেক কি? তিনি বললেন: বিবেক হচেছ তা যার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত হয় এবং তার (নির্দেশনার) মাধ্যমে বেহেশ্ত অর্জিত হয় (কাফী খণ্ড- ১, হাঃ ৩, পৃ.-৫৮)৷

বর্তমান সমাজে আমরা দেখতে পাই যে, কামনা-বাসনা বিবেকের উপরে স্থান পেয়েছে এবং নফসের তাড়না ব্যক্তি, দল ও গোত্রের উপর এককভাবে নেতৃত্ব দান করছে৷ যার ফলে মানুষের অধিকার পয়মল হচেছ ও ঐশী মর্যাদাকে উপেক্ষা করা হচেছ৷ কিন্তু ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সমাজ আল্লাহর হুজ্জাতের নেতৃত্বে যিনি হচেছন পরিপূর্ণ বিবেক৷ আর পরিপূর্ণ বিবেক কেবলমাত্র সৎকর্মের দিকেই আহবান করবে৷

৩- ঐক্য ও সহমর্মিতা: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের সকলেই ঐক্যবদ্ধ ও আন্তরিক হবে এবং হুকুমত প্রতিষ্ঠার সময় কারো প্রতি কারো শত্রুতা ও হিংসা থাকবে না৷

ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:

و لو قد قائمنا ... لذهبت الشحناء من قلوب العباد

যখন আমাদের কায়েম কিয়াম করবেন, সবার মন থেকে হিংসা ও বিদ্বেষ দূরিভুত হবে৷

তখন হিংসা-বিদ্বেষের আর কোন অজুহাত থাকবে না৷ কেননা, তখন সবত্র ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠত হবে এবং কারো অধিকার পয়মল হবে না, সকলেই বিবেকের সাথে চলবে, কামনা-বাসনার সাথে নয়৷ সুতরাং হিংসা-বিদ্বেষের আর কোনো পথই অবশিষ্ট থাকবে না৷ এভাবে প্রত্যেকেই আন্তরিক ও ঐক্যবদ্ধভাবে জীবন-যাপন করবে এবং কোরআনী ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে (انماالمومنوناخوة সূরা হুজুরাত আয়াত নং ১০)৷

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) এ সম্পর্কে বলেছেন: সে সময় আল্লাহ সবার মধ্যে ঐক্য ও আন্তরিকতা দান করবেন (কামালুদ্দিন, খণ্ড- ২, বাব ৫৫, হাঃ ৭, পৃ.-৫৪৮)৷

কোন আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, আল্লাহ যদি চান তাহলে সবই সম্ভব৷ আল্লাহর ইচছাতেই বর্তমান সমাজের এই অনৈক্য ও হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব গড়ে ইঠবে৷

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: আমাদের কায়েম কিয়াম করলে প্রকৃত বন্ধুত্ব ও সঠিক আন্তরিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে৷ তখন প্রয়োজনে একজন অন্য জনের পকেট থেকে প্রয়োজনীয় টাকা নিতে পারবে এবং সে তাতে কোন বাধা দিবে না (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৫২, হাঃ ১৬৪, পৃ.-৩৭২)৷

৪- শারীরিক ও আন্তরিক সুস্থতা: বর্তমান যুগের মানুষের একটি বড় সমস্যা হচেছ বিভিন্ন ধরনের দুরারোগ্য ব্যাধির বহিঃপ্রকাশ৷ এর বিভিন্ন কারণ রয়েছে যেমন: পরিবেশ দূষণ, রাসায়নিক বোমা, এটোম বোমা ও জীবাণু বোমা৷ অনুরূপভাবে মানুষের অবৈধ মেলা-মেশা, জঙ্গল ধবংস করা, পানি দুষণ ইত্যাদির কারণে বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি যেমন: ক্যানসার, এইডস, মহামারি, হার্ট এ্যটাক, পঙ্গুত্ব ইত্যাদি হচেছ যার চিকিৎসা প্রায় অসম্ভব৷ শারীরিক অসুস্থতা ছাড়াও বহু ধরনের আন্তরিক অসুস্থতা রয়েছে যা মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে এবং এটাও মানুষের বিভিন্ন অন্যায়ের কারণে ঘটছে৷

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়পরায়ণ হুকুমতে মানুষের সকল প্রকার শারীরিক ও আন্তরিক ব্যাধি দূর হয়ে যাবে এবং মানুষের শরীর ও মন অত্যান্ত বলিষ্ঠ হয়ে উঠবে৷

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: যখন ইমাম মাহ্দী (আ.) কিয়াম করবেন আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সকল অসুস্থতা দূর করে দিবেন এবং সুস্থতা ও (শান্তি) দান করবেন (বিহারুল আনওয়ার, হাঃ ১৩৮, পৃ.-৩৬৪)৷

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময়ে বিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতি ঘটবে এবং আর কোন দূরারোগ্য ব্যাধির অস্তিত্ব থাকবে না৷ চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি ঘটবে এবং ইমামের বরকেতে অনেকে সুস্থ হয়ে উঠবে৷

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন: যে আমাদের কায়েমকে দেখবে যদি অসুস্থ থাকে সুস্থ হয়ে যাবে আর যদি দূর্বল থাকে তাহলে শক্তিশালী হয়ে যাবে (বিহারুল আনওয়ার, হাঃ ৬৮, পৃ.-৩৩৫)৷

৫- অধিক কল্যাণ ও বরকত: কায়েমে আলে মুহাম্মদ (আ.)-এর হুকুমতের আরও একটি সাফল্য হচেছ অধিক কল্যাণ ও বরকত৷ তাঁর হুকুমতের বসন্তে সর্বত্র সবুজ-শ্যামল ও সাচছন্দময় হয়ে উঠবে৷ আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং মাটি থেকে ফসল উৎপন্ন হবে ও ঐশী বরকতে ভরপুর হয়ে যাবে৷

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: আল্লাহ তাআলা তাঁর কারণে আকাশে ও মাটিতে বরকতের বন্যা বইয়ে দিবেন৷ আকাশ থেকে রহমতের বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং মাটি থেকে ফসল উৎপন্ন হবে (গাইবাতে তুসী, হাঃ ১৪৯, পৃ.-১৮৮)৷

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময়ে আর কোন অনুর্বর ভুমি থাকবে না প্রতিটি স্থানই সবুজ-শ্যামল হবে এবং ফসল দান করবে৷

এই নজির বিহীন পরিবর্তনের কারণ হচেছ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবে সকল প্রকার পঙ্কিলতা দূর হয়ে যাবে এবং পবিত্রতার বৃক্ষ জন্ম নিবে ও ঈমানের ফুল ফুটবে৷ সব শ্রেণীর মানুষেরা ঐশী শিক্ষায় শিক্ষিত হবে এবং পারস্পারিক সকল সম্পর্ককে ঐশী মর্যাদা অনুসারে আঞ্জাম দিবে৷ আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে, এমন পবিত্র পরিবেশকে কল্যাণ ও বরকতে পরিপূর্ণ করবেন৷

এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হযেছে:

﴿وَ لَوْ أَنّ أَهْلَ الْقُري أَمَنوا وَ اتّقَوْا لَفَتَحْنا عَلَيْهِمْ بَرَكَتٍ مِنَ السّماءِ وَ الْأَرْضِ وَ لَكِنْ كَذّبوا فَأَخَذْنَهُمْ بِما كانوا يَكْسِبونَ﴾

যদি সেই সকল জনপদের অধিবাসীবৃন্দ ঈমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণ উন্মুক্ত করতাম, কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল৷ সুতরাং তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদেরকে শাস্তি দিয়েছি সূরা আরাফ আয়াত নং ৯৬)৷

৬- দারিদ্রতা নির্মূল হবে: পৃথিবীর সকল সম্পদ যখন ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর কাছে প্রকাশ পাবে এবং তাঁর যামানার মানুষের উপর আকাশ ও মাটির সকল বরকত বর্ষিত হবে ও মুসলমানদের বাইতুল মাল সমভাবে বন্টিত হবে তখন দারিদ্রতার আর কোন স্থান থাকবে না৷ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতে সকলেই অভাব ও দারিদ্রতার কালো থাবা থেকে মুক্তি পাবে (মুনতাখাবুল আছার অধ্যায় ৭, বাব ৩ ও ৪, পৃ.-৫৮৯-৫৯৩)৷

তাঁর সময়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের সাথে গড়ে উঠবে৷ ব্যক্তিগত স্বার্থপরিতা ও অর্থলিপ্সার স্থানে সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ব স্থান নিবে৷ তখন সকলেই প্রত্যেককে একই পরিবারের সদস্য মনে করবে৷ সুতরাং প্রত্যেকেই অন্যকে নিজের মনে করবে এবং তখন সর্বত্র একতা ও অভিন্নতার সুবাস ছড়িয়ে পড়বে৷

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন: ইমাম মাহ্দী (আ.) বছরে দুই বার জনগণকে দান করবেন এবং মাসে দুই বার তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তা পূরণ করবেন৷ এ ক্ষেত্রেও তিনি সমানভাবে সবার মধ্যে বন্টন করবেন৷ এভাবে মানুষ স্বনির্ভর হয়ে উঠবে এবং যাকাতের আর প্রয়োজন হবে না (বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড- ৫২, হাঃ ২১২, পৃ.-৩৯০)৷

বিভিন্ন রেওয়ায়েত থেকে বোঝা যায় যে, মানুষের স্বনির্ভরতার কারণ হচেছ তারা স্বল্পে তুষ্ট৷ অন্য কথায় মানুষের পার্থিব ধন-সম্পদ বেশী হওয়ার পূর্বে যার মাধ্যমে স্বনির্ভর হবে আত্মিক প্রশান্তি তথা আত্মিক স্বনির্ভরতার প্রয়োজন৷ আল্লাহ তাআলা তাদেরকে যা দিয়েছেন তারা তাতেই সন্তুষ্ট৷ কাজেই অন্যের সম্পদের দিকে তাদের কোন লোভ বা লালসা থাকবে না৷

রাসূল (সা.) এ সম্পর্কে বলেছেন: আল্লাহ তাআলা স্বনির্ভরতাকে মানুষের অন্তরে দান করে থাকেন (বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড- ৫১, পৃ.-৮৪)৷

যদিও ইতপূর্বে অর্থাৎ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের পূর্বে মানুষ, লালসা ও সম্পদের আধিখ্যের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল এবং গরিবদের প্রতি দান-খয়রাতের কোন ইচছাই তাদের মধ্যে ছিল না৷ মোটকথা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময়ে মানুষ বাহ্যিক ও আন্তরিক উভয় দিক থেকেই স্বনির্ভর থাকবে৷ এক দিকে অধিক সম্পদ সমভাবে বন্টিত হবে অন্য দিকে অল্পে তুষ্টি মানুষকে স্বনির্ভর করবে৷

এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন: আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মদিকে স্বনির্ভর করবেন এবং সকলেই ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়পরায়ণতার অন্তর্ভূক্ত হবে৷ ইমাম মাহ্দী একজনকে বলবেন যে ঘোষণা কর:

কার সম্পদের প্রয়োজন আছে? তখন সবার মধ্য থেকে মাত্র একজন বলবে আমার! তখন ইমাম (আ.) তাকে বলবেন: ক্যাশিয়ারের কাছে যেয়ে বল, ইমাম মাহ্দী (আ.) আমাকে পাঠিয়েছেন এবং আমাকে টাকা দিতে বলেছেন৷ তখন ক্যাশিয়ার তাবে বলবে: তোমার জামা (আরবী লম্বা জামা) নিয়ে এস, অতঃপর তার জামা অর্ধেক টাকায় ভরে দেওয়া হবে৷ সে ওই টাকা গুলোকে পিঠে করে নিয়ে যেতে যেতে ভাববে: উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে আমি কেন এত লোভী৷ অতঃপর সে তা ফিরিয়ে দিতে চাইবে কিন্তু তার কাছ থেকে তা গ্রহণ করা হবে না এবং তাকে বলা হবে: আমরা যা দান করি তা আর ফেরত নেই না (বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড- ৫১, পৃ.-৯২)৷

৭- ইসলামী হুকুমত এবং কাফেরদের উৎখাত: কোরআন পাকে তিনটি স্থানে ওয়াদা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা পবিত্র ইসলামকে বিশ্বজনীন করবেন:

﴿هُوَ الّذي أَرْسَلَ رَسولَهُ بِالْهُدي وَ دينِ الْحَق لِيُظْهِرَهُ عَلَي الدَينِ كُله وَ لَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكونَ﴾

মুশরিকরা অপ্রীতিকর মনে করলেও অপর সমস্ত দীনের উপর জয়যুক্ত করার জন্য তিনিই পথনির্দেশ ও সত্য দীনসহ তাঁর রাসূল প্রেরণ করেছেন (সূরা তাওবা আয়াত নং ৩৩, সূরা ফাতহ আয়ত নং ২৮, সূরা সাফ আয়াত নং ৯)৷

﴿إِنّ اللّهَ لايُخْلِفُ الْميعاذَ﴾

নিশ্চয়ই আল্লাহ ওয়াদা খেলাফ করে না (সূরা আলে ইমরান আয়াত নং ৯)৷

কিন্তু রাসূল (সা.) ও আল্লাহর ওয়ালীগণের অনেক চেষ্টার পর এখনও তা বাস্তবায়িত হয় নি (এটা একটি বাস্তব বিষয় এ সম্পর্কে মোফাস্সেরগণ যেমন: ফখরে রাজি তার তাফসিরে কাবীরের খণ্ড- ১৬, পৃ.-৪০, কুরতুবী তার তাফসীরে কুরতুবীতে খণ্ড- ৮, পৃ.-১২১ এবং তাবরাসী তার তাফসীরে মাজমাউল বায়ানে খণ্ড- ৫, পৃ.-৩৫ এসম্পর্কে আরোচনা করেছেন) প্রতিটি মুসলমান সে দিনের প্রতীক্ষায় রয়েছে৷ এ সত্যটি মাসুম ইমামদের বাণীতেও বর্ণিত হয়েছে৷

সুতরাং ইমাম মাহ্দীর হুকুমতে اشهدانلاالهالاالله ধবনি যা ইসলামের পতাকা এবং আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান রাসূলুল্লাহ গোটা বিশ্বকে পরিপূর্ণ করবে এবং র্শিক ও কুফ্রের কোন অস্তিত্ব আর থাকবে না৷

ইমাম বাকের (আ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের পর এই আয়াতের বাস্তবায়ন ঘটবে৷

﴿وَ قَتِلوهُمْ حَتَي لاتَكونَ فِتْنَةٌ وَ يَكونَ الدَينُ كُلهُ لِلّهِ فَإِنِ انْتَهَوْا فَإِنّ اللّهَ بِما يَعْمَلونَ بَصيرٌ﴾

এবং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাক যতক্ষণ না ফিত্না দূর হয় এবং আল্লাহর দ্বীন সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং যদি তারা বিরত হয় তবে তারা যা করে আল্লাহ তো তার সম্যক দ্রষ্টা (সূরা আনফাল আয়াত নং ৩৯)৷

তবে ইসলামের এ বিশ্বজনীনতা ইসলামের সত্যতার জন্যই এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময়ে তা আরও বেশী স্পষ্ট হবে ও সকলকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করবে৷ কিন্তু যারা শত্রুতা করবে ও নফসের তাড়নায় অবাধ্য হবে তারা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর তলোয়ারের মুখোমুখী হবে৷

এ অধ্যায়ের শেষ কথা হচেছ যে, এই আক্বীদাগত ঐক্যবদ্ধতা যা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের ছত্রছায়ায় অর্জিত হবে তা ঐক্যবদ্ধ পৃথিবী গড়ে তোলার একটি উত্তম প্রেক্ষাপট৷ এই ঐক্যবদ্ধ পৃথিবী ও ঐক্যবদ্ধ আক্বীদা একটি তৌহিদী হুকুমতকে মেনে নিতে প্রস্তুত৷ অতপর তার ছত্রছায়ায় নিজেদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সর্ম্পকে একই আক্বীদার ভিত্তিতে সুসজ্জিত করবে৷ এ বর্ণনার মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম যে, আক্বীদাগত ঐক্যবদ্ধতা এবং সকল মানুষের একই দ্বীন ও একই পতাকার তলে একত্রিত হওয়াটা অতিব জুরুরি বিষয় যা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতে অর্জিত হবে৷

৮- সর্বসাধারণের নিরাপত্তা: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতে মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরে সব ধরনের সৎকর্ম ছড়িয়ে পড়বে তখন নিরাপত্তা যা মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া অর্জিত হবে৷

সকল মানুষ যখন একই আক্বীদার অনুসরণ করে, সামাজিক আচরণেও ইসলামী আখলাক মেনে চলে এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে স্তরে ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠিত থাকে তখন জীবনের কোথাও আর ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার কোন অজুহাত থাকতে পারে না৷ যে সমাজে প্রত্যেকেই তার অধিকার প্রাপ্ত হয় এবং সামান্যতম অপরাধেরও উপযুক্ত শাস্তি হয় সেখানে অতি সহজেই সামাজিক নিরাপত্তা অর্জিত হওয়া সম্ভব৷

ইমাম আলী (আ.) বলেছেন: আমাদের সময়ে অতি কঠিন সময় অতিবাহিত হবে কিন্তু যখন আমাদের কায়েম কিয়াম করবে তখন সকল হিংসা-বিদ্বেষ দূরীভূত হবে এমনকি সব ধরনের পশু-পাখিরাও একত্রে জীবন-যাপন করবে৷ সে সময়ে পরিবেশ এত বেশী নিরাপদ হবে যে, এক জন নারী তার সকল স্বর্ণ-অলঙ্কার ও টাকা-পয়সাসহ একাকি ইরাক থেকে সিরিয়া পর্যন্ত নির্ভয়ে পরিভ্রমন করবে (খিসাল খণ্ড- ২, পৃ.-৪১৮)৷

আমরা যেহেতু অন্যায়, হিংসা, অত্যাচার ও সকল প্রকার অসৎকর্মের যুগে বসবাস করছি তাই এমন সোনালী যুগের ধারণাও আমাদের জন্য অতি কঠিন ব্যাপার৷ এর কারণের দিকে যদি দৃষ্টিপাত করি তাহলে বুঝব যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের ওই সবের কোন অস্তিত্ব থাকবে না৷ সুতরাং আল্লাহর ওয়াদা বাস্তবায়িত হবে এবং সমাজ নিরাপত্তায় পরিপূর্ণ হয়ে যাবে৷

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলছেন:

﴿وَعَدَ اللّهُ الّذينَ أَمَنوا مِنْكُمْ وَ عَمِلُوا الصّلِحَتِ لَيَسْتَخْلِفَنّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الّذينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَ لَيُمَكنَنّ لَهُمْ ذينَهُمُ الّذِي ارْتَضي لَهُمْ وَ لَيُبَدلَنّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْناً يَعْبُدونَني لايُشْرِكونَ بي شَيْئاً وَ مَنْ كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَهُمُ الْفَسِقونَ﴾

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দ্বীনকে যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন... (সূরা নুর আয়াত নং ৫৫)৷

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) এই আয়াতের অর্থ সম্পর্কে বলেছেন: এই আয়াত ইমাম মাহ্দী (আ.) ও তাঁর সাহায্যকারীদের উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছে (গাইবাতে নোমানি হাঃ৩৫, পৃ.-২৪০)৷

৯- জ্ঞানের বিকাশ: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপক বিকাশ ঘটবে এবং তাত্বিক জ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটবে৷

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: জ্ঞান-বিজ্ঞানের ২৭টি অক্ষর রয়েছে নবীগণ যা এনেছেন তা হচেছ মাত্র ২টি অক্ষর এবং জনগণও এই দুই অক্ষরের বেশী কিছু জানে না৷ যখন আমাদের কায়েম কিয়াম করবে বাকি ২৫টি অক্ষর বের করবেন এবং মানুষের মধ্যে তা প্রচার করবেন৷ অতঃপর ওই দুঅক্ষরকেও তার সাথে যোগ করে মানুষের মাঝে প্রচার করবেন (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড-৫২, পৃ.-৩২৬)৷

এটা স্পষ্ট যে, মানুষের জীবনের সকল ক্ষেত্রে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটবে এবং হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, ঐ সময়ের প্রযুক্তির সাথে বর্তমান প্রযুক্তির বিশাল ব্যবধান থাকবে (তবে হাদীসে হয়তবা মোজেযা সম্পর্কে বলা হয়ে থাকতে পারে )৷

বর্তমান প্রযুক্তির সাথে পূর্বের প্রযুক্তির যেমন বিশাল ব্যবধান রয়েছে৷

এখানে কয়েকটি হাদীসের দিকে ইঙ্গিত করা হল:

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময়ে মুমিন ব্যক্তি প্রাচ্য থেকে তার ভাইকে যে প্রাশ্চাত্যে রয়েছে দেখতে পাবে (বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড- ৫২, পৃ.-৩৯১)৷

তিনি আরও বলেছেন: যখন আমারদের কায়েম কিয়াম করবে আল্লাহ তাআলা আমাদের অনুসারীদের শ্রবণ শক্তি ও দৃষ্টি শীক্তকে এত বেশী বৃদ্ধি করে দিবেন যে, ইমাম মাহ্দী (আ.) ২৮ কিলোমিটার দূর থেকে তাঁর অনুসারীদের সাথে কথোপকথন করবেন এবং তারাও তাঁর কথা শুনতে পাবে ও তাঁকে দেখতে পাবে৷ অথচ ইমাম সেখানেই দাড়িয়ে থাকবেন (বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড- ৫২, পৃ.-৩৩৬)৷

একজন নেতা হিসাবে দেশের জনগণ সম্পর্কে ইমামের ধারণা ও জ্ঞান সম্পর্কে বর্ণিত হযেছে:

মানুষ ঘরের মধ্যেও কথা বলতে ভয় করবে যে, যদি দেওয়ালেরও কান থাকে? (বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড- ৫২, পৃ.-৩৯০৷

আধুনিক যুগের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি দেখে তা উপলব্ধি করা খুব একটা কঠিন ব্যাপার নয়৷ কিন্তু আমরা জানি না যে, ইমামের সময়ে এই সকল প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করে ব্যবহার করা হবে নাকি তিনি নতুন কোন প্রযুক্তির ব্যবস্থা করবেন৷

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের বৈশিষ্টসমূহ

পূর্ববর্তী অধ্যায়সমূহে আমরা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের উদ্দেশ্য, সাফল্য বা অবদান সম্পর্কে কথা বলেছি৷ এখর আমরা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের কিছু বৈশিষ্ট্য যেমন: হুকুমতের পরিধি, ও তার রাজধানী, হুকুমতের সময় সীমা ও তার কার্যপদ্ধতি ও তার পরিচয় এবং মহান নেতার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করব৷

১) - হুকুমতের পরিধি ও তার রাজধানী

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমত হচেছ বিশ্বজনীন৷ কেননা তিনি হচেছন সমগ্র মানব জাতির মুক্তিদাতা ও তাদের সকল আশার বাস্তবায়নকারী৷ সুতরাং তাঁর হুকুমতের সকল সৌন্দর্য, সৎকার্য ও সুফল সারা বিশ্বকে আচছন্ন করবে৷ এ সত্য বিভিন্ন রেওয়াত থেকে আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়, নিম্নে তার কিছু উদাহরণ দেওয়া হল:

ক)- অধিক সংখ্যক রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে: পৃথিবী অন্যায়-অত্যাচারে পরিপূর্ণ হওয়ার পর ইমাম মাহ্দী (আ.) পূনরায় পৃথিবীকে ন্যায়-নীতিতে পূর্ণ করবেন (কামালুদ্দিন, আয়াত বাব ২৫, হাঃ৪ এবং বাব ২৪ হাঃ ১ ও ৭)৷ الارض বা মাটি শব্দের অর্থ সমগ্র পৃথিবী এবং সেটাকে পৃথিবীর কিছু অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার কোন দলিল আমাদের কাছে নেই৷

খ)- যে সকল রেওয়ায়াতে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে সে সকল স্থানের গুরুত্ব ও ব্যাপকতা থেকে বোঝা যায় যে, তিনি সমগ্র বিশ্বের উপর হুকুমত করবেন৷ রেওয়ায়াতে যে সকল শহর ও দেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা কেবল উদাহরণ মাত্র এবং রেওয়ায়াতে সে সময়ের মানুষের উপলব্ধির দিকেও দৃষ্টি রাখা হয়েছে৷

বিভিন্ন রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.) চীন, রোম, দেইলাম, তুরস্ক, সিন্ধু, ভারত, কাসতানতানিয়া এবং কাবুল বিজয় করবেন (গাইবাতে তুসী এবং ইহতিজাজে তাবরাসী )৷

বলাবাহুল্য যে, ইমামদের যুগ এই সকল এলাকার পরিধি অনেক বেশী ছিল যেমন: রোম বলতে সমগ্র ইউরোপ এমনকি আমেরিকার কিছু অংশকেও বোঝানে হয়েছে৷ চীন বলতে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যেমন: জাপান, করিয়া ইত্যাদিকে বোঝানো হয়েছে৷ অনুরূপভাবে ভারত বলতে ভারত উপমহাদেশকে বোঝানো হয়েছে৷ কাসতাননিয়া বা ইসতামবুল সে সময়ে বিশেষ গুরুত্বের অধিকারি ছিল এবং তা বিজয় করা অতি গৌরবের বিষয় ছিল৷ কেননা, তা ইউরোপে প্রবেশ করার একটি প্রধান কোরিডোর ছিল৷

মোটকথা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশসমূহের বিজয়ই হচেছ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন হুকুমতের পরিচায়ক৷

গ)- প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর রেওয়ায়াত ছাড়াও আরও অনেক রেওয়ায়েত রয়েছে যা থেকে বোঝা যায় যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমত বিশ্বজনীন৷

রাসূল (সা.) বলেছেন যে, আল্লাহ তাআলা বলেছেন: আমি তাদের (বার ইমামের) মাধ্যমে ইসলামকে সকল দ্বীনের উপর জয়যুক্ত করব এবং তাদের মাধ্যমে আমার নির্দেশকে বাস্তবয়ন করব৷ আার সর্বশেষ জনের (ইমাম মাহ্দীর) মাধ্যমে গোটা বিশ্বকে শত্রুর হাত থেকে মুক্ত করব এবং তাকে প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্যের অধিপতি করব (কামালুদ্দিন খণ্ড- ১, বাব ২৩, হাঃ ৪, পৃ.-৪৭৭)৷

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

القائم منا يبلغ سلطانه المشرق و المغرب و يظهر الله عزوجل به دينه علی الدين کله ولوکره المشرکون

কায়েম হচেছ রাসূল (সা.)-এর বংশ থেকে এবং তিনি প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্যের অধিপতি হবেন, আল্লাহ তাকে অপর সমস্ত দ্বীনের উপর জয়যুক্ত করবেন, মুশরিকরা অপ্রীতিকর মনে করলেও (কামালুদ্দিন খণ্ড- ১, বাব ২৩, হাঃ ১৬, পৃ.-৬০৩)৷

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের রাজধানী হচেছ ঐতিহাসিক কুফা শহর৷ সে সময়ে কুফার পরিধি আরও বৃদ্ধি পাবে এবং নাজাফও কুফার মধ্যে পড়বে আর সে কারণেই কিছু কিছু হাদীসে নাজাফকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের রাজধানী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে৷

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের রাজধানী হচেছ কুফা শহর এবং বিচার কার্যের স্থান হচেছ কুফার মসজিদ (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৫৩, পৃ.-১১)৷

বলাবাহুল্য যে, কুফা শহর বহু দিন আগে থেকেই রাসূল (সা.)-এর বংশের নিকট অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল৷ আলী (আ.) সেখানে হুকুতম করতেন, কুফার মসজিদ ইসলামের চারটি নামকরা মসজিদের একটি সেখানে হযরত আলী (আ.) নামাজ পড়াতেন, খোৎবা দিতেন, বিচার করতেন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি ঐ মসজিদের মেহ্রাবে শাহাদত বরণ করেন৷

২) - হুকুমতের সময় সীমা

দীর্ঘ দিন ধরে মানুষ জালেম ও অত্যাচারী শাসকদের হুকুমতের মধ্যে থাকার পর ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের মাধ্যমে পৃথিবী ভালর দিকে ধাবিত হবে৷ তখন সৎকর্মশীলদের মাধ্যমে পৃথিবী পরিচালিত হবে এবং এটা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি যা অবশ্যই বাস্তবাইত হবে৷

সৎকর্মশীলদের হুকুমত যা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর নেতৃত্বে শুরু হবে এবং দুনিয়ার শেষ পর্যন্ত চলতে থাকবে এবং আর কখনোই জালেমদের হুকুমত আসবে না৷

হাদীসে কুদসীতে আরও বর্ণিত হয়েছে: ইমাম মাহ্দী হুকুমতে অধিষ্টিত হওয়ার পর তা কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে এবং এ হুকুমত আল্লাহর ওয়ালী ও তাঁদের বন্ধুদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে (কামালুদ্দিন, খণ্ড- ১, বাব ২৩, হাঃ ৪, পৃ.-৪৭৭৷

সুতরাং ইমাম মাহ্দী (আ.) যে, ন্যায়পারায়ণ হুকুমত গড়ে তুলবেন তা কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে৷ তারপর আর কোন সরকার আসবে না এবং প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে, যেখানে সকলেই ঐশী হুকুমতের ছত্রছায়ায় জীবন-যাপন করবে৷

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন: আমাদের সরকার শেষ সরকার, অন্য সকলেই আমাদের পূর্বে রাজত্ব করবে৷ কাজেই আমাদের শাসনব্যাবস্থা দেখে আর কেউ বলতে পারবে না যে, আমরা থাকলেও ঠিক এভাবেই শাসন করাতাম (গাইবাতে তুসী, অধ্যায়-৮, হাঃ ৪৯৩, পৃ.-৪৭২)৷

সুতরাং আবির্ভাবের পর থেকে ঐশী হুকুমত কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে এবং ইমাম মাহ্দী (আ.) তাঁর জীবনের শেষ পর্যন্ত হুকুমত করবেন৷

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের সময় সীমা এতটা হতে হবে যে, তিনি সে সময়ের মধ্যে পারবেন পৃথিবীকে ন্যায়নীতিতে পরিপূর্ণ করতে৷ কিন্তু এ উদ্দেশ্য কয় বছরের মধ্যে সাধিত হবে তা ধারণা করে বলা সম্ভব নয়৷ এ জন্য পবিত্র ইমামদের হাদীসের স্মরণাপন্ন হতে হবে৷ তবে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর যোগ্যতা, আল্লাহর সাহায্য, যোগ্য সাথী, পৃথিবীর মানুষের প্রস্তুতি সব মিলিয়ে খুব কম সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর মহান উদ্দেশ্যে উপনীত হবেন৷ যুগ যুগ ধরে মানুষ যা অর্জন করতে পারে নি ইমাম মাহ্দী (আ.) ১০ বছরের কম সময়ে তা অর্জন করবেন৷

যে সকল রেওয়ায়াতে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের সময়সীমা বর্ণিত হয়েছে তা বিভিন্ন ধরনের৷ কিছু হাদীসে ৫ বছর, কিছুতে ৭ বছর, কিছুতে ৮/৯ বছর, কিছুতে ১০বছর উল্লেখ করা হয়েছে৷ কয়েকটি রেওয়ায়াতে ১৯ বছর কয়েক মাস এমনকি কোন কোন হাদীসে ৪০ থেকে ৩০৯ বছর পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে (চেশম আন্দাযী বে হুকুমাতে মাহ্দী (আ.), নাজমুদ্দিন তাবাসী, পৃ.-১৭৩-১৭৫)৷

তবে রেওয়ায়াতে এ ভিন্নতার কারণ আমাদের কাছে স্পষ্ট নয় এবং এত রেওয়ায়াতের মধ্য থেকে সঠিক সময় নির্ধারণ করা অতি কঠিন ব্যাপার৷ তবে বড় বড় আলেমগণ ৭ বছরকে নির্বাচন করেছেন (আল মাহদী, সাইয়্যেদ সাদরুদ্দিন সাদর পৃ.-২৩৯, তারিখে মা বায়দে জহুর, সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ সাদর)৷

অনেকে আবার বলেছেন ইমাম মাহ্দী (আ.) ৭ বছর হুকুমত করবেন কিন্তু তাঁর হুকুমতের প্রতি এক বছর বর্তমান বছরের ১০ বছরের সমান৷

রাবি ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের সময়সীমা সম্পর্কে প্রশ্ন করলে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন: ইমাম মাহ্দী (আ.) ৭ বছর হুকুমত করবেন তবে তা বর্তমান বছরের ৭০ বছরের সমান (গাইবাতে তুসী, অধ্যায় ৮, হাঃ ৪৯৭, পৃ.-৪৭৪)৷

মরহুম মাজলিসী (রহ.) বলেছেন: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের সময়সীমা সম্পর্কে যে সকল হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার প্রতি দৃষ্টিপাত করার প্রয়োজন মনে করছি: কিছুতে হুকুমতের পরের সময়কে বোঝানো হয়েছে৷ কিছুতে হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময়কে বোঝানো হয়েছে৷ কিছুতে বর্তমান বছর ও মাসের কথা বলা হয়েছে এবং কিছুতে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময়ের বছর ও সময়কে বুঝানো হযেছে, হকিকত আল্লাহই জানেন (বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড- ৫২, পৃ.-২৮০)৷

৩)- ইমামের হুকুমতের আদর্শ

প্রতিটি শাসকই তার হুকুমত পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ আদর্শ মেনে চলে যা তার হুকুমতের নিদর্শন৷ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এরও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে৷ যদিও এর পূর্বে ইমামের রাষ্ট্র পরিচালন পদ্ধতির উপর কিছু ইঙ্গিত করা হয়েছে কিন্তু বিষয়টির গুরুত্বের জন্য স্বতন্ত্রভাবে এ বিষয়ের প্রতি এখানে আলোচনা করা হল৷ আর ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমত সম্পর্কে আরও ভাল করে জানার জন্য রাসূল (সা.) ও পবিত্র ইমামগণের বাণীর দিকে দৃষ্টি দিব৷

প্রথমে যে বিষয়টির উপর গুরুত্ব দিতে হবে তা হল রেওয়ায়াতের আলোকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আদর্শের যে চিত্র বর্ণিত হয়েছে তা রাসূল (সা.)-এর আদর্শ ও পদ্ধতিরই অনুরূপ৷ রাসূল (সা.) যেভাবে অজ্ঞদের সাথে সংগ্রাম করেছিলেন এবং চিরন্তন ইসলাম যা দুনিয়া ও আখেরাতের সৌভাগ্যের সোপান তা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন৷ ইমাম মাহদী (আ.)ও তাঁর আবির্ভাবের মাধ্যমে আধুনিক অজ্ঞতার সাথে যা কিনা রাসূল (সা.)-এর সময়ের অজ্ঞতার চেয়েও বেশী ভয়ঙ্কর তার সাথে সংগ্রাম করবেন এবং ইসলামী ও ঐশী মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করবেন৷

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

صنع کما صنع رسول الله (ص) يهدم ما کان قبله کما هدم رسول الله (ص) امر الجاهلية و يستأنف الاسلام جديدا

ইমাম মাহ্দী (আ.) রাসূল (সা.)-এর মতই পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন৷ রাসূল (সা.) যেভাবে অজ্ঞদের সকল কুসংস্কারকে ধবংস করেছিলেন, ইমাম মাহ্দী (আ.)ও আধুনিক সকল অজ্ঞতা ও কুসংস্কারকে দূর করে ইসলামের সঠিক স্বরূপকে প্রতিষ্ঠা করবেন (গাইবাতে নোমানি বাব ১৩, হাঃ ১৩, পৃ.-২৩৬)৷

৪) - ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর যুদ্ধ পদ্ধতি

ইমাম মাহ্দী (আ.) তাঁর বিশ্বজনীন বিপ্লবের মাধ্যমে কুফর ও র্শিককে পৃথিবীকে থেকে উৎখাৎ করবেন এবং সকলকে পবিত্র ইসলামের দিকে আহবান করবেন৷

এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন: তাঁর আদর্শ ও পদ্ধতি আমার আদর্শের আনুরূপ৷ সে জনগণকে আমার দ্বীন ও শরিয়তে প্রতিষ্ঠিত করবে (কামালুদ্দিন খণ্ড- ২, বাব ৩৯, হাঃ ৬, পৃ.-১২২)৷

তবে তিনি এমন সময় আবির্ভূত হবেন যখন সত্য এমনভাবে প্রকাশ পাবে যে, সর্ব দিকে থেকে তা সাবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে৷

তার পরও বিভিন্ন রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.) অবিকৃত তৌরাত ও ইঞ্জিলের মাধ্যমে ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে আলোচনা করবেন এবং তাদের অনেকেই মুসলমান হয়ে যাবে (আল ফিতান পৃ.-২৪৯-২৫১)৷ এর মধ্যে সবচেয়ে বেশী যে জিনিসটি সবাইকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করবে তা হচেছ যে, ইমাম মাহ্দী (আ.) অদৃশ্য থেকে সাহায্য প্রাপ্ত হচেছন এবং তাঁর মধ্যে নবীদের নিদর্শন রযেছে তা স্পষ্ট বুঝা যাবে৷ যেমন: হযরত সুলাইমান (আ.)-এর আংটি, হযরত মুসার লাঠি এবং রাসূল (সা.)-এর বর্ম, তলোয়ার ও পতাকা তাঁর কাছে থাকবে (ইছবাতুল হুদা, খণ্ড- ৩, পৃ: ৪৩৯-৪৯৪)৷ তিনি রাসূল (সা.)-এর উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন এবং বিশ্বজনীন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্যে সংগ্রাম করবেন৷ এটা স্পষ্ট যে, এই সুন্দর পরিবেশে যেখানে সত্য সম্পুর্ণরূপে সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে৷ কেবলমাত্র তারাই বাতিলের পক্ষে থাকবে যারা সম্পূর্ণরূপে তাদের মানবতা ও ঐশী গুনাবলীকে নষ্ট করে ফেলছে৷ এরা তারা, যারা সারাজীবন অন্যায়-অত্যাচার, ফ্যাসাদ ও কামনা-বাসনার মধ্যে নিমজ্জিত ছিল এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর পবিত্র হুকুমত থেকে তাদেরকে উৎখাৎ করা হবে৷ তখন ইমাম মাহ্দী (আ.) তাঁর তলোয়ার বের করবেন এবং অত্যাচারিদের মাথা দিখণ্ডিত করবেন৷ এটা রাসূল (সা.) ও আলী (আ.)-এর পদ্ধতিও বটে (ইছবাতুল হুদা, খণ্ড- ৩, পৃ: ৪৫০)৷

৫) - ইমাম মাহদী (আ.)-এর বিচার পদ্ধতি

যেহেতু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য ইমাম মাহ্দী (আ.)-কে গচিছত করে রাখা হযেছে, তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করার জন্য একটি সুন্দর বিচার বিভাগ গঠন করবেন৷ সুতরাং তিনি এ ক্ষেত্রে হযরত আলী (আ.)-এর নীতি অনুসরণ করবেন এবং তাঁর সর্বশক্তি দিয়ে মানুষের হারিয়ে যাওয়া অধিকারকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিবেন৷

তিনি এমন ন্যায়ের ভিত্তিতে আচরণ করবেন যে, যারা জীবিত তারা বলবে যে, যারা মৃত্যুবরণ করেছে তারা যদি ফিরে আসত তাহলে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়বিচার থেকে লাভবান হতে পারত (আল ফিতান পৃ.-৯৯)৷

বলাবাহুল্য যে, কিছু কিছু রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.) বিচারের আসনে হযরত সুলাইমান (আ.) ও হযরত দাউদ (আ.)-এর মত আচরণ করবেন এবং তাঁদের মত ঐশী জ্ঞানের মাধ্যমে বিচার করবেন, সাক্ষ্য-প্রামাণের মাধ্যমে নয়৷

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: আমাদের কায়েম যখন কিয়াম করবে তখন হযরত সুলাইমান (আ.) ও হযরত দাউদ (আ.)-এর মত বিচার করবে অর্থাৎ সাক্ষ্য-প্রামাণের প্রয়োজন হবে না (ঐশী জ্ঞানের মাধ্যমে বিচার করবেন) (ইছবাতুল হুদা খণ্ড- ৩, পৃ.-৪৪৭)৷

এ ধরনের বিচারের রহস্য হয়ত এটা হতে পারে যে, ঐশী জ্ঞানের মাধ্যমে বিচার করলে সঠিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে৷ কেননা, মানুষের সাক্ষ্যর ভিত্তিতে বিচার করলে বাহ্যিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হতে পারে প্রকৃত ন্যায়বিচার নয়৷ কারণ মানুষের দ্বারা ভুল হতেই পারে৷ তবে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিচার পদ্ধতিকে উপলব্ধি করা অতি কঠিন ব্যাপার তবে তাঁর সময়ের সাথে এ পদ্ধতির মিল রয়েছে৷

৬) - ইমাম মাহদী (আ.)-এর পরিচালনা পদ্ধতি

একটি হুকুমতের প্রধান ভিত্তি হচেছ তার কর্মীরা৷ একটি প্রশাসনের কর্মচারিরা যদি যোগ্য হয় তাহলে দেশের সকল কর্ম সঠিকভাবে পরিচালিত হবে একং উদ্দেশ্যে উপণীত হওয়া সহজতর হবে৷

ইমাম মাহ্দী (আ.) বিশ্বের নেতা হিসাবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের জন্য যোগ্য পরিচালক বা গভর্ণর নিয়োগ করবেন৷ যাদের মধ্যে একজন ইসলামী নেতার সকল বৈশিষ্ট্য যেমন: জ্ঞান, প্রতিজ্ঞা, নিয়ত, আমল এবং বলিষ্ঠ সিন্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে৷ তাছাড়াও ইমাম মাহ্দী (আ.) সমগ্র বিশ্বের নেতা হিসাবে সবর্দা তাদের কাজের উপর দৃষ্টি রাখবেন এবং তাদের কাছে হিসাব নিবেন৷ এই প্রধান বৈশিষ্ট্য যা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের পূর্বে সকলেই ভুলে গিয়েছিল হাদীসে তা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর পরিচয় হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে৷

রাসূল (সা.) বলেছেন:

علامة المهدی ان يکون شديدا علی العمال جوادا بالمال رحيما بالمساکين

ইমাম মাহদীর চিহ্ন হচেছ কর্মচারিদের কাজে কড়া নজর রাখবেন৷ অধিক দান-খয়রাত করবেন এবং মিসকিনদের প্রতি অতি দয়ালূ হবেন (মোজামে আহাদীসে আল ইমাম আল মাহদী, খণ্ড- ১, হাঃ ১৫২, পৃ.-২৪৬)৷

৭) - ইমাম মাহদী (আ.)-এর অর্থনৈতিক পদ্ধতি

অর্থ বিভাগে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর পদ্ধতি হচেছ সাম্য অর্থাৎ সবার মাঝে সমানভাবে অর্থ বন্টন করা৷ যে নীতি রাসূল (সা.) নিজেও অবলম্বন করতেন৷ রাসূল (সা.)-এর পর এ নীতির পরিবর্তন ঘটে এবং অর্থ বন্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্য দেখা দেয়৷ তবে ইমাম আলী (আ.) ও ইমাম হাসান (আ.)-এর সময়ে আবারও মানুষের সমান অধিকারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়৷ কিন্তু তারপর উমাইয়্যা শাসকরা মুসলমানদের সম্পদকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদ হিসাবে ব্যবহার করতে থাকে এবং তাদের অবৈধ হুকুতমকে বলিষ্ঠ ও শক্তিশালী করে৷ তারা মুসলমানদের সম্পত্তিসমূহকে নিজেদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের মাঝে বন্টন করে দেয়৷ এ পদ্ধতি ওছমানের সময় থেকে শুরু হয় এবং উমাইয়্যাদের সময়ে তা একটি নীতিতে পরিণত হয়৷

ইমাম মাহ্দী (আ.) একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসাবে বাইতুলমালকে সবার মাঝে সমানভাবে বন্টন করবেন এবং মুসলমানদের সম্পদকে (আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে) দান করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করবেন৷

রাসূল (সা.) বলেছেন:

اذا قام قائمنا اضمحلت القطائع فلاقطائع

আমাদের কায়েম যখন কিয়াম করবে তখন অত্যাচারি শাসকরা যে সকল সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করেছিল বা আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে বন্টন করেছিল তা ফিরিয়ে নেওয়া হবে এবং তাদের নিকট আর কোন সম্পত্তি থাকবে না (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৫২, পৃ.-৩০৯)৷

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আর একটি বৈশিষ্ট্য হচেছ সকল মানুষের সমস্যার সমাধান করা এবং তাদের জন্য একটি সচছল জীবন গঠন করা৷ ইমাম মাহ্দী (আ.) প্রচুর সম্পদ মানুষকে দান করবেন এবং নির্ভরশীল ব্যক্তিরা সাহায্য চাইলে তাদেরকে সাহায্য করবেন৷

রাসূল (সা.) বলেছেন:

فهو يحثوا المال حثوا

সে অধিক সম্পদ দান-খয়রাত করবে (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৫২, পৃ.-৩০৯)৷

এ পদ্ধতিতে ব্যক্তি ও সমাজকে সংশোধন করা সম্ভব যেটা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর মহান উদ্দেশ্য৷ তিনি জনগণকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করার মাধ্যমে মানুষের ইবাদত-বন্দেগির পথকে সুগম করবেন৷

৮) - ইমাম মাহদী (আ.)-এর ব্যক্তিগত আদর্শ

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ব্যক্তিগত আচরণ এবং জনগণের সাথে ব্যবহারে তিনি একজন ইসলামী শাসকের উত্তম আদর্শ৷ তাঁর দৃষ্টিতে হুকুমত হচেছ মানুষকে খেদমত করার একটি মাধ্যম এবং তাদেরকে পরিপূর্ণতায় পৌঁছানোর একটি স্থান৷ সেখানে পুজিবাদি ও অত্যাচারিদের কোন স্থান নেই৷

তিনি রাসূল (সা.) ও আলী (আ.)-এর ন্যায় জীবন-যাপন করবেন৷ সকল ধন-সম্পদ তাঁর আয়ত্বে থাকা সত্ত্বেও তিনি অতি স্বাভাবিক জীবন-যাপন করবেন৷

ইমাম আলী (আ.) তাঁর সম্পর্কে বলেছেন: সে (মাহ্দী বিশ্বের নেতা হওয়া সত্ত্বেও) প্রতিজ্ঞা করবে যে, প্রজাদের মত চলাফেরা করবে, পোশাক পরিধান করবে ও তাদের মতই বাহনে চড়বে এবং অতি অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকবে (মুনতাখাবুল আছার অধ্যায় ৬, বাব ১১, হাঃ ৪, পৃ.-৫৮১)৷

ইমাম আলী (আ.) ও পার্থিব জগতে খাদ্য, পোশাক ও অন্যান্য সকল দিক দিয়ে রাসূল (সা.)-এর অনুরূপ ছিলেন৷ ইমাম মাহ্দী (আ.)ও তাঁর অনুসরণ করবেন৷

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

ان قائمنا اذا قام لبس لباس علی و سار بسيرته

আমাদের কায়েম যখন কিয়াম করবেন হযরত আলী (আ.)-এর পোশাক পরিধান করবেন এবং তার পদ্ধতিতেই দেশ পরিচালনা করবেন (ওছয়েলুশ শিয়া খণ্ড- ৩, পৃ.-৩৪৮)৷

তিনি নিজে কষ্টে জীবন-যাপন করবেন কিন্তু উম্মতের সাথে একজন দয়ালু পিতার ন্যায় আচরণ করবেন৷ তাদের কল্যাণ ও সৌভাগ্য কামনা করবেন, ইমাম রেযা (আ.) বলেছেন:

الامام الانيس الرفيق والوالد الشفيق والاخ الشقيق والام البرة بالئلد الصغير مفزع العباد فی الداهية الناد

ইমাম, সহধর্মি, সহপাটি, দয়ালু পিতা, আপন ভাই, সন্তানদের প্রতি মমতাময়ী মাতা এবং কঠিন মুহুর্তে মানুষের আশ্রয়স্থল (উছুলে কাফী খণ্ড- ১, হাঃ ১, পৃ.-২২৫)৷

হ্যাঁ তিনি সবার সাথে এত ঘনিষ্ট ও এত বেশী নিকটবর্তী যে, সকলেই তাঁকে নিজেদের আশ্রয়স্থল মনে করবে৷

রাসূল (সা.) ইমাম মাহ্দী (আ.) সম্পর্কে বলেছেন: তাঁর উম্মত তাঁর কাছে আশ্রয় নিবে যেভাবে মৌমাছিরা রানী মাছির কাছে আশ্রয় নেয় (মুনতাখাবুল আছার অধ্যায় ৭, বাব ৭, হাঃ ২, পৃ.-৫৯৭)৷

তিনি জন নেতার উত্তম দৃষ্টান্ত, তিনি তাদের মধ্যে তাদের মতই জীবন-যাপন করবেন৷ এ কারণেই তিনি তাঁদের সমস্যাকে সহজেই উপলব্ধি করবেন এবং তার প্রতিকারও তিনি জানেন৷ তিনি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবেন৷ এমতাবস্থায় কেনইবা উম্মত তাঁর পাশে নিরাপত্তা ও শান্তি অনুভব করবে না এবং কোন কারণে তাঁকে ছেড়ে অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হবে?

৯) - জনপ্রিয়তা

হুকুমতসমূহের একটি বড় চিন্তা হচেছ কিভাবে জনগণের কাছে প্রিয় হবে৷ কিন্তু তাদের নানাবিধ ত্রুটির জন্য কখনোই তারা মানুষের কাছে প্রিয়ভাজন হতে পারে নি৷ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচেছ জনপ্রিয়তা৷ তাঁর হুকুমত শুধুমাত্র পৃথিবীর অধিবাসিদের জন্যই জনপ্রিয় হবে না বরং তা আসমানের অধিবাসি ফেরেশ্তাগণের কাছেও প্রিয় হবে৷

রাসূল (সা.) বলেছেন: তোমাদেরকে মাহ্দীর সুসংবাদ দান করছি যার প্রতি আসমান ও যমিনের সকলেই রাজি ও সন্তুষ্ট থাকবে৷ আর কেনইবা তারা সন্তুষ্ট থাকবে না যখন জানতে পারবে যে, দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ ও সৌভাগ্য কেবলমাত্র তাঁর ঐশী হুকুমতের ছায়াতলেই অর্জন করা সম্ভব (বিহার খণ্ড- ৫১, পৃ.-৮১)৷

এ ধ্যায়ের শেষে আমরা ইমাম আলী (আ.)-এর অমিয় বাণী দিয়ে ইতি টানব:

আল্লাহ্ তাআলা তাকে ও তাঁর সাহায্যকারীদেরকে ফেরেশ্তাদের মাধ্যমে সাহায্য করবেন এবং নিজের নিদর্শনের মাধ্যমেও তাকে সাহায্য করবেন৷ তাকে পৃথিবীর উপর বিজয় দান করবেন এবং সকলেই তার দিকে আকৃষ্ট হবে৷ তিনি পৃথিবীকে ন্যায়নীতিতে আলোকিত করবেন৷ সকলেই তার প্রতি ঈমান আনবে এবং কাফেরদের কোন অস্তিত্ব থাকবে না, অত্যাচারি থাকবে না, এমনকি পশু-পাখিরাও একত্রে বসবাস করবে৷ পৃথিবীর সকল সম্পদ বেরিয়ে আসবে, আসমানও তার বরকত বর্ষন করবে এবং যমিনের সকল গুপ্তধন প্রকাশ পাবে৷ সুতরাং তাদের প্রতি সুসংবাদ যারা তাঁর সময়কে দেখবে এবং তার কথা শুনতে পাবে (ইছবাতুল হুদা, খণ্ড- ৩, পৃ.-৫২৪)৷

মন্তব্য

একটি মন্তব্য

* একটি তারকা চিহ্নিত ফিল্ড অবশ্যই মান থাকা আবশ্যক।