আমরাও অপেক্ষায় ছিলাম

আমরাও অপেক্ষায় ছিলাম

অপেক্ষা বা ইন্তেযার যা আমাদের দীনি সম্প্রদায়ে এসেছে সে সম্পর্কে আলোচনা করতে হলে অবশ্যই আমাদের নিজেদের জীবনের দিকে লক্ষ্য করতে হবে। যাতে করে ইন্তেযার আমাদের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত হয়।

قال امام صادق (ع) : ان لنا دولة يجيئ بهاالله اذا شاءثم قال: من سران يكون من اصحاب القائم (ع) فلينتظر و ليعمل بالوغ و محاسن الاخلاق و هو منتظر

মুন্তাখাবুল আছার, পৃ.-৪৯৭, হাদীস-৯।

অপেক্ষা বা ইন্তেযার যা আমাদের দীনি সম্প্রদায়ে এসেছে সে সম্পর্কে আলোচনা করতে হলে অবশ্যই আমাদের নিজেদের জীবনের দিকে লক্ষ্য করতে হবে। যাতে করে ইন্তেযার আমাদের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত হয়।

প্রত্যেক ব্যাক্তিই যে কোন পরিস্থিতিতে এবং যে কোন বয়সেই ইন্তেযারের সাথে জীবর যাপন করে থাকে, সকালে যখন ঘুম থেকে উঠে তখন রাতের ও রাতে ঘুমিয়ে দিনের আলোর অপেক্ষায় থাকে। নব যৌবনে, যৌবনের অপেক্ষায় আর বিবাহের পর সন্তানের অপেক্ষায় দিন প্রবাহিত করে। এরুপে আমাদের জীবনের প্রত্যেকটি মুহূর্তই অপেক্ষার সাথে পরিবাহিত হয়ে থাকে।

আর আমাদের জীবনে এই অপেক্ষাকে দেওয়া হয়নি বরং আমাদের সৃষ্টির সাথেই সম্পৃক্ত আর যেহেতু আমাদের জীবনের সাথে মিশে আছে সেহেতু অবশ্যই একটি সঠিক বর্ননা দ্বারা ব্যাখ্যা দিতে হবে।

এমতাবস্থায় মনে হচ্ছে ইন্তেযার শব্দটি তিনটি মুল অর্থের মাধ্যমে প্রকাশ পায় যা নিন্মরুপ:

১) বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্মত ও সন্তুষ্ট না থাকা । অতএব চলমান পরিস্থিতিতে রাজি নেই যার কারনে অন্য কিছুর অপেক্ষায় থাকে।

২) ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদি থাকা এবং এই আশায় যে ভবিষ্যত অতিতের থেকে আরো বেশি ভাল হবে।

৩) চেষ্টা ও আন্দোলন করা (সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য)। যে স্কুলে পড়াশোনা করে ও কলেজে যেতে চায় অথবা চলমান পরিস্থিতিতে রাজি নয় অথবা সম্মত নয় (অবশ্য সর্বদা রাজি থাকাটাই শর্ত নয় বরং সম্মত না থাকাটা এবং আরো বেশি কিছু পাওয়াটাই উদ্দেশ্য) যেমন: S.S.C পাশ করাটাই যথেষ্ট নয় এবং আরো উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে চায়।

এছাড়া এই সামর্থ্যটি সে নিজের মধ্যে অনুভব করে যার কারনে সামনে অগ্রসরের চেষ্টা করে এবং সাফল্যতাই পৌছানোর জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছু সংগ্রহ করে। সংক্ষিপ্ত বর্ননাতে ইন্তেযারের অর্থ এই তিনটি মুল অর্থকেই ভিত্তি করে থাকে।

আমার চিন্তামতে দীন ও ধর্মের কাজ হচ্ছে মানুষের জীবনে যা কিছু আছে তার গভীরত্ব ও ব্যাপকতা বৃদ্ধি করা, এই অর্থে যে এমন কোন জিনিস নেই যা দীন মানুষের জীবনে সৃষ্টি করে থাকে না, ও কোনক্রমেই এর ব্যাতিক্রম খুজে পাওয়া সম্ভব নয়।

অন্য অর্থে দীন জীবনের সঠিক অর্থকে মানুষের জন্য সম্প্রসারণ করে ও মানুষকে বোঝায় যে জীবনের সীমাবদ্ধতা এতটুকুই নই বরং আরো অনেক ব্যাপক এবং তদরুপ দীন মানুষের চিন্তাধারার গভীরতাকেও বৃদ্ধি দেই। অর্থাৎ মানুষকে বোঝাতে চাই যে জীবনের সারাংশ এই নই বরং পরবর্তী পর্যায়ও আছে। উদাহরন স্বরুপ যদি কেউ তার জীবনে যা কিছুই আছে তা থেকে সন্তুষ্ট থাকে এবং এ কারনে আল্লাহ তায়ালার কাছে শোকর আদায় করে, দীন নতুন করে তাকে শোকর আদায় করা শেখাবে না বরং দীন মানুষের এই উপলব্ধি কে ব্যাপক করে তুলবে ও অন্যান্য ইবাদতের ক্ষেত্রেও এইরুপ। দীন ইন্তেযারের (অপেক্ষার) ক্ষেত্রেও এরুপ করে থাকে। সবাই ইন্তেযারের সাথে জীবন যাপন করে- যা পূর্বে বলা হয়েছে - দীন এই অপেক্ষাকে মানুষের জীবনে আরো ব্যাপক করে অতপর সেটিকে গভীরতা দিয়ে থাকে। বিপরীত ভাষায় বলতে, দীন মানুষের যা আছে তা সম্পূর্ন করে ।

আমরাও অপেক্ষায় ছিলাম, যেমন আমাদের ছেলে মেয়েদের বিয়ের অপেক্ষায় ছিলাম, আমাদের সকলের পরিপক্বতায় পৌছানোর , প্রত্যেকের পুণ্যবান হওয়ার , জ্ঞানী হওয়ার ও ইত্যাদির অপেক্ষায় ছিলাম। এ সমস্ত চাওয়া গুলিও এক প্রকার অপেক্ষা কিন্তু একক এবং সামষ্টিক নয়। কিন্তু দীন এ সমস্ত একক অপেক্ষাগুলিকে ব্যাপক করে তোলে অর্থাৎ দীন বলে তুমি শুধুমাত্র নিজের ও আশেপাশের মানুষের উন্নতির অপেক্ষায় থেকোনা বরং এরুপ পাওয়াটি সবার জন্য অপেক্ষা কর, অর্থাৎ সবার জন্য চিন্তিত থাকো। যদি নিজে পরিপূর্ণ বা পরিপক্বতায় না পৈাছে থাকো তাহলে সবার পরিপূর্ণতায় পৌছানোর চেষ্টা কর। আর এই ব্যাপকতা দীনের মাধ্যমে হয়ে থাকে। দীন এই ব্যাপকতার সাথে বলে দেই যে অপেক্ষা শুধুমাত্র বাহ্যিক জীবনের না হয়, এ অপেক্ষা নিঃশর্ত সত্য বহিঃপ্রকাশের জন্য, সর্বোত্তম আদালতের আবির্ভাবের জন্য হতে হবে। অতএব যে সমস্ত রেওয়াতসমুহে বলা হয় ‘‘কোন যাতির মধ্যে সর্বোত্তম সেই যে অপেক্ষাকারী’’ মুন্তাখাবুল আছার, পৃ.-৪৯৯, হাদীস-১৬।

অথবা ‘‘উত্তম পরিস্থিতিতে পৌছানোর অপেক্ষায় থাকো’’ কামালুদ্দিন ও তামামু ন্নেয়ামত, শেইখ ছাদুক, খন্ড-২, পৃ.-৬৪৫, হাদীস-৪।

এ ছাড়াও অন্যান্য অনেক রেওয়ায়েত যা হযরত মোহাম্মাদ (সা.)-এর কাছ থেকে বর্ণিত হয়েছে কিন্তু সেখানে ইমাম মাহদী (আ.)-এর কথা উল্লেখ কর হয়নি, আর এ থেকেই আমরা ইন্তেযার শব্দের অর্থকে ব্যাপক ও সবধরনের অপেক্ষার ক্ষেত্রেই ব্যাবহার করে থাকি, আর এই আশা আমাদের জীবনে উন্নতি করতে এবং সেজন্য চেষ্টা করতে সাহয্য করে থাকে।

বিস্তারিত জানার জন্য রুজু করুন কামলুদ্দিন, খন্ড-২, পৃ.-৬৪৪-৬৪৭।

তবে এ বিষয়ের প্রতি অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে অপেক্ষা বা ইন্তেযার নিয়ে যে সমস্ত রেওয়ায়েতসমুহ আছে সেগুলি সাধারন অর্থে অপেক্ষা দাড়ায় কিন্তু মুল অর্থে ইমাম মাহদী (আ.) এর অস্তিত্ব ও উপস্থিতিকেই বোঝায়। কেননা ইমাম (আ.)-এর অদৃশ্যের পূর্বেও এরুপ আলোচনা ছিল যা রেওয়াতসমুহতে ইন্তেযার শব্দে ব্যাবহার হয়েছে এবং মাসুমিনগণের (আ.) রেওয়ায়েতসমূহ থেকেও এরুপ বোঝা যায়।

প্রত্যেক কালচক্রতেই এ সমস্ত শব্দগুলির ব্যবহার হয়ে থাকে তবে সবচেয়ে উন্নত ও পুণাঙ্গভাবে ইন্তেযার শব্দের অর্থ ইমাম মাহদি (আ.)-এর আবির্ভাবের সাথেই প্রকাশ পাবে, প্রত্যেক বছর এ বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে ইমাম (আ.)-এর আবির্ভাবের অপেক্ষাই থেকে এই অপেক্ষার ফলাফল দেখা সম্ভব ।

অতএব যে বিষয়টি গুরুত্ব আরোপ করে সেটি হচ্ছে ইমাম মাহদী (আ.)-এর সাথে এই ইন্তেযার পরিপূর্ণ হবে এবং তার পূণাঙ্গবস্থায় পৌছাবে।

উপোরোক্ত আলোচনা থেকে এ বিষয়টি পরিষ্কার যে দীন মানুষের এই ইন্তেযারকে উদ্ভাবন করেনা বরং সেটিকে আরো ব্যাপক করে তোলে, অন্য অর্থে দীন মানুষের প্রকৃতির সাথে বিরোধিতা করেনা বরং মানুষের প্রকৃতি গঠন করে এবং সেটিকে সঠিক রাস্তায় হেদায়াত করে।

মন্তব্য

একটি মন্তব্য

* একটি তারকা চিহ্নিত ফিল্ড অবশ্যই মান থাকা আবশ্যক।