মাহদীইজমের দৃষ্টিতে ন্যায়পরায়নতার বিভিন্নদিক

মাহদীইজমের দৃষ্টিতে ন্যায়পরায়নতার বিভিন্নদিক

মাহদীইজমের দৃষ্টিতে ন্যায়পরায়নতার বিভিন্নদিক

সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা থেকে দেখা যায় যে শিয়া ও সুন্নি মাযহাবের রেওয়াতসমূহে ইমাম মাহদী (আ.) এর আবির্ভাব সম্পর্কে যে বিষয়টি বেশি লক্ষনীয়, সেটি হচ্ছে ইমাম (আ.) এর মাধ্যমে অত্যাচারীর পতন ও অত্যাচারের ধবংস এবং আদালতের প্রতিষ্ঠা।

মুন্তাখাবুল আছার নামক গ্রন্থের লেখক এ বিষয়ের উপর পর্যালোচনা করে দেখেছে যে সুন্নি ও শিয়া মাযহাব সূত্রে আনুমানিক ১৩০ টি হাদিস এই বিষয়টিকে প্রমান করে যে ইমাম মাহদী (আ.) জুলুম ও অত্যাচার যখন জমিন কে আকড়ে ধরবে ও অত্যাচারের শোরগোল সমস্ত জায়গায় দেখা যাবে তখন ইমাম (আ.) আসবে এবং দুনিয়াতে ন্যায়বিচার ও আদালতে পরিপূর্ণ করবে। সাফি গুলপায়গানির মুন্তাখাবুল আছার ফিল ইমামিস সানি আশার, পৃ:-৪৭৮।

এ সম্পর্কে এই রেওয়ায়েতটি ইংগিত করা যায় : হযরত মোহাম্মাদ (সা.) বলেছেন : তোমাদেরকে সুসংবাদ দিচ্ছি যখন মানুষেরা বিশৃংখলা, গোলাযোগ ও মতবিরোধের মধ্যে পড়বে তখন আমার উম্মাতের মধ্যে মাহদী (আ.) আবির্ভাব করবে, সে পৃথিবীকে আদালত ও সমকক্ষতার সাথে ভরে তুলবে, ঠিক যেরুপে অন্যায় ও অত্যাচারে পরিপূর্ণ হয়েছিল। ইবনে হানবালের আল মুসনাদ, খন্ড-৩, পৃ.-৩৭।

ইমাম বাকের (আ.)-এর থেকেও বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম (আ.) বলেছেন: আমার পিতা তার পিতার কাছ থেকে ও সে তার পিতাদের কাছ থেকে এবং এরুপে হযরত মোহাম্মাদ (সা.) কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন : আমার পর ইমামগন বার জন হবে, নয় জন ইমাম হোসাইন (আ.)-এর বংশ থেকে এবং নবম ইমাম অর্থাৎ সর্বশেষ ইমাম মাহদী (আ.)। সে শেষজামানাই আবির্ভাব করে জমিনে আদালতের প্রতিষ্ঠা করবে যা পূর্বে অত্যাচার ও জুলুমে পরিপূর্ণ হয়েছিল। আল্লামা মাজলিসি- বিহারুল আনোয়ার, খন্ড-৩৬, পৃ.-২২৭-৩৫১।

ইমাম মাহদী (আ.)-এর ন্যায়পরায়নতা সম্প্রসারণের বিষয়ের উপর রেওয়ায়েতসমূহের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রেওয়ায়েতে ইমাম মাহদী (আ.)-এর ন্যায়পরানতার বিস্তিৃতির বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি এবং ঐ বিষয়ের প্রতি অনেক রেওয়ায়েত থাকাটাই ইমাম মাহদী (আ.)-এর হুকুমাতের প্রমাণ স্বরুপ। এক্ষেত্রে যে সমস্ত গবেষণা ও পর্যালোচনাগুলি ইমাম মাহদী (আ.)-এর ইনকিলাব (বিপ্লব) নিয়ে সংগ্রহ করা হবে, সেগুলিতে উক্ত বিষয়ের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য করা আবশ্যক এবং তদরুপ ইমাম মাহদী (আ.)-এর আদালত প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন দিকগুলির প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে।

ইমাম মাহদী (আ.)-এর আদালত ও ন্যায়পরায়নাতাকে দুই দিক থেকে পর্যালোচনা করা যেতে পারে, একটি আদালতের মূল উপাদান ও স্তম্ভগুলির দৃষ্টি দিয়ে আর অপরটি আদালতের বিস্তৃতি ও ব্যাপকতার দৃষ্টি দিয়ে। যদিও বা প্রত্যেকটি দৃষ্টি থেকে পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা তার উপযুক্ত স্থানেই সম্ভব তথাপিও আমাদের এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যতে যথাযথভাবে এবং সংক্ষিপ্তাকারে দুই দিক থেকেই বিবেচনা করার চেষ্টা করব।

মাহদীইজমের মূল উপাদান ও স্তম্ভগুলি : প্রত্যেক সমাজেই আদালত প্রতিষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন স্তম্ভ ও উপাদানের প্রয়োজন যা না থাকলে তার অস্থায়িত্বের কারণ হয়ে দাড়ায়। সমাজে আদালত গঠিত হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলি নিম্নরুপ :

১. ন্যায়বিচারক ২. নীতিবান প্রতিনিধি ৩. ন্যায়সঙ্গত আইন ও ৪. ন্যায়সঙ্গত ব্যাবস্থা।(চলবে)

ইমাম মাহদী (আ.)-এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল কিছু বিষয়

ইমামের জন্ম গোপনে হওয়ার কারণে এধারণার অবকাশ ছিল যে শিয়ারা শেষ ইমামকে চিনতে ভুল করবে এবং পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে৷ ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর দায়িত্ব ছিল যে নিজের সন্তানকে বিশিষ্ট শিয়া ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিবর্গের মাঝে পরিচয় করাবেন৷ তারা আবার এ সংবাদ আহলে বাইতের অপর অনুসারীদের কাছে পৌঁছে দিবেন আর এভাবেই ইমামের পরিচয় ঘটবে এবং ইমাম (আ.) সকল বিপদ থেকে মুক্ত থাকবেন৷

১- শিয়া মাযহাবে ইমাম মাহদী (আ.)

ইমামের জন্ম গোপনে হওয়ার কারণে এধারণার অবকাশ ছিল যে শিয়ারা শেষ ইমামকে চিনতে ভুল করবে এবং পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে৷ ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর দায়িত্ব ছিল যে নিজের সন্তানকে বিশিষ্ট শিয়া ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিবর্গের মাঝে পরিচয় করাবেন৷ তারা আবার এ সংবাদ আহলে বাইতের অপর অনুসারীদের কাছে পৌঁছে দিবেন আর এভাবেই ইমামের পরিচয় ঘটবে এবং ইমাম (আ.) সকল বিপদ থেকে মুক্ত থাকবেন৷

ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর বিশেষ অনুসারী এবং বিশিষ্ট শিয়া জনাব আহমাদ বিন ইসহাক বলেন:

ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর কাছে গিয়ে মনে মনে তাঁর পরবর্তী উত্তরাধিকারী সম্পর্কে জানার ইচছা পোষণ করলাম, কিন্তু কিছু জানতে চাওয়ার পূর্বেই তিনি বললেন: হে আহমাদ! আল্লাহপাক হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টির পর থেকে কখনোই পৃথিবীকে হুজ্জাত বিহীন রাখেন নি এবং কিয়ামত পর্যন্ত কখনোই খালি রাখবেন না৷ আর আল্লাহর হুজ্জাতের মাধ্যমেই পৃথিবীর মানুষের উপর থেকে বালা-মুছিবত দূর হয়৷ তাঁর অস্তিত্বের বরকতেই বৃষ্টি বর্ষণ হয় এবং ফসল ফলে৷

আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান! আপনার পরবর্তী ইমাম এবং উত্তরাধিকারী কে? ইমাম সাথে সাথে ঘরের ভিতর প্রবেশ করলেন এবং তিন বছরের একটি অতি সুন্দর ও চাঁদের ন্যায় পবিত্র শিশুকে নিয়ে বেরিয়ে এসে বললেন: হে আহমাদ বিন ইসহাক! যদি আল্লাহ ও তাঁর হুজ্জাতের নিকট প্রিয়ভাজন না হতে তাহলে আমার এ পূত্র তোমাকে দেখাতাম না৷ তাঁর নাম ও কুনিয়া রাসূল (সা.)-এর নাম ও কুনিয়ার অনুরূপ৷ পৃথিবী যেভাবে অন্যায়-অত্যাচারে পরিপূর্ণ হয়েছিল সে তেমনিভাবে পৃথিবীকে ন্যায়-নীতিতে পরিপ‚র্ণ করবে৷

আমি বললাম: এমন কোন চিহ্ন কি আছে যা দেখে আমি নিশ্চিত হতে পারি? এমন সময় পবিত্র শিশুটি বললেন:

انا بقية الله فی ارضه والمنتقم من اعدائه ...

আমিই হলাম পৃথিবীতে আল্লাহর শেষ গচিছত সম্পদ এবং আমি আল্লাহর দুশমনদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করব৷ হে আহমাদ বিন ইসহাক নিজ চোখে দেখার পর আর কোন চিহ্নের অপেক্ষায় থেক না৷

আহমাদ বিন ইসহাক বলেন: এ কথা শোনার পর অতি আনন্দের সাথে ইমাম (আ.)-এর বাড়ী থেকে চলে আসলাম (কামালুদ্দিন খণ্ড- ২, বাব ৩৮, হাদীস ১, পৃ.-৮০)৷

অনুরূপভাবে মুহাম্মদ বিন উসমান ও আরও কয়েক জন বিশিষ্ট শিয়া ব্যক্তিত্ব বর্ণনা করেছেন:

আমরা শিয়া মাযহাবের চল্লিশজন ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর কাছে একত্রিত হই৷ তিনি আমাদেরকে তাঁর পবিত্র সন্তানকে দেখিয়ে বললেন, "আমার পর এই তোমাদের ইমাম ও আমার উত্তরাধিকারী৷ তাঁর নির্দেশ মেনে চলবে এবং দ্বীন থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড় না তাহলে ধবংস হয়ে যাবে৷ আজকের পর থেকে তাঁকে আর দেখতে পাবে না (তিনি ইমাম মাহদীর দ্বিতীয় নায়েব )৷

একটি সুন্নত হচেছ শিশুদের জন্য আকিকা করা এবং ওলিমা দেয়া৷ দুম্বা অথবা গরু জবাই করে মানুষকে খাওয়ানো৷ এর মাধ্যমে শিশুর বালা-মুছিবত দূর হয় এবং আয়ূ দীর্ঘ হয়৷ ইমাম হাসান আসকারী (আ.) কয়েকবার তাঁর পবিত্র সন্তানের জন্য আকিকা করেছিলেন৷ এভাবে তিনি রাসূল (সা.)-এর সুন্নতকে পালন করেন এবং শিয়া মাযহাবকে দ্বাদশ ইমাম সম্পর্কে জ্ঞাত করেন৷

২- মোজেযা এবং কেরামত

ইমাম মাহদী (আ.)-এর জীবনীর অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তাঁর জন্মের পর থেকে অদৃশ্যের পূর্ব পর্যন্ত৷ এসময়ে তার মাধ্যমে অনেক মোজেযা ও কেরামত সম্পাদিত হয়েছে৷ তবে ইমাম (আ.)-এর জীবনের এ দিকটির প্রতি বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয় নি৷

আমরা এখানে একটি উদাহরণ বর্ণনার মাধ্যমে তা তুলে ধরতে চেষ্টা করব:

আহমাদ ইবনে ইব্রাহীম নিশাপুরী বলেন:

যখন আমর বিন আউফ (অত্যাচারি শাসক যে শিয়া মাযহাব অনুসারীদের হত্যা করতে খুব পছন্দ করত) আমাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল৷ আমার সমস্ত অস্তিত্ব আতঙ্কে শিউরে উঠল৷ অতঃপর সবার সাথে বিদায় নিয়ে ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর বাড়িতে বিদায় নিতে গেলাম এবং ভেবে রেখেছিলাম যে তার পর পালাব৷ ইমাম (আ.)-এর বাড়িতে গিযে তাঁর পাশে একটি বাচচা ছেলে বসা দেখলাম যার চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের মত জ্বল জ্বল করছিল৷ তাঁর ঐ নুরানী চেহারা দেখে আমি এত বেশী হতবাক হলাম যে, আমার সব কিছু প্রায় এলোমেলো হয়ে গেল৷

এমন সময় তিনি আমাকে বললেন: "হে ইব্রাহীম, পালাবার কোন প্রয়োজন নেই৷ খুব শীঘ্রই আল্লাহ তোমাকে তার অনিষ্ট হতে পরিত্রাণ দিবেন৷"

আমি আরও বেশী হতবাক হয়ে ইমাম আসকারী (আ.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, "আমার জীবন আপনার জন্য উৎসর্গ হোক এই ছেলে কে যিনি আমার মনের খবর বলছেন?" ইমাম (আ.) বললেন: "সে আমার সন্তান এবং আমার উত্তরাধিকারী৷"

ইব্রাহীম বলেন, "আল্লাহর করুনার প্রতি আশা ও দ্বাদশ ইমাম (আ.)-এর কথার প্রতি বিশ্বাস আমার ছিল৷ কিছু দিন পর আমার চাচা সংবাদ দিলেন যে আমর বিন আউফকে হত্যা করা হয়েছে৷"

৩- বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দান

ইমামত নামক আকাশের শেষ উজ্বল নক্ষত্র শিশু বয়সেই শিয়া মাযহাব অনুসারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতেন এবং তাদেরকে সন্তুষ্ট করতেন৷ উদাহরণস্বরূপ সংক্ষেপে একটি রেওয়ায়াত বর্ণনা করছি:

শিয়া মাযহাবের বিশিষ্ট আলেম সাদ ইবনে আব্দুল্লাহ কুম্মী, ইমামের উকিল আহমাদ ইবনে ইসহাক কুম্মীকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর জানতে ইমাম আসকারী (আ.)-এর কাছে গিয়েছিলেন৷ তিনি ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেছেন:

ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর কাছে প্রশ্নের উত্তর জানতে গেলে তিনি তাঁর সন্তানের দিকে ইশারা করে বললেন: আমার চোখের জ্যোতির কাছে প্রশ্ন কর৷ তখন ছেলেটি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন: যা ইচছা প্রশ্ন করতে পার৷ বললাম, "کهيعص" এর উদ্দেশ্য কি? তিনি বললেন: এই অক্ষরগুলো গায়েবি সংবাদের অন্তর্ভুক্ত৷ আল্লাহ্ তাআলা তাঁর বান্দা (নবী) যাকারিয়াকে সে সম্পর্কে অবহিত করেছেন অতঃপর মুহাম্মদ (সা.)-কেও সে সংবাদ দিয়েছেন৷ ঘটনা হল যে হযরত যাকারিয়া (আ.) আল্লাহর কাছে পাক পঞ্জাতনের নাম জানতে চাইলেন৷ আল্লাহ তাআলা হযরত জীবরাঈল (আ.)- কে সে নামগুলো শিক্ষা দিলেন৷ হযরত যাকারিয়া যখন মুহাম্মদ (সা.), আলী (আ.), ফাতিমা (আ.) ও হাসান (আ.)-এর নাম উচচারণ করলেন তাঁর সকল কষ্ট ও সমস্যার অবসান হয়ে গেল৷ কিন্তু যখন ইমাম হুসাইন (আ.)-এর নাম উচচারণ করলেন তখন কষ্টে তাঁর গলা আটকে আসতে লাগল৷ তিনি আল্লাহর কাছে বললেন: হে আল্লাহ আমি যখন প্রথম চার জনের নাম উচচারণ করি তখন আমার সকল কষ্ট দূর হয়ে যায় এবং মন আনন্দে ভরে যায়৷ কিন্তু যখন হুসাইন (আ.)-এর নাম উচচারণ করি তখন আমার দুচোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকে৷ আল্লাহ তাঁকে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ঘটনা সম্পর্কে অবগত করলেন এবং বললেন: "کهيعص" হচেছ এই ঘটনার সংকেত৷ "کاف" হচেছ কারবালার সংকেত৷ "هاء" হচেছ হালাকাত বা ধবংসের সংকেত৷ "ياء" হচেছ পাপিষ্ট ইয়াযিদের নামের সংকেত৷ "عين" হচেছ আতাশ তথা পিপাসার সংকেত৷ "صاد" হচেছ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সবর ও ধৈর্যের সংকেত৷

বললাম: কেন মানুষ নিজেরাই তাদের ইমামকে নির্বাচন করতে পারবে না?

ইমাম বললেন: তুমি মুসলেহ (মুক্তিদাতা) ইমামের কথা বলছ নাকি মোফসেদ (পথভ্রষ্ট) ইমামের কথা বলছ? বললাম: মুসলেহ ইমামের কথা বলছি যিনি সমাজকে সংষ্কার করবেন৷ ইমাম বললেন: যেহেতু কেউই কারো মনের খবর রাখে না যে, সে গঠনমূলক চিন্তা করে নাকি ধবংসাত্মক, সুতরাং মানুষের পক্ষ থেকে নির্বাচিত ব্যক্তি মোফসেদও তো হতে পারে? বললাম: হ্যাঁ, হতে পারে৷ বললেন: কারণ, এটাই (কামালুদ্দিন, খণ্ড- ২, বাব ৪৩, হাদীস ২১, পৃ.-১৯০)৷

ইমাম এই হাদীসে আরও অনেক শর্ত বা কারণ বর্ণনা করেছেন তবে সংক্ষিপ্ততার জন্য তা র্বণনা করা থেকে বিরত হলাম৷

৪- উপহার গ্রহণ করা

শিয়া মাযহাবের আরও একটি রিতি হচেছ যে, তারা ইমামের জন্য বিভিন্ন উপঢৌকন এবং খুমস প্রেরণ করে থাকে৷ ইমাম (আ.) সেগুলোকে গ্রহণ করে সমাজের নিম্নবিত্তদের প্রয়োজন মেটাতেন৷

ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর উকিল ইবনে ইসহাক বলেন: শিয়া মাযহাবের উপঢৌকন ইমাম আসকারী (আ.)-এর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিয়ে গেলাম৷ সেখানে তাঁর চাঁদের ন্যায় পুত্র তাঁর পাশে বসে ছিলেন৷ ইমাম আসকারী (আ.) তাঁর সন্তানকে বললেন: হে আমার পুত্র তোমার বন্ধু ও অনুসারীদের আনিত উপঢৌকনগুলো খোল৷ শিশু পুত্র বললেন: হে আমার মাওলা এই পবিত্র হাত দিয়ে হালাল ও হারাম মিশ্রিত নাপাক বস্তু ছোয়া কি ঠিক হবে?

ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বললেন: "হে ইসহাক! থলের মধ্যে যা আছে তা বের কর৷ আমার পুত্র তার মধ্য থেকে হারাম এবং হালালগুলোকে পৃথক করবে৷ আমি একটি থলে বের করলাম৷ শিশু পুত্র বললেন: এই থলেটা কোম শহরের অমুক লোকের এবং তার মধ্যে ৬২ আশরাফী আছে৷ তার মধ্যে ৪৫ আশরাফী তার পিতার দেয়া জমি বিক্রয়ের, ১৪ আশরাফী তার নয়টি জামা বিক্রয়ের এবং বাকি তিনটি আশরাফী তার দোকান ভাড়ার৷

ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বললেন: হে আমার পুত্র! ঠিক বলেছ৷ এখন এই ব্যক্তিকে বলে দাও যে, এর মধ্যে কোনটি হারাম? শিশু ইমাম মনযোগ সহকারে হারাম জিনিসগুলোকে পৃথক করলেন এবং তার কারণও উল্লেখ করলেন৷

অতঃপর আর একটি থলে বের করলাম৷ ওই থলেটি যে ব্যক্তির তিনি তার নাম ও ঠিকানা বলার পর বললেন: "তার মধ্যে ৫০ আশরাফী আছে যা আমাদের ছোঁয়া ঠিক নয়৷ তারপর ওই অর্থ অপবিত্র হওয়ার কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিলেন৷

অতঃপর ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বললেন: হে আমার পুত্র তুমি সঠিক বলেছ৷ তারপর আহমাদ বিন ইসহাককে বললেন: "সবগুলোকে তাদের প্রত্যেককে ফিরিয়ে দাও কেননা আমাদের তার কোন প্রয়োজন নেই" (কামালুদ্দিন, খণ্ড- ২, বাব ৪৩, হাদীস ২১, পৃ.-১৯০)৷

৫- পিতার জানাযার নামাযে

ইমাম মাহদী (আ.)-এর গুপ্ত অবস্থার সময়ে এবং স্বল্পমেয়াদী অদৃশ্য শুরু হওয়ার পূর্বে সর্বশেষ যে কার্য সম্পাদন করেছিলেন তা হল পিতার জানাযার নামায৷

একাদশ ইমামের খাদেম আবুল আদইয়ান এ সম্পর্কে বলেন:

ইমাম হাসান আসকারী (আ.) জীবনের শেষ সময়ের দিকে আমাকে কিছু চিঠি দিয়ে বললেন: "এগুলোকে মাদায়েনে নিয়ে যাও৷ পনের দিন পর ফিরে এসে আমার বাড়িতে রোনা-জারি শুনতে পাবে এবং আমার মৃতদেহ গোসলের স্থানে দেখবে৷" আমি বললাম: হে আমার মাওলা এমনটি হলে আপনার উত্তরাধিকারী তথা পরবর্তী ইমাম কে হবেন? ইমাম বললেন: "যে তোমার কাছে আমার চিঠির উত্তর সম্পর্কে জানতে চাইবে তিনিই পরবর্তী ইমাম হবেন৷" বললাম: আরও কিছু বৈশিষ্ট্য বলুন৷ ইমাম বললেন: "যে আমার জানাযার নামাজ পড়াবেন তিনিই পরবর্তী ইমাম হবেন৷" বললাম: অরও কিছু বৈশিষ্ট্য বলুন৷ ইমাম বললেন: "যে এই থলেতে যা আছে সে সম্পর্কে খবর দিবে সেই পরবর্তী ইমাম হবেন৷" কিন্তু ইমাম (আ.)-এর গাম্ভির্য দেখে প্রশ্ন করতে সাহস পেলাম না৷

চিঠিসমূহকে মাদায়েনে নিয়ে গেলাম উত্তর নিয়ে ইমামের কথামত পনের দিনের মাথায় সার্মেরাতে ফিরে ইমাম (আ.)-এর বাড়িতে কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম এবং ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর মৃতদেহকে গোসলের স্থানে দেখতে পেলাম৷ তখন ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর ভাই জাফরকে দেখলাম যে ইমাম (আ.)-এর বাড়িতে দাড়িয়ে আছে এবং কেউ কেউ তাকে শোক বার্তা জানাচেছ এবং ইমাম হিসাবে তাকে মোবারকবাদ জানাচেছ৷ আমি মনে মনে বললাম: এই লোক যদি ইমাম হয় তাহলে ইমামত ধবংস হয়ে যাবে৷ কেননা তাকে আমি চিনতাম সে মদ্য পান করত এবং গানবাজনা করত৷ যেহেতু ইমাম (আ.)-এর বলে যাওয়া আলামতের খোজে ছিলাম তাই আমিও তার কাছে গেলাম এবং অন্যদের মত তাকে শোকবার্তা জানালাম ও মোবারকবাদ জানালাম৷ কিন্তু সে আমাকে চিঠির জবাব সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞাসা করল না৷ তখন আকিদ [ইমাম হাসান আসকারী (আ.)]-এর আর এক খাদেম জাফরকে বলল: হে আমার নেতা আপনার ভ্রাতাকে কাফন করা হয়েছে এসে জানাযার নামায পড়ান৷ আমিও জাফর এবং শিয়া মাযহাবের অন্যান্যদের সাথে ভিতরে গিয়ে দেখলাম যে, ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-কে কাফন পরিয়ে তাবুতে রাখা হয়েছে৷ জাফর নামায পড়ানোর জন্য সামনে গিয়ে তকবির দিতে গেল তখন গৌরবর্ণের একটি শিশু বেরিয়ে এসে জাফরের জামা টেনে ধরে বললেন: হে চাচা সরে দাড়ান আমার পিতার জানাযার নামায পড়ানোর দায়িত্ব আমার উপর ন্যাস্ত হয়েছে৷ জাফরের চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল এবং সে পিছনে সরে আসল৷ ছোট্ট শিশু সামনে গিয়ে ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর জানাযার নামায পড়ালেন৷ অতঃপর তিনি আমাকে বললেন: চিঠির উত্তরগুলো আমাকে দাও৷ আমি চিঠিগুলো তাঁকে দিলাম৷ আমি মনে মনে বললাম এ দুটি নিদর্শনই তো এই ছোট্ট বালকের ইমাম হওয়ার নিদর্শন৷ থলের ঘটনাটি বাকি রইল৷ জাফরের কাছে গিয়ে দেখি সে আর্তনাদ করছে৷ একজন শিয়া মাযহাবের অনুসারী তাকে প্রশ্ন করল এই বালকটি কে?

জাফর বলল: আল্লাহর শপথ আমি এ ছেলেটিকে কখনোই দেখিনি এবং তাকে চিনিও না৷

আবুল আদইয়ান আরও বলল: আমরা বসে ছিলাম এমতাবস্থায় কোম থেকে কিছু লোক এসে ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর সম্পর্কে জানতে চাইল৷ তারা ইমাম (আ.) শহীদ হওয়ার খবর জানতে পেরে বলল: কাকে শোকবার্তা জানাব? জনগণ জাফরের দিকে ইশারা করল৷ তারা জাফরকে সালাম দিয়ে তাকে শোকবার্তা ও মোবারকবাদ জানাল৷ অতঃপর তারা জাফরকে বলল: আমাদের কাছে কিছু চিঠি ও উপঢৌকন আছে৷ বলুন চিঠিগুলো কার? এবং কি পরিমাণ উপঢৌকন আছে?

জাফর রেগে গিয়ে দাড়িয়ে বলল: আমার কাছে গায়েবী সংবাদ জানতে চাও? তখন ভিতর থেকে একজন খাদেম বেরিযে এসে বলল: ওমুক, ওমুকের চিঠি তোমাদের কাছে আছে এবং তাদের নাম ঠিকানা বলল৷ থলের মধ্যে এক হাজার দিনার আছে এবং দশটির চিহ্ন মুছে গেছে৷ তারা চিঠি এবং দিনারগুলোকে তার কাছে দিয়ে বলল: যিনি তোমাকে এগুলো নিতে পাঠিয়েছেন তিনিই হলেন প্রকৃত ইমাম (কামালুদ্দিন, খণ্ড-২, বাব-৪১, হাদীস নং-২৫, পৃ.-২২৩)৷

মন্তব্য

একটি মন্তব্য

* একটি তারকা চিহ্নিত ফিল্ড অবশ্যই মান থাকা আবশ্যক।