শবে বরাতের ফযিলত

শবে বরাতের ফযিলত

শবে বরাতের ফযিলত

শবে বরাত যে ফযিলত সম্পন্ন, উপরোল্লিখিত ঘটনাটিই তার প্রমাণবহ। তবে এ লেখনিতে যে ফলাফলে পৌছাতে চাচ্ছি তা প্রমাণ করতে এখনো কলম চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। আর তাই নিম্নলিখিত বিষয়গুলোতে ভাবগাম্ভির্যসহ গভীর দৃষ্টি রাখার অনুরোধ রাখছি, যথা

নবী (সা.)-এর কোন এক স্ত্রী ১৫ শা’বানের রাতে তাঁর অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন: সে রাতে নবী (সা.) আমার কাছে ছিলেন। হটাৎ তাঁর অনুপস্থিতি অনুভব করে তাঁর খোঁজে বের হলাম, খোঁজাখুজির পরে তাকে অনুরূপ কাপড়ের স্তুপাকৃত হয়ে সিজদারত অবস্থায় জমিনে পড়ে থাকতে দেখলাম এবং সিজদায় তাকে এরূপ বলতে শুনলাম:

((اصبحت اليك فقيرا خائفا مستجيرا فلا تبدل اسمى ولاتغير جسمى ولاتجهد بلائى واغفرلى))

“ভীত সন্ত্রস্ত, শুন্য হাতে তোমার পানে এসেছি আশ্রয় নিতে। সুতরাং আমার নামকে ফিরিয়ে দিও না এবং আমার শরীরের পরিবর্তন ঘটিও না, আমার কষ্টকে বৃদ্ধি করো না এবং আমার উপর থেকে তোমার আযাব পরিহার কর”।

তারপর সিজদাহ্ থেকে মাথা তুললেন এবং পুনরায় সিজদায় গিয়ে এরূপ বললেন:

((سجد لك سوادى و خيالى و امن بك فوادى هذه يداى بما جنيت على نفسى يا عظيم ترجى لكل عظيم اغفرلى ذنبى العظيم فانه لايغفرالعظيم الاالعظيم))

“আমার সমস্ত অস্তিত্ব তোমার জন্য সিজদারত এবং আমার অন্তর তোমার প্রতি ঈমান এনেছে; আর নিজের উপর স্বীয় দু’হাতে যত অন্যায় করেছি, সুতরাং হে মহান সমস্ত বড় কাজই আঞ্জাম দেয়ার জন্য আশা-আকাঙ্খাসমূহ তোমার প্রতিই ধাবিত; তাই আমার সকল বড় গোনাহ্ থেকে তোমার আযাব পরিহার করে নাও। কেননা শুধুমাত্র মহান সৃষ্টিকর্তায় পারেন বড় গোনাহ থেকে পরিত্রাণ দিতে”।

উক্ত বাক্যসমূহ উচ্চারণের পর তিনি মাথা উঠালেন এবং পুনরায় সিজদায় গিয়ে এরূপ বললেন:

((اعوذ برضاك من سخطك و اعوذ بمعافاتك من عقوبتك و اعوذ بك منك انت كما اثنيت على نفسك و فوق ما يقول القائلون))

“তোমার আযাব থেকে তোমার সন্তুষ্টির প্রতি আশ্রয় প্রার্থনা করছি, তোমার সাজার থেকে তোমার ক্ষমার প্রতি আশ্রয় প্রার্থনা করছি, তোমার নিকট থেকে তোমার নিকটে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তুমি তাই যা তুমি নিজে বর্ণনা দিয়েছো এবং তুমি তার থেকেও অধিক উপরে যা অন্যরা বলে থাকে”।

কিছু সময় পর তিনি সিজদাহ্ থেকে মাথা উঠালেন এবং পূনরায় সিজদায় গিয়ে এরূপ বললেন:

((اللهم انى اعوذ بنور وجهك الذى اشرقت له‏ السموات والارض و قشعت ‏به ‏الظلمات و صلح به امرالاولين والاخرين ان يحل على غضبك او ينزل على سخطك اعوذبك من زوال نعمتك و فجاة نقمتك و تحويل عافيتك و جميع سخطك لك العتبى فيما استطعت و لاحول ولا قوة الا بك))

হে আল্লাহ্ তোমার নূরেই তো আসমান ও যমিন আলোকিত হয়েছে, অন্ধকারসমূহ ওই নূরের ছটায় ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছে এবং পূর্ব ও পরগণ ওই নূরের ছটাতেই সংশোধিত হয়েছে সেই নূরের তলার আশ্রয় চাইছি, তোমার দেয়া আযাব এবং তোমার শত্রু তা আমার উপর পতিত হবার আগেই। আশ্রয় চাইছি তোমার কাছে তোমার নেয়ামত হতে বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে, তোমার হটাৎ আযাব প্রদান থেকে, তোমার পক্ষ হতে বালা নাযিল হওয়া থেকে এবং যা কিছু তোমাকে রাগান্বিত করে তা থেকে। আমার যা কিছু তোমাকে সন্তুষ্ট করে তা তো তোমারই দেয়া। কেননা এমন কোন শক্তিই নেই যার কারণ তুমি নও। নবী (সা.)-এর এরূপ অবস্থা দেখে তাকে রেখেই তড়িৎ গতিতে বাড়ীর দিকে রওনা হলাম। হাপাতে হাপাতে বাড়ীতে এসে পৌছালাম। যখন তিনি বাড়ী ফিরে আসলেন তখন আমাকে দেখে তিনি বললেন: কি হয়েছে, হাপাচ্ছো কেন? বললাম: আমি আপনার খোঁজে গিয়েছিলাম। তিনি বললেন: তুমি কি জান যে এ রাত কোন রাত?! এ রাত হচ্ছে ১৫ই শা’বানের রাত। এ রাতে সমস্ত আমল লিপিবদ্ধ হবে, রুযিসমূহ বন্টন হবে, মৃত্যুর সময় নির্ধারণ হবে। আর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা সকলকে ক্ষমা করে দিবেন। তবে যারা শির্ক করবে অথবা জুয়া খেলায় মত্ত থাকবে অথবা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে অথবা মদ্যপায়ী হবে অথবা গোনাহ্ করার জন্য পীড়াপীড়ি করবে তারা ব্যতীত ...।

দেখুন: ইবনে তাউউস, আলী বিন মুসা, ইকবালুল আ’মাল, পৃ.- ২১৬-২১৭, বৈরুত প্রিন্ট, প্রকাশক: মুয়াস্সিসাতুল আয়া’লামি লিল মাতবুআ’ত, ১৪১৭ হিজরী।

ইমাম আলী (আ.)-এর একজন বিশিষ্ট সাহাবা কুমাইল বিন যিয়াদ, ইমামের উদ্ধৃতি দিয়ে এভাবে রেওয়ায়েত বর্ণনা করেন: একদা বছরার মসজিদে আমার মাওলার নিকট বসে ছিলাম এবং সেখানে তাঁর একদল সাথীও উপস্থিত ছিল। আমাদের মধ্য থেকে কেউ একজন ইমাম (আ.)-কে প্রশ্ন করল: আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার এ فيها يفرق كل امر حكيم) -ওই রাতে প্রতিটি নির্দেশই হিকমতের সাথে নির্দিষ্ট ও নির্বাচিত হবে- সূরা: দুখান, আয়াত নং-৪) উক্তির অর্থ কি?

ইমাম বললেন: “তাঁর কসম, যার হাতে আলীর জীবন‍! মধ্য শা’বান থেকে বছরের শেষ দিন পর্যন্ত সকল ভাল-মন্দ দিক যা বান্দার উপর জারি হয় তা এই রাতে নির্দিষ্ট হয়ে থাকে। এমন কোন বান্দা নেই, যে এ রাতে জাগ্রত থেকে খাযার নামক দোয়া পাঠ করবে তার দোয়া অবশ্যই কবুল হবে”।

এরপর ইমাম আমাদের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। আমি রাতে তাঁর বাড়ীতে গেলাম। ইমাম আমাকে বললেন: কি হয়েছে কুমাইল? বললাম: হে আমিরূল মু’মিনিন দোয়ায়ে খাযার শিক্ষা নেয়ার জন্য এসেছি, যদি আমাকে শিক্ষা দেন। তিনি বললেন: বস হে কুমাইল‍! যখন এ দোয়াটি আমার থেকে শিক্ষা নিবে এবং মুখস্ত করবে, আল্লাহর শপথ প্রতি জুময়া’র রাতে অথবা প্রতি মাসে একবার অথবা বছরে একবার অথবা অন্ততপক্ষে সম্পূর্ণ জীবদ্দশায় একবার তা পড়বে, যাতে করে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার সাহায্য তোমার উপর বর্তায় এবং তোমাকে রুযি ও ক্ষমা দান করুন। হে কুমাইল‍! যেহেতু দীর্ঘ সময় ধরে তুমি আমাদের সাথে রয়েছো তাই আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তোমার বৈধ চাওয়া পূরণ করা। তখন তিনি আমাকে উক্ত দোয়াটি শিক্ষা দেন ...।

উল্লিখিত দোয়াটি হচ্ছে সেই দোয়া যা বর্তমানে দোয়ায়ে কুমাইল নামে আমাদের মাঝে পরিচিত।

দেখুন: ইবনে তাউউস, আলী বিন মুসা, ইকবালুল আ’মাল, পৃ.- ২২০, বৈরুত প্রিন্ট, প্রকাশক: মুয়াস্সিসাতুল আয়া’লামি লিল মাতবুআ’ত, ১৪১৭ হিজরী।

ইমাম আলী (আ.) অন্য একটি রেওয়ায়েতে ১৫ ই শা’বানের ফযিলত সম্পর্কে এরূপ বর্ণনা করেন: “আমি আশ্চর্য হয়ে যাই যখন দেখি কোন ব্যক্তি চারটি রাত বেহুদা কাটায়: ১- ঈদুল ফিতরের রাত, ২- ঈদুল আযহার রাত, ৩- ১৫ই শা’বানের রাত ও ৪- রজব মাসের প্রথম রাত।

দেখুন: আল্ মাজলিসি, মুহাম্মদ বাকির, বিহরুল আনওয়ার, খণ্ড-৯৪, পৃ.-৮৭, হা.-১২, বৈরুত প্রিন্ট, প্রকাশক: মুয়াস্সিসাতুল ওয়াফা, ১৪০৩ হিজরী।

ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন যে, তাঁর সম্মানীয় পিতার কাছে কেউ একজন ১৫ ই শা’বনের ফযিলত জানতে চেয়ে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে বলেন: “এ রাত শবে ক্বাদরের রাতের পরে সব থেকে উত্তম রাত। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা এ রাতের ফযিলতকে তাঁর বান্দাদের উপর জারি করবেন এবং এ রাতের উছিলায় তাদের গোনাহসমূহকে ক্ষমা করে দিবেন। সুতরাং চেষ্টা কর যাতে করে এ রাতে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা’য়ালার নিকটবর্তী হতে। এ রাত হচ্ছে সেই রাত যে রাতের ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা স্বীয় অস্তিত্বের উপর কসম করে বলেছেন যে, এ রাতের আবেদনকারীকে, যদি তার আবেদন অবৈধ না হয় তবে তাকে নিজের দরগাহ্ থেকে দুরে সরাবেন না। এ রাত এমন রাত যে রাতকে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা’য়ালা আমাদের জন্য নির্দিষ্ট করেছেন, যেমনভাবে শবে ক্বাদরের রাতকে আমাদের নবী (সা.)-এর জন্য নির্দিষ্ট করেছিলেন। সুতরাং রাতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার উদ্দেশ্যে হামদ ও ছানা পাঠ করবে, কেননা যারাই এ রাতে একশ’বার আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামিনের তসবিহ্ পড়বে, একশ’বার তাঁর হামদ করবে, একশ’বার তাঁর তকবির পড়বে এবং একশ’বার তাঁর একক সত্তার যিকির (لااله‏الاالله)পাঠ করবে, তিনি তাদের সকল অতীত গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন এবং তাদের দুনিয়া ও আখিরাতের সকল চাওয়াকে পূরণ করে দিবেন। এমনই যে, তারা যে আবেদনসমূহ করছে এবং যে আবেদনসমূহ করি নি সেগুলোকেও। কেননা তিনি স্বীয় জ্ঞানে সব কিছুর ব্যাপারে জ্ঞাত ...।

দেখুন: ইবনে তাউউস, আলী বিন মুসা, ইকবালুল আ’মাল, পৃ.- ২০৯, বৈরুত প্রিন্ট, প্রকাশক: মুয়াস্সিসাতুল আয়া’লামি লিল মাতবুআ’ত, ১৪১৭ হিজরী। আল্ মাজলিসি, মুহাম্মদ বাকির, বিহরুল আনওয়ার, খণ্ড-৯৪, পৃ.-৮৫, বৈরুত প্রিন্ট, প্রকাশক: মুয়াস্সিসাতুল ওয়াফা, ১৪০৩ হিজরী। আস্ সাদুক, মুহাম্মদ বিন আলি ইবনুল হুসাইন, খণ্ড-২, পৃ.-৪২৪, হা.-১।

এরূপ বহু হাদীস রয়েছে যা ১৫ই শা’বানের ফযিলত সম্পর্কিত। তবে এ ক্ষুদ্র পরিষরে তার সব গুলোই উল্লেখ করা সম্ভব নয়, তাই বিশেষ বিশেষ হাদীসগুলো আপনাদের সামনে তুলে ধরা হল। তবে যারা ইচ্ছুক তারা নিম্নলিখিত সূত্র দু’টি দেখতে পারেন, যেখানে এ মর্মে অনেক হাদীস লিপিবদ্ধ হয়েছে, যথা:

১- ইবনে তাউউস, আলী বিন মুসা, ইকবালুল আ’মাল, পৃ.-২০৯, বৈরুত প্রিন্ট, প্রকাশক: মুয়াস্সিসাতুল আয়া’লামি লিল মাতবুআ’ত, ১৪১৭ হিজরী।

২- আল্ মাজলিসি, মুহাম্মদ বাকির, বিহরুল আনওয়ার, খণ্ড-৯৪, পৃ.-৮৫, হা.-৫, বৈরুত প্রিন্ট, প্রকাশক: মুয়াস্সিসাতুল ওয়াফা, ১৪০৩ হিজরী।

উল্লেখিত হাদীসসমূহ সব দিক থেকেই সন্দেহ মুক্ত। কেননা, রিজাল শাস্ত্র মতে উল্লেখকারী রাবীগণ হচ্ছেন ‘ছেকাহ্’ অর্থাৎ সত্যবাদী যা নির্দিধায় তাদের বর্ণিত হাদীসসমূহ গ্রহণযোগ্য। তবে উল্লেখিত রেওয়ায়েতসমূহ পাঠ করে হয়ত আমাদের মনে এ প্রশ্ন আসতে পারে যে, অন্যান্য অনেক হাদীসে মৃত্যুর সময় নির্ধারণ ও রুযি বন্টন রমযান মাসের শবে ক্বাদরের রাতে সংঘটিত হবে বলা হয়েছে, কিন্তু উপরোল্লিখিত দু’টি হাদীসে ১৫ ই শা’বানে তা সংঘটিত হবে বলা হচ্ছে, এ দু’অবস্থাকে কি ভাবে একত্রিত করা সম্ভব?

আমাদের বিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব মরহুম সাইয়্যেদ বিন তাউউস (মৃত: ৬৬৪ হিজরী) এ প্রশ্নের সুন্দর উত্তর দিয়েছেন এবং উক্ত দু’অবস্থাকে একত্রিত করেছেন যা কোন সমস্যার সৃষ্টি করে না। উত্তরটি লক্ষ্য করুন:

১- ‘উল্লিখিত হাদীসদ্বয়ের ভাবার্থ এমন হতে পারে যে, মৃত্যুর সময় নির্ধারণ ও রুযি বন্টন যেরূপে বিলুপ্ত ও প্রমাণীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেরূপে ১৫ই শা’বানে রূপ লাভ করে, কিন্তু সেগুলোর প্রকৃত নির্ধারণ ও বন্টন শবে ক্বাদরের রাত্রসমূহে হয়ে থাকে।

২- উল্লিখিত হাদীসদ্বয়ের ভাবার্থ এমনও হতে পারে যে, ১৫ই শা’বান লৌহে মাহফুযে মৃত্যুর সময় নির্ধারণ ও রুযি বন্টন হয়ে থাকে, কিন্তু বান্দাদের মধ্যে তা নির্ধারণ ও বন্টন শবে ক্বাদরে হয়ে থাকে।

৩- ‘উল্লিখিত হাদীসদ্বয়ের ভাবার্থ এমনও হতে পারে যে, মৃত্যুর সময় নির্ধারণ ও রুযি বন্টন ১৫ই শা’বান ও শবে ক্বাদরে উভয় রাতে সংঘটিত হয়ে থাকে এরূপে; শবে ক্বাদরে যা নির্ধারণ ও বন্টন করা হবে ১৫ই শা’বানে তার ওয়াদা দেয়া হয়ে থাকে। অনুরূপ কোন রাজা ১৫ই শা’বানের রাতে কোন প্রজাকে ওয়াদা দিল যে শবে ক্বাদরের রাতে সে তাকে কিছু অর্থ দান করবে। এ দৃষ্টিকোণে উভয় রাতের ব্যাপারে প্রদত্ত হাদীসসমূহ সঠিক এবং একটি অন্যটির অন্তরায় নয় বরং পরিপূরক।

দেখুন: ইবনে তাউউস, আলী বিন মুসা, ইকবালুল আ’মাল, পৃ.-২১৪, বৈরুত প্রিন্ট, প্রকাশক: মুয়াস্সিসাতুল আয়া’লামি লিল মাতবুআ’ত, ১৪১৭ হিজরী।

উল্লেখিত উত্তরের সূত্র ধরে বলা যায় যে, শবে বরাতের রাত যে ফযিলত সম্পন্ন তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে এখন কথা হচ্ছে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা ফযিলত দান করার জন্য ১৫ ই শা’বানের রাতকে কেন বেছে নিলেন! আরো অন্যান্য রাত তো ছিলো। অতএব নিশ্চয়ই আগে থেকেই আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামিন এ রাতকে ফযিলত মণ্ডিত করেছেন এবং পরবর্তিতে তা পাওয়ার জন্য মানুষকে শিক্ষা দেয়ার লক্ষ্যে জিব্রাঈল (আ.) মারফত নবী (সা.)-কে ওই রূপে ইবাদত করে দেখাতে ও ওই রাতের স্বরূপ বর্ণনা করতে বলেছেন। এখন আমাদের জানা প্রয়োজন যে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা’য়ালা ওই রাতকে কোন কারণে ফযিলত মণ্ডিত করলেন। যেমন শবে ক্বাদরে পবিত্র কোরআন নাযিল হবার কারণে ওই রাতসমূহকে ফযিলত মণ্ডিত করেছেন। তাই এ রাতকে ফযিলত মণ্ডিত করারও কোন কারণ অবশ্যই রয়েছে, নিম্নের আলোচনাটি লক্ষ্য করুন।

শবে বরাত যেভাবে শুরু হয়

হযরত মুহাম্মদ (সা.) থেকে এ রাতের ব্যাপারে অনেক হাদীস আমাদের হস্তগত হয়েছে। তবে যেসব হাদীসসমূহ পরিপূর্ণতার আলোকে ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্যতা রাখে তা নিম্নে বর্ণিত হল, যথা:

রাসূলে খোদা (সা.) বলেছেন: শা’বান মাসের মধ্য রজনীতে (১৫ ই শা’বানের রাতে) ঘুমিয়ে ছিলাম এমন সময় জিব্রাঈল (আ.) আমার শিয়রে উপস্থিত হয়ে বলল: হে মুহাম্মদ! কিভাবে আপনি এ রাতে ঘুমিয়ে আছেন? জিজ্ঞাসা করলাম: হে জিব্রাঈল‌! কেন এ রাত এমন কোন রাত? সে বলল: এ রাত হচ্ছে ১৫ই শা’বানের রাত। হে মুহাম্মদ উঠুন! এর পর সে আমাকে শোয়া থেকে উঠালো এবং বাকী কবরস্থানে নিয়ে গিয়ে বলল: আকাশের দিকে চেয়ে দেখুন! আজ রাতে আসমানের দরজাসমূহ খুলে যাবে। রহমতের দরজাসমূহ খুলে যাবে এবং খুলে যাবে সকল সুখ, সমৃদ্ধি, ক্ষমা, রুযি, পরিত্রাণ পাওয়া ও পূনর্জ্জিবীত হওয়ার দরজাসমূহ ও আরো অন্যান্য ...। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা এ রাতে চারপায়ী জন্তুর গায়ের চুল ও পশমের পরিমাণ নিজ বান্দাগণকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দান করবেন। এ রাতে তিনি মৃত্যুর সময় এবং আগামী এক বছরের রিযিক (এখানে সকল নেয়ামতকেই বুঝানো হয়েছে) নির্ধারণ করবেন। হে মুহাম্মদ! যারা এ রাতে জাগ্রত থেকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে পবিত্র ও একক সত্তা যেনে তাঁর যিকির করবে, তাকে রাজি-খুশি করার জন্য নামায-দোয়া পড়বে, পবিত্র কোরআন তেলোয়াত করবে ও অধিক পরিমাণে আসতাগফার করে রাতকে প্রভাবে পৌছাবে তাদের স্থান হবে বেহেশ্তে এবং তারা এর পূর্বে যা কিছু (গোনাহ) আঞ্জাম দিয়েছে ও পরবর্তিতে আঞ্জাম দিবে তাও ক্ষমা করে দিবেন...।

দ্বিতীয় হিজরীর ১৫ই শা’বানের মধ্য রাতে উক্ত ঘটনাটি সংঘটিত হয়। আর তখন থেকেই শবে বরাতের এ রসম-রেওয়াজ প্রচলিত হয়।

দেখুন: ইবনে তাউউস, আলী বিন মুসা, ইকবালুল আ’মাল, পৃ.- ২১২, বৈরুত প্রিন্ট, প্রকাশক: মুয়াস্সিসাতুল আয়া’লামি লিল মাতবুআ’ত, ১৪১৭ হিজরী। আল্ মাজলিসি, মুহাম্মদ বাকির, বিহরুল আনওয়ার, খণ্ড-৯৮, পৃ.-৪১৩, বৈরুত প্রিন্ট, প্রকাশক: মুয়াস্সিসাতুল ওয়াফা, ১৪০৩ হিজ

আমরা এটা জানি যে, এ পৃথিবীতে কোন কিছুই কার্যকারণ ব্যতীত সংঘটিত হয় না। তাই ১৫ই শা’বান ফযিলত মণ্ডিত হওয়ার পেছোনেও নিহিত রয়েছে উপযুক্ত কার্যকারণ। আর তা হচ্ছে আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা’য়ালার সর্বশেষ হুজ্জাত, নবী (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বংশধারার নবম সন্তান ইমাম মাহদী (আ. তা. ফা.শা.)*-এর শুভ জন্মরাত।

যিনি শেষ যমানায় আবির্ভূত হয়ে বিশ্বকে সমস্ত প্রকার অন্যায়-অত্যাচার, নীপিড়ন-নির্যাতন ও যালিমের যুলুম থেকে রক্ষা করে ন্যায়ের মানদন্ডের আওতায় নিয়ে আসবেন এবং খোদায়ী শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। তখন এ পৃথিবীতে থাকবে না কোন প্রকার যুলুম-অত্যাচার, থাকবে না কোন ভেদাভেদ, বাঘ ও ছাগল একই তীরে এক সঙ্গে পানি পান করবে। তখন না বাঘ ছাগলের উপর হামলা করবে আর না ছাগল বাঘকে ভয় পাবে। আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামিন আমাদেরকে সে দিন দেখে যাওয়ার তৌফিক দান করুন।

এ রাত ফযিলত মণ্ডিত হবার প্রকৃত কারণ আমারা জানতে পারলাম। পবিত্র মা’সুমিন (আ.)-গণও এ রাত ফযিলত মণ্ডিত হবার প্রকৃত কারণ এই পবিত্র ব্যক্তিত্বের জন্ম গ্রহণের কারণকেই উল্লেখ করেছেন। যা আমরা সাইয়্যেদ বিন তাউউসের কিতাবে লক্ষ্য করে থাকি। তিনি স্বীয় কিতাবে বলছেন: যেহেতু আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা এত বড় ও সর্বাধিক উত্তম কল্যান বা অনুগ্রহ দান করেছেন সেহেতু প্রতিটি মানুষের উচিৎ সেই মহান সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে তাঁর শুকরিয়া আদায় করা এবং শরীরের সর্বশেষ শক্তি দিয়ে এই সর্বোত্তম এলাহী নেয়া’মতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।

* আ. তা. ফা. শা. = আজ্জালাল্লাহু তা’য়ালা ফারাজাহুশ্ শারীফ।

দেখুন: ইবনে তাউউস, আলী বিন মুসা, ইকবালুল আ’মাল, পৃ.-২০৭ থেকে ২৩৭ পর্যন্ত, বৈরুত প্রিন্ট, প্রকাশক: মুয়াস্সিসাতুল আয়া’লামি লিল মাতবুআ’ত, ১৪১৭ হিজরী। আল্ মাজলিসি, মুহাম্মদ বাকির, বিহরুল আনওয়ার, খণ্ড-৯৪, পৃ.-৮৫, হা.-৫, বৈরুত প্রিন্ট, প্রকাশক: মুয়াস্সিসাতুল ওয়াফা, ১৪০৩ হিজরী।

আমরা ১৫ই শা’বানের আমলে লিপিবদ্ধ একটি দোয়ায় পড়ে থাকি যে,

((اللهم بحق ليلتنا هذه و مولودها و حجتك و موعودها التى قرنت الى فضلها فضلا فتمت كلمتك صدقا و عدلا لا مبدل لكلماتك ...))

হে আল্লাহ্! তোমাকে এ রাতের ও এ রাতে জন্মগ্রহণকারীর উছিলা দিয়ে ডাকছি এবং তোমার সত্য ও প্রতিশ্রুত হুজ্জাতের উছিলা ধরছি যে, যার কারণে ফযিলতের উপর ফযিলত দিয়েছো। আর তোমার সত্য ও ন্যায়ের বাণী পরিপূর্ণতায় পৌছেছে এবং তোমার বাণীর পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করার ক্ষমতা করো নেই।

দেখুন: ইবনে তাউউস, আলী বিন মুসা, ইকবালুল আ’মাল, পৃ.-২১৯, বৈরুত প্রিন্ট, প্রকাশক: মুয়াস্সিসাতুল আয়া’লামি লিল মাতবুআ’ত, ১৪১৭ হিজরী।

ইমাম মাহদী (আ.তা. ফা. শা.) যে ২৫৫ হিজরীর ১৫ই শা’বনে জন্মগ্রহণ করেছেন তার প্রমাণ শিয়া ও সুন্নি মাযহাবের অনেক রেওয়ায়েতেই পাওয়া যায় এবং উক্ত হাদীসসমূহে এ বিষয়টিও পরিস্কারভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, এ রাতে তাঁর জন্মগ্রহণই হচ্ছে এ রাতের ফযিলতের কারণ।

দেখুন: আল্ কুলাইনী, মুহাম্মদ বিন ইয়াকুব, আল্ কাফী, খণ্ড-১, পৃ.-৫১৪, তেহরান প্রিন্ট, প্রকাশক: দারুল কুতুবিল ইসলামিইয়্যা, সন ১৩৬৫ ফার্সি। আছ্ ছাদুক, মুহাম্মদ বিন আলী ইবনুল হুসাইন, কামালু্দ্দিন ওয়া তামামুন্ নেয়া’মাত, খণ্ড-২, পৃ.-৪৩২, তেহরান প্রিন্ট, প্রকাশক: দারুল কুতুবিল ইসলামিইয়্যা, সন ১৩৯৫ ফার্সি। সাবরাবি, আব্দুল্লাহ্ বিন মুহাম্মদ, আল্ ইত্তাহাফু বিহুব্বিল আশরাফ, পৃ.-১৭৯। ইবনে ছাব্বাগুল মালিকি, নুরুদ্দিন আলী বিন মুহাম্মদ, আল্ ফুছুলুল মুহিম্মাতু ফি মায়া’রিফাতিল আইম্মাহ্, পৃ.-৩১০।

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা এ রাতকে উপলব্দি করার তৌফিক আমাদের সকলকে দান করুন। হয়তো আপনারা ইমাম মাহদী (আ. তা. ফা. শা.)-এর ভুমিষ্ট হওয়া সম্পর্কে বিভিন্ন কথা শুনে থাকবেন, যেমন; ইসলামের কোন মাযহাব বলে থাকে তিনি ভুমিষ্ট হয়েছেন আবার কোন মাযহাব বলে থাকে তিনি শেষ যমানায় ভুমিষ্ট হবেন। তবে এ লেখায় যুক্তি প্রমাণের মাধ্যমে বিষয়টির প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটনের চেষ্টা করেছি পববর্তি আলোচনাটি লক্ষ্য করুন।

মন্তব্য

একটি মন্তব্য

* একটি তারকা চিহ্নিত ফিল্ড অবশ্যই মান থাকা আবশ্যক।