আবির্ভাবের প্রাক্কালে বিশ্ব

আবির্ভাবের প্রাক্কালে বিশ্ব

ক)- আবির্ভাবের সময়ে বিশ্ব:
পূর্বের অধ্যায়সমূহে আমরা দ্বাদশ ইমামের অদৃশ্য এবং তার দর্শন সম্পর্কে আলোচনা করেছি৷ আল্লাহর শেষ হুজ্জাত এজন্যে অদৃশ্যে রয়েছেন যে, প্রেক্ষাপট প্রস্তুত হওয়ার পর তিনি আবির্ভূত হবেন এবং বিশ্বকে সরাসরি হেদায়াত করবেন৷ অদৃশ্যকালীন সময়ে মানুষ সাঠিকভাবে আমল করত তাহলে আবির্ভাবের ক্ষেত্র অতি সত্তর প্রস্তুত হতে পারত৷ কিন্তু শয়তানের ও নফসের তাড়নায়, কোরআনের শিক্ষা থেকে দূরে থাকা এবং পবিত্র ইমামদের বেলায়াত গ্রহণ না করার কারণে মানুষ পথভ্রষ্ঠ হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত অন্যায়ের ঘাঁটি তৈরী করেছে ও অন্যায়-অত্যাচারকে বৃদ্ধি করেছে৷ এ পথকে নির্বাচন করে তারা অতি ভয়ানক পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছে৷ অত্যাচারে পূর্ণ পৃথিবী, ফ্যাসাদ ও ধবংস, আত্মিক ও চারিত্রিক নিরাপত্তার অভাব, পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিকতা বিহীন জীবন, অন্যায়ে ভরা সমাজ এবং কর্মচারীদেরকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা ইত্যাদি হচেছ অদৃশ্যকালীন সময়ের মানুষের কর্মকাণ্ড৷ যে সত্যকে বহু শতাব্দি পূর্বে পবিত্র ইমামগণ বলে গিয়েছেন৷
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) তাঁর এক সাথীকে বলেছেন:
যখন দেখবে অন্যায়-অত্যাচার সবত্র ছড়িয়ে পড়েছে, কোরআনকে ভুলে গিয়েছে এবং ইচছামত তার তাফসীর হচেছ, অসত্য পন্থিরা সত্যপন্থিদের উপর প্রাধান্য পেয়েছে, ঈমানদাররা মুখ বন্ধ করে রেখেছেন, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন হয়েছে, চাটুকারীতা বেড়ে গিয়েছে, সত্যের রাস্তা খালি এবং অন্যায়ের রাস্থা ভরপুর, হালালকে হারাম করা আর হারামকে মার্জিত মনে করা হয়েছে৷ অধিক ধন-সম্পদ আল্লাহর আক্রশের (ফ্যাসাদ ও নষ্টামির) পথে ব্যয় হচেছ, সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে সুধ খাওয়ার প্রচলন ঘটেছে, অবৈধ বিনোদন এত বেশী বৃদ্ধি পেয়েছে যে কেউ তার বিরোধিতা করতে পারছে না৷ কোরআনের হকিকত শুনতে কষ্ট পাচেছ অথচ বাতিলকে অতি সহজেই অনুসরণ করছে৷ অন্য কারো উদ্দেশ্যে আল্লাহর ঘরে হজ্জ করতে যাচেছ, মানুষের হৃদয় কঠিণ হয়ে যাচেছ৷ যদি কেউ ন্যায় কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ করতে যায় তাকে বলা হয় এটা তোমার দায়িত্ব নয়, প্রতি বছর নতুন নতুন ফ্যাসাদ ও বিদয়াতের প্রচলন ঘটছে৷ (যখনই দেখবে মানুষের পরিস্থিতি এমন হয়েছে) সতর্ক থাকবে এবং আল্লাহর কাছে তা থেকে মুক্তি চাইবে৷ (আবির্ভাব নিকটে) (কাফী খণ্ড- ৭, পৃ.-২৮)৷
তবে অদৃশ্যকালীন সময়ের এ অবস্থা অধিক হলেও প্রকৃত ঈমানদার আছে যারা তাদের ঈমানের প্রতি অটল থাকবে এবং ঈমানের গণ্ডিকে রক্ষা করবে৷ তারা সমাজের ফ্যাসাদে নিমজ্জিত হবে না এবং নিজের ভাগ্যকে অন্যদের দুর্ভাগ্যের সাথে জোড়া লাগাবে না৷ তারা আল্লাহর উত্তম বান্দা এবং পবিত্র ও নূরানী ইমামদের শিয়া (অনুসারী) যাদেরকে বিভিন্ন হাদীসেও অনেক প্রশংসা করা হয়েছে৷ তারা নিজেরাও পবিত্রভাবে জীবন-যাপন করেছে এবং অন্যদেরকেও পবিত্রভাবে জীবন-যাপন করার জন্য আহবান করেছে৷ তারা জানে যে, সৎকর্মের প্রসার ঘটলে এবং ঈমানের সুগন্ধে পরিবেশকে সুগন্ধী করলে ইমাম আবির্ভূত হবেন এবং তার সংগ্রাম ও হুকুমতের পথ সুগম হবে৷ কেননা, তখনই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা সম্ভব যখন ইমামের সাহায্যকারী থাকবে৷ এ চিন্তাধারা ঐ বাতিল চিন্তার মোকাবেলায় আনা হয়েছে যারা বলে থাকে যে, ইমামের আবির্ভাবের জন্য অন্যায়ের প্রসার ঘটাতে হবে৷ এটা কি মেনে নেয়া সম্ভব যে, ঈমানদাররা অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে না এজন্যে যে, অন্যায়ের প্রসার ঘটলে ইমাম মাহদী (আ.) আবির্ভূত হবেন? সত্য ও ন্যায়ের প্রসার ঘটার মাধ্যমে সৎকর্মশীলদের ইমামের আবির্ভাব ত্বরান্বিত হওয়া সম্ভবপর নয় কি?
সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা মুসলমাদের উপর ফরজ এবং কখনো ও কোথাও তা থেকে দূরে থাকা সম্ভব নয়৷ সুতরাং আবির্ভাব ত্বরান্বিত হওয়ার জন্য কিরূপে অন্যায় ও অত্যাচারের প্রসার ঘটানো সম্ভব হতে পারে?
এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন:
শেষ যামানায় এমন এক দল আসবে যাদের পুরস্কার ইসলামের প্রথম যুগের উম্মতের সমপরিমাণ হবে৷ কেননা, তারা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করবে এবং ফিত্না-ফ্যাসাদকারীদের সাথে সংগ্রাম করবে (মোজামে আহাদীসিল ইমাম আল মাহদী খণ্ড- ১, পৃ.-৪৯)৷
তাছাড়াও অসংখ্য রেওয়ায়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে পৃথিবী অন্যায়-অত্যাচারে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে তার অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি মানুষই জালেম হয়ে যাবে৷ বরং আল্লাহ্ পথের পথিকরা ঠিকই সে পথে অবিচল থাকবে এবং ফযিলতের সুগন্ধ বিভিন্ন স্থান থেকে নাকে আসবে৷
সুতরাং আবির্ভাবের পূর্বের পৃথিবী তিক্ত হলেও তা আবির্ভাবের সুন্দর পৃথিবীতে গিয়ে শেষ হবে৷ ফ্যাসাদ ও অত্যাচার থাকলেও পাশাপাশি নিজে পবিত্র থাকা এবং অন্যদেরকে সৎকর্মের দিকে আহবান করা মুসলমানদের অবশ্য কর্তব্য এবং তা ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবকে ত্বরান্বিত করতে সরাসরি ভুমিকা পালন করে থাকে৷
এ অধ্যায়টি ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর একটি বাণীর মাধ্যমে শেষ করছি, তিনি বলেছেন:
কোন কিছুই আমাদের অনুসারীদের থেকে আমাদেরকে দূরে রাখে না কেবল মাত্র তাদের গোনাহ ও অসৎকর্ম ব্যতীত (ইহ্তিজাজ, খণ্ড-২, নং ৩৬০, পৃ.-৬০২)৷
খ)- আবির্ভাবের ক্ষেত্র এবং তার আলামতসমূহ:
ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের বিভিন্ন শর্ত ও আলামত রয়েছে যাকে আবির্ভাবের আলামত ও ক্ষেত্রও বলা হয়ে থাকে৷ এই দুটির মধ্যে পার্থক্য হল, ক্ষেত্র আবির্ভাবের ক্ষেত্রে সত্যিকার ভূমিকা রাখে অর্থাৎ ক্ষেত্র প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাব সম্ভব নয়৷ কিন্তু আবির্ভাবের ক্ষেত্রে আলামতের কোন ভূমিকা নেই বরং তার মাধ্যমে কেবলমাত্র আবির্ভাব ও তার নিকটবর্তী হওয়াকে বোঝা সম্ভব৷
উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে, শর্ত ও ক্ষেত্রের গুরুত্ব আলামতের চেয়ে বেশী৷ সুতরাং আমাদের উচিৎ আলামতের চেয়ে ক্ষেত্রের দিকে বেশী গুরুত্ব দেয়া এবং নিজেদের সাধ্যমত তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা৷ একারণেই আমরা প্রথমে আবির্ভাবের ক্ষেত্র ও শর্ত সম্পর্কে আলোচনা করব এবং পরিশেষে সংক্ষেপে কিছু আলামতকে তুলে ধরব৷
১)- আবির্ভাবের ক্ষেত্র
পৃথিবীতে প্রতিটি জিনিসই ক্ষেত্র ও শর্ত প্রস্তুত হওয়ার মাধ্যমে অস্তিত্বমান হয়ে থাকে এবং ক্ষেত্র প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত কোন জিনিসই অস্তিত্বমান হতে পারে না৷ প্রতিটি ভুমিতেই ফসল ফলে না এবং সবধরণের আবহাওয়াতে সকল প্রকার বৃক্ষ জন্মায় না৷ একজন কৃষক তখনই ভাল ফসলের চিন্তা করতে পারে যখন সে ভাল ফসল ফলানোর সকল ব্যবস্থা করে থাকে৷
সুতরাং সকল বিপ্লব ও সামাজিক ঘটনাও তার ক্ষেত্র ও শর্তের উপর নির্ভরশীল৷ ইরানের ইসলামী বিপ্লবও যেমন তার ক্ষেত্র প্রস্তুত হওয়ার মাধ্যমে সফল হয়েছে৷ ইমাম মাহদী (আ.)-এর বিশ্বজনীন সংগ্রাম ও বিপ্লবও যা বিশ্বের সর্ব বৃহৎ সংগ্রাম এ নিয়মের বাইরে নয় এবং ক্ষেত্র ও প্রেক্ষাপট প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত তা বাস্তবায়ীত হবে না৷
একথা বলার কারণ হচেছ আমরা যেন মনে না করি যে, ইমাম   মাহ্দী (আ.)-এর বিপ্লব পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে এবং ইমামের এ সংগ্রাম মোজেযার মাধ্যমে সংঘটিত হবে৷ বরং কোরআনের বাণী ও ইমামদের আদর্শ অনুযায়ী এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, পৃথিবীর সকল কর্মকাণ্ড তার স্বাভাবিক গতিতেই সংঘটিত হবে৷
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন:
আল্লাহপাক চান না যে, পৃথিবীর কর্মকাণ্ড প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে সংঘটিত হোক (মিযানুল হিকমাহ খণ্ড- ৫, হাঃ ৮১৬৬ )৷
একজন ইমাম বাকের (আ.)-কে বলল:
আমরা শুনেছি যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাব ঘটলে সব কিছু তাঁর ইচছা অনুযায়ী চলবে৷
ইমাম বললেন: না, এমনটি নয়৷ আল্লাহর শপথ করে বলছি যদি এমনটিই হত যে, কারো জন্য সব কিছু নিজে নিজেই হয়ে যাবে তাহলে রাসূল (সা.)-এর বেলায়ও তাই ঘটত (গাইবাতে নোমানী বাব ১৫, হাঃ ২)৷
তবে উপরোক্ত কথার অর্থ এই নয় যে, ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর মহান আন্দলনে আল্লাহর কোন মদদ থাকবে না রবং উদ্দেশ্য হচেছ ঐশী সহযোগিতার পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি প্রস্তুত থাকতে হবে৷
এ ভুমিকা থেকে বুঝতে পারলাম যে, প্রথমে আবির্ভাবের পরিবেশ ও পরিস্থিতিকে জানতে হবে অতঃপর তা বাস্তবায়ণ করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে৷
ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন বিপ্লবের চারটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রয়েছে যার প্রত্যেকটিকে পৃথকভাবে আলোচনা করব:
(ক) কর্মসূচী: এটা স্পষ্ট যে, প্রতিটি সংগ্রামের জন্য দুটি কর্মসূচীর প্রয়োজন রয়েছে৷
১৷ অনাকাপিখত পরিস্থিতির সাথে সংগ্রামের জন্য কর্মসূচী গ্রহণ ও সৈন্য বিন্যাস করা৷
২৷ সমাজের সকল প্রয়োজন মেটাতে এবং একটি রাষ্ট্রের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অধিকারকে সুনিশ্চিত করতে এবং সমাজকে একটি আদর্শ ও কাপিখত পর্যায়ে পৌঁছানোর সুব্যবস্থা করতে তেমন একটি পরিপূর্ণ ও উপযুক্ত নীতিমালা প্রয়োজন৷
পবিত্র কোরআনের শিক্ষা এবং পবিত্র মাসুম (আ.)-গণের পন্থাই হচেছ সেই চিরন্তন ইসলাম এবং তা সর্বোত্তম নীতিমালা ও কর্মসূচী হিসাবে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর কাছে রয়েছে৷ তিনি এই নীতিমালা অনুসারে আমল করবেন (ইমাম বাকের (আ.) ইমাম মাহদী (আ.) সম্পর্কে বলেছেন: তিনি আল্লাহর কিতাব কোরআন অনুসারে আমল করবেন এবং সকল প্রকার অন্যায়ের বিরুদ্ধাচারণ করবেন৷ বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৫১, পৃ.-১৪১)৷ যে আসমানী কিতাবের সকল আয়াত আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন এবং তিনি মানুষের জীবনের সকল প্রকার পার্থিব ও আধ্যাত্মিক চাহিদা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত৷ সুতরাং তাঁর বিশ্বজনীন বিপ্লব এক নজির বিহীন সম্মতির অধিকারী এবং অন্য কোন বিপ্লব ও সংগ্রামের সাথে এর তুলনা চলে না৷ এ দাবীটা হয়তবা এমন হতে পারে যে, বর্তমান বিশ্ব পার্থিব সকল প্রকার নীতিমালাকে পরীক্ষা করে তার দূর্বলতাকে মেনে নিয়েছে এবং ধীরে ধীরে ঐশী নীতিমালাকে মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচেছ৷
আমেরিকার রাজনীতিবীদদের উপদেষ্টা "আলভীন তাফলার" এই সমস্যার সমাধান এবং বিশ্বসমাজকে সংষ্কারের জন্য "তৃত্বীয় তরঙ্গ নামে" একটি থিউরী দিয়েছেন৷ তারপরও তিনি এ বিষয়ে অনেক কিছুই স্বীকার করেছেন৷ 
পশ্চিমা বিশ্ব যে সকল সমস্যায় জর্জরিত তা গুনে শেষ করা যাবে না৷ উন্নত বিশ্বের অবনতি ও ফিত্না-ফ্যাসাদ দেখে আশ্চর্যবোধ হয় এবং তাদের চারিত্রিক অবক্ষয় রুচিশীল মানুষের নাশিকাকে পীড়া দেয়৷ ফলস্বরূপ অশান্তির তরঙ্গ পৃথিবীকে পরিবেষ্টন করে ফেলেছে৷ এই সমস্যার সমাধানের জন্য হাজারও পরিকল্পনা ও কর্মসূচী উত্থাপিত হয়ে থাকে এবং সকলেই বলে থাকেন যে, তা মৌলিক এমনকি বৈপ্লবিক৷ কিন্তু বার বারই এ পরিকল্পনাসমূহ ভেস্তে যায় এবং সমস্যার উপর সমস্যা সৃষ্টি হয় এবং এটা মানুষের মধ্যে হতাশা বৃদ্ধি করে এবং কোন সুফলদান করে না৷ এই অনুভূতি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য খুবই ক্ষতিকর এবং তা বাগধারার সেই সাদা অস্বারোহির প্রয়োজনীয়তাকে দ্বিগুন বাড়িয়ে দেয় (ফাসল নামে ইনতিযার দ্বিতীয় বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা পৃ.-৯৮)৷
(খ) নেতৃত্ব: প্রতিটি সংগ্রামের জন্যই একজন নেতার প্রয়োজন এবং সংগ্রাম যত বেশী বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হবে তেমন যোগ্য নেতার প্রয়োজনও বেশী অনুভূত হবে৷ 
বিশ্বব্যাপী জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং পৃথিবীতে ন্যায়বিচার ও সাম্য গড়ে তুলতে একজন বিচক্ষণ, যোগ্য এবং দয়ালু নেতার অতি প্রয়োজন৷ কেননা, তিনিই সঠিক ভাবে এ সংগ্রামকে পরিচালনা করতে পারেন৷ ইমাম মাহ্দী (আ.) যেহেতু সকল নবী ও আওলীয়াদের নির্যাস তাই তিনি এই মহান সংগ্রামের নেতা এবং তিনি জীবিত৷ তিনিই একমাত্র নেতা যিনি আলামে গাইবের সাথে সম্পর্ক রাখার কারণে বিশ্বেও সকল কিছু সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত এবং তাঁর সময়ের সবচেয়ে জ্ঞানি ব্যক্তি৷
রাসূল (সা.) বলেছেন:
যেনে রাখ মাহ্দী সকল জ্ঞানের উত্তরাধিকারী এবং সকল বিষয়ের উপর জ্ঞান রাখে (নাজমুছ ছাকীব পৃ.-১৯৩)৷
তিনিই একমাত্র নেতা যিনি সকল বাধ্যবাধকতার বাইরে এবং শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যস্ত৷ সুতরাং বিশ্ব সংগ্রামের নেতা ও সর্বোত্তম নেতা৷
(গ) সাহায্যকারীগণ: আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট এবং শর্তের মধ্যে যোগ্য সাহায্যকারীর প্রয়োজন রয়েছে৷ ঐশী নেতার জন্য তেমন যোগ্য সাহায্যকারীর প্রয়োজন তো অতি স্বাভাবিক ব্যপার৷ এমনটি নয় যে, যে ব্যক্তিই দাবী করবে সে ব্যক্তিই সাহয্যকারীর মধ্যে পরিগণিত হবে৷
মামুন রাকী বর্ণনা করেন: একদা ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর সাথে ছিলাম, সাহল বিন হাসান খোরাসানী এসে সালাম করে বলল, "হে রাসূল (সা.)-এর সন্তান! আপনি প্রকৃত ইমাম কারণ আপনি রহমত ও অনুগ্রহ পরায়ণ বংশের সন্তান, কেন আপনি আপনার এক লক্ষ সৈন্য যারা শত্রুদের সাথে লড়তে প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও আপনার ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করছেন না?"
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বললেন: "হে খোরাসানী বস, এখনই তোমার সামনে সত্য প্রকাশিত হয়ে যাবে৷ ইমাম (আ.)তার দাসীকে চুলা জ্বালানোর র্নির্দেশ দিলেন৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই চুলা আগুনে পরিপূর্ণ হয়ে গেল৷"  
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) সাহলকে বললেন: "হে খোরাসানী যাও ঐ আগুনের মধ্যে গিয়ে বস!"
খোরাসানী বলল: "হে রাসূল (সা.)-এর সন্তান! আমাকে ক্ষমা করুন আমাকে আগুনে পোড়াবেন না৷"
ইমাম (আ.) বললেন: "অস্থির হয়ো না, তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি৷"
এমন সময় হারুন মাক্কি জুতা খুলে হাতে নিয়ে খালি পায়ে ইমামের (আ.) কাছে উপস্থিত হল এবং সালাম দিল৷ ইমাম (আ.) তার সালামের জবাব দিয়ে বললেন: "জুতা রেখে, যাও ঐ আগুনের মধ্যে গিয়ে বস!"
হারুন জুতা রেখে তৎক্ষণাত আগুনের মধ্যে গিয়ে বসল৷
ইমাম (আ.) খোরাসানীর সাথে খোরাসানের বাজার এবং বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে এমনভাবে আলোচনা করতে লাগলেন যে মনে হচিছল তিনি অনেকদিন যাবৎ সেখানে বসবাস করতেন৷ অতঃপর সাহলকে বললেন যাও দেখে আস হারুন আগুনের মধ্যে কি করছে৷ আমি যেয়ে দেখলাম হারুন আগুনের মধ্যে হাঁটু পেতে বসে আছে৷ আমাকে দেখে আগুনের মধ্য থেকে বেরিয়ে এসে সালাম করল৷ ইমাম (আ.) সাহলকে বললেন: "খোরাসানে এ ধরনের কজন লোক পাওয়া যাবে৷"
সাহল বলল: "আল্লাহর শপথ! এ ধরনের একজন লোকও ওখানে পাওয়া যাবে না৷"  
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বললেন: "আল্লাহর শপথ! এ ধরনের একজন লোকও ওখানে পাওয়া যাবে না৷ যদি এ ধরনের পাঁচজন লোকও পেতাম তাহলে সংগ্রাম করতাম৷ আমরাই ভাল জানি যে, কখন আমাদেরকে সংগ্রাম করতে হবে" (বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- ৪৭ পৃ.-১২৩ এবং সাফিনাতুল বাহার খণ্ড- ৮, পৃ.-৬৮১)৷
সুতরাং আমাদেরকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাহয্যকারীদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে হবে তাহলে আমরা আমাদেরকে চিনতে পারব এবং সমস্যা সমাধানের জন্য সচেষ্ট্য হব৷
১- পরিচিতি এবং অনুসরণ: ইমাম মাহদী (আ.)-এর অনুসারীরা তাদের আল্লাহ্ এবং ইমামকে খুব ভালভাবে চেনে এবং পরিপূর্ণ পরিচিতির সাথে সত্যের ময়দানে উপস্থিত হয়৷
ইমাম আলী (আ.) তাদের সম্পর্কে বলেছেন: তারা আল্লাকে সঠিকভাবে চিনেছে (মুনতাখাবুল আছার অধ্যায় ৮, বাব ১, হাঃ ২, পৃ.-৬১১)৷
ইমাম পরিচিতিও তাদের অস্তিত্বকে পরিবেষ্টিত করেছে তবে এ পরিচিতি নাম, ঠিকানা এবং বংশ পরিচিতির অনেক ঊধের্ব৷ তারা ইমামের বেলায়তকে চিনেছে এবং তারা জানে যে, এ পৃথিবীতে ইমামের মর্যাদা কত বেশী৷ এ পরিচিতির কারণেই তারা ইমামকে অধিক ভালবাসে এবং তাঁর নির্দেশ পালনের জন্য সর্বদা প্রস্তুত৷ কেননা তারা জানে যে, ইমামের নির্দেশ আল্লাহরই নির্দেশ এবং তাঁর অনুসরণ আল্লাহরই অনুসরণ৷
রাসূল (সা.) তাদের সম্পর্কে বলেছেন: তারা তাদের ইমামের নিদের্শ পালন ও অনুসরণের জন্য সর্বদা চেষ্টা করবে (ইয়াওমুল খালাস পৃ.-২২৩)৷
২- ইবাদাৎ এবং সালাবাত: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর অনুসারীরা ইবাদতের ক্ষেত্রেও তাদের ইমামের কাছ থেকে আদর্শ নিয়েছেন৷ তারা দিবারাত্রকে আল্লাহর যিকির করে অতিবাহিত করে৷ ইমাম জাফর সাদিক (আ.) তাদের সম্পর্কে বলেছেন:
তারা ইবাদতের মাধ্যমে রাত অতিবাহিত করে এবং রোজার মাধ্যমে দিন অতিবাহিত করে (ইয়াওমুল খালাস পৃ.-২২৪৷
তিনি আরও বলেছেন: তারা উটের পিঠেও আল্লাহর ইবাদত করেন (বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড- ৫২, পৃ.-৩০৮)৷
এই আল্লাহর যিকরই তাদেরকে লৌহ মানবে রূপান্তরিত করেছে এবং একারনেই কোন কিছুই তাদের দৃঢ়তাকে ছিনিয়ে নিতে পারে না৷ ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: 
তারা এমন মানুষ যে তাদের মনবল যেন লোহার মত কঠিন (বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড- ৫২, পৃ.-৩০৮)৷
৩- শাহাদত পিয়াশি এবং আত্মত্যাগী: ইমাম মাহ্দীর অনুসরারীরা তাদের ইমাম সম্পর্কে গভীর পরিচিতি রাখার কারণে তাদের অন্তরসমূহ ইমামের মহববতে পরিপূর্ণ৷ সুতরাং যুদ্ধের ময়দানে তারা তাদের ইমামকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রাখবে এবং মৃত্যুকে নিজেদের জীবন দিয়ে ক্রয় করে নিবে৷
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: ইমাম মাহদীর অনুসারীরা যুদ্ধের ময়দানে তাঁর চারপাশে বিচরণ করবে এবং জীবন দিয়ে স্বীয় ইমামের হিফাজত করবে (বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড- ৫২, পৃ.-৩০৮)৷
তিনি আরও বলেছেন: তারা ইচছ পোষণ করেন যেন আল্লাহর রাস্থায় শাহাদাত বরণ করতে পারেন (বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড- ৫২, পৃ.-৩০৮)৷
৪- সাহসীকতা এবং বীরত্ব: ইমাম মাহদী (আ.)-এর সাহায্যকারীরা তাদের মাওলার ন্যায় সাহসী এবং শক্তিশালী বীরপুরুষ৷ ইমাম আলী (আ.) তাদের সম্পর্কে বলেছেন:
তারা প্রত্যেকেই এমন সিংহ যারা খাঁচা থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং তারা যদি ইচছা করে তাহলে পাহাড়কেও স্থানান্তরিত করতে পারে (ইয়াওমুল খালাস, পৃ.-২২৪)৷
৫-ধৈর্য ও সবর: বিশ্বব্যাপী অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়তে এবং ন্যায়-নীতিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তুলতে অনেক কষ্ট করতে হবে আর ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাহায্যকারীরা সকল সমস্যাকে জীবন দিয়ে ক্রয় করবে৷ কিন্তু তারা এখলাস ও নমনীয়তার কারণে নিজেদের কাজকে অতি সামান্য মনে করে৷
ইমাম আলী (আ.) বলেছেন: তারা এমন এক দল যরা আল্লাহর রাস্থায় ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর উপর অধিকার দাবি করে না৷ তারা আল্লাহর রাস্তায় জীবন দান করে বড়াই করে না এবং সেটাকে অনেক বড় কিছু মনে করে না (সম্পূর্ণ এখলাসের সাথে তারা এ কাজ করে থাকে (মুনতাখাবুল আছার অধ্যায় ৬, বাব ১১, হাঃ ৪, পৃ.-৫৮১)৷
৬- ঐক্য এবং সহমর্মিতা: ইমাম আলী (আ.) ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাহায্যকারীদের মধ্যে ঐক্য ও সহমর্মিতা সম্পর্কে বলেছেন: তারা প্রত্যেকেই ঐক্যবদ্ধ এবং আন্তরিক (ইয়াওমুল খালাস পৃ.-২২৩)৷
এই আন্তরিকতা এবং ঐক্যের কারণ হচেছ তাদের মধ্যে কোন স্বার্থপরতা, অহংকার এবং ব্যক্তিগত চাহিদা নেই৷ তারা সঠিত আক্বীদা নিয়ে এক পতাকার নিচে একই উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করে এবং এটাই শত্রুও বিরুদ্ধে তাদের বিজয়ের কারণ৷
৭- যোহ্দ বা সাধারণ জীবন-যাপন: ইমাম আলী (আ.) ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাহায্যকারীদের সম্পর্কে বলেছেন: তিনি তাঁর সাহায্যকারীদের কাছে বায়াত গ্রহণ করবেন যে, তারা যেন সোনা-জহরত এবং চাল ও গম গচিছত না করে (মুনতাখাবুল আছার অধ্যায় ৬, বাব ১১, হাঃ ৪, পৃ.-৫৮১)৷
তাদের অনেক বড় উদ্দেশ্য রয়েছে এবং তারা মহান উদ্দেশ্যের জন্য প্রস্তুত হয়েছে, দুনিয়া এবং পার্থিবতা যেন তাদেরকে মহান উদ্ধেশ্য থেকে বিরত না রাখে৷ সুতরাং দুনিয়ার চাকচিক্য দেখে যাদের চোখ বড় হয়ে যায় এবং মন অস্তির হয়ে যায় ইমাম মহদী (আ.)-এর সাহায্যকারীদের মধ্যে তাদের কোন স্থান নেই৷ এখানে ইমাম মহাদী (আ.)-এর সাহায্যকারীদের সামান্য কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হল আর এ ধরনের উত্তম বৈশিষ্টের অধিকারী হওয়ার কারণে বিভিন্ন হাদীসে তাদেরকে প্রশংসা করা হয়েছে৷
তাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন:
اولئک هم خيار الامة
তারা আমার সর্বোত্তম উম্মত (ইয়াওমুল, খালাস পৃ.-২২৪)৷
ইমাম আলী (আ.) বলেছন:
فبابی و امی من عدة قليلة اسمائهم فی الارض مجهولة
আমার পিতা-মাতা সেই স্বল্প সংখ্যকদের জন্য উৎসর্গিত হোক যারা (আল্লাহর অতি উত্তম বান্দা হওয়া সত্ত্বেও) পৃথিবীতে অপরিচিত রয়েছে (মোজামে আহাদীসে ইমাম আল মাহদী, খণ্ড- ৩, পৃ.-১০১)৷
তবে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাহায্যকারীরা তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে বিভিন্ন পর্যায়ে থাকবে৷ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে ইমাম মাহ্দী (আ.) তার ৩১৩ জন বিশেষ সাহায্যকারী নিয়ে সংগ্রাম করবেন যারা এ সংগ্রামের প্রধান ভূমিকা রাখবেন, তারা ব্যতীত আরও দশ হাজার বিশেষ সৈন্য থাকবে এবং আরও শত-সহস্র মুমিনগণ ইমামের সাহায্যে এগিয়ে আসবেন৷ 
(ঘ)- সর্বসাধারণের প্রস্তুতি: পবিত্র ইমামদের ইতিহাসে দেখা যায় যে, তাঁদের উম্মতরা তাঁদের কাছ থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত ছিল না৷ তারা পবিত্র ইমামের উপস্থিতিকে মূল্যায়ণ করত না এবং তাদের হেদায়েত গ্রহণ করত না৷ আল্লাহ তাআলা তাঁর শেষ হুজ্জাতকে অদৃশ্যে রেখেছেন এবং যখন প্রত্যেকেই তাঁকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হবে আল্লাহর নির্দেশে তিনি আবির্ভূত হবেন এবং প্রত্যেকেই তিনি ঐশী মারেফাতে পরিতৃপ্ত করবেন৷ 
সুতরাং সেই মহান সংস্কারকের আবির্ভাবের জন্য প্রস্তুতি থাকার একান্ত প্রয়োজন রয়েছে৷ কেননা, প্রস্তুত থাকার মাধ্যমেই ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সংস্কার আন্দলোন তার চুড়ান্ত সফলতায় উপণীত হবে৷
পবিত্র কোরআনে বর্নিত হয়েছে বণী ইসরাঈলের এক দল অত্যাচারী শাসক জালুতের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে তাদের নবীর (শামওয়ীল) কাছে এসে বলল: আমাদের জন্য একজন নেতা নিধারণ করুন যার নেতৃত্বে আমরা আল্লাহর পথে জালুতের সাথে যুদ্ধ করব৷
﴿أَلَمْ تَرَ إِلَي الْمَلَإِ مِنْ بَني إِسْرَئيلَ مِنْ بَعْدِ موسي إِذْ قالوا لِنَبي لَهُمُ ابْعَثْ لَنا مَلِكاً نُقَتِلْ في سَبيلِ اللّهِ قالَ هَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتالُ أَلَا تُقَتِلوا قالوا وَ ما لَنا أَلَا نُقَتِلَ في سَبيلِ اللّهِ وَ قَدْ أُخْرِجْنا مِنْ ذيَرِنا وَ أَبْنائِنا فَلَمَا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتالُ تَوَلّوْا إِلَا قَليلاً مِنْهُمْ وَ اللّهُ عَليمٌ بِالظّلِمينَ﴾
"তুমি কি মুসার পরবর্তী বণী ইসরাঈল প্রধানদেরকে দেখনি? তারা যখন তাদের নবীকে বলেছিল, "আমাদের জন্য এক জন নেতা নিযুক্ত কর যাতে আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি৷" তিনি বললেন: "এটা তো হবে না যে, তোমাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেওয়া হলে তখন আর তোমরা যুদ্ধ করবে না?" তারা বলল: "আমরা যখন স্ব স্ব আবাসভূমি ও স্বীয় সন্তান-সন্ততি হতে বহিষকৃত হয়েছি, তখন আল্লাহর পথে কেন যুদ্ধ করব না?" অতঃপর যখন তাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেওয়া হল তখন তাদের সল্প সংখ্যক ব্যতীত সকলেই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল এবং আল্লাহ যালিমদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত (সূরা বাকারা আয়াত নং ২৪৬)৷
যুদ্ধের জন্য নেতা চাওয়া প্রমাণ করে যে, তরা প্রস্তুত ছিল যদিও তাদের অধিকাংশই মাঝ পথে কেটে পড়েছিল এবং অতি স্বল্প সংখ্যক অবশিষ্ট ছিল৷
সুতরাং আবির্ভাব তখনই হবে যখন প্রত্যেকেই আন্তরিকভাবে সামাজিক ন্যায়বিচার, চারিত্রিক ও মানসিক নিরাপত্তা এবং আত্মিক উন্নতি ও সাফল্য চাইবে৷ যখন মানুষ অন্যায় ও বৈষম্য থেকে অতিষ্ট হয়ে পড়বে এবং দেখবে যে, প্রকাশ্যে ধনিদের মাধ্যমে দূর্বলদের অধিকার পয়মল হচেছ৷ পার্থিব সম্পদ একটি বিশেষ শ্রেণীর কাছে গচিছত হচেছ, যখন অনেকেই শুধুমাত্র একবেলা খাওয়ার জন্য মানবেতর জীবন-যাপন করছে ঠিক তখনই এক দল নিজেদের জন্য প্রাসাদ তৈরী করতে ব্যস্ত এবং বিশাল আয়োজন -অনুষ্ঠান ও রংবেরংয়ের খাদ্য সামগ্রি নিয়ে উৎসবে মাতামাতি করছে৷ এমন পরিস্থিতিতে সকলেই ন্যায়বিচারের জন্য আকুল হয়ে উঠবে৷
যখন চারিত্রিক অবনতি বিভিন্নভাবে সমাজে প্রচলিত হবে এবং মানুষ চরিত্র বহির্ভূত কাজে একেঅপরের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতির্ণ হবে এমনকি তারা তাদের কুকর্ম নিয়ে গর্ববোধ করবে অথবা ইসলামী নীতিমালা থেকে এতবেশী দূরে সরে যাবে যে, অনেক ধরনের গর্হিত কাজকে (পতিতা বৃত্তি, সমকামিতা, অশালিনতা...) আনইসংগত করে নিবে৷ ফলশ্রুতিতে পারিবারিক শৃপখলা পঙ্গু হয়ে পড়বে, ইয়াতিম ও অনাথ সন্তানে পৃথিবী ভরে যাবে৷ তখনই যে নেতার হুকুমত বিশ্বে চারিত্রিক নিরাপত্তা দান করবে তার চাহিদা বেশী অনুভব হবে৷ যখন মানুষ পার্থিব সকল আরাম-আয়েশকে উপভোগ করতে অথচ শান্তি অনুভব করবে না তখন তারাও আধ্যাত্মিক বিশ্বের খোঁজ নিবে এবং ইমামের অপেক্ষায় থাকবে৷
তখনই মানুষ ইমামের জন্য আকুল হয়ে অপেক্ষা করবে যখন তারা মানুষের সকল ধরনের শাসনব্যবস্থাকে দেখবে এবং শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছবে যে, একমাত্র আল্লাহর প্রতিনিধি ইমাম মাহদী (আ.) আমাদেরকে শান্তি দিতে পারেন৷ একমাত্র যে নীতিমালা পবিত্র ও সুনিপুন জীবন মানুষের জন্যে বয়ে আনতে পারে তা হল ঐশী নীতিমালা৷ সুতরাং সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে ইমামের উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তাকে উপলব্ধি করতে হবে এবং সাথে সাথে ইমামের আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট তৈরী করার জন্য চেষ্টা করতে হবে এবং সকল প্রতিবন্ধকতাকে দূর করতে হবে৷ তখনই কেবল ইমামের আবির্ভাব জটবে৷
রাসূল (সা.) এ সম্পর্কে বলেছেন: এমন সময় আসবে যখন অন্যায়-অত্যাচার থেকে মুক্তির জন্য মোমিনদের আর কোন আশ্রয় থাকবে না৷ তখন আল্লাহ তাআলা আমার বংশ থেকে একজনকে (ইমাম মাহ্দীকে) প্রেরণ করবেন (আকদু দারার পৃ.-৭৩)৷
২)- আবির্ভাবের নিদর্শন
ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন বিপ্লবের বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে৷ এ নিদর্শনসমূহ জানা থাকলে আমাদের অনেক উপকার হবে৷ এই নির্দশনসমূহ যেহেতু ইমমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের সংবাদ দেয় এবং তার এক একটি পরিদৃষ্ট হওয়ার সাথে সাথে প্রতীক্ষাকারীদের মনে আশার আলো জাগায় এবং দুশমনদের মনে ত্রাস সঞ্চার করে৷ কেননা, এর মাধ্যমে তাদের অত্যাচারের পালা শেষ হবে এবং মুমিনদের জন্য পবিত্র ইমামের সাথে থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার সুযোগ হবে৷ তাছাড়াও আমাদের যদি জানা থাকে যে, ভবিষ্যতে কি ঘটবে তাহলে আমরা সে অনুযায়ী কাজ করতে পারব এবং বুঝতে পারবে যে, তখন আমাদের কি করতে হবে৷ এটা আমাদেরকে ভণ্ড মাহ্দী দাবীকারীদেরকে চিনতে সাহায্য করবে৷ সুতরাং যদি কেউ মিথ্যা মাহ্দী দাবী করে এবং তার সংগ্রামে এসকল নিদর্শন না থাকে তাহলে অতি সহজেই বুঝে নেওয়া সম্ভব হবে যে, সে মিথ্যা দাবী করছে৷
পবিত্র ইমামদের বাণীতে আবির্ভাবের অনেক নিদর্শন বর্ণিত হয়েছে তার কিছু কিছু স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক এবং কিছু কিছু অস্বাভাবিক ও অলৌকিক৷ এ নিদর্শনসমূহের মধ্য থেকে প্রথমে আমরা নির্ভরযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ রেওয়ায়েতসমূহ বর্ণনা করব এবং শেষে সংক্ষেপে আরও কিছূ নিদর্শন বর্ণনা করব৷
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: ইমাম মাহদী (আ.)-এর সংগ্রামের পাঁচটি নিদর্শন রয়েছে, যা হচেছ: সুফিয়ানির আবির্ভা, ইয়ামানির আবির্ভাব, আসমানী গায়েবী আওয়াজ, নাফসে যাকিয়ার হত্যা এবং খুসুফে বাইদা গাইবাতে নোমানি বাব ১৪, হাঃ ৯, পৃ.-২৬১)৷
এখন উপরোক্ত পাঁচটি নিদর্শনের ব্যাখ্যা দেওয়া হল যদিও এর সবকটিই হয়ত বস্তুনিষ্ঠ নয়৷
(ক)- সুফিয়ানির আবির্ভাব: সুফিয়ানির আবির্ভাব একটি নিদর্শন যা বিভিন্ন রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে৷ সুফিয়ানি, আবু সুফিয়ানের বংশধর যে ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের কিছু দিন পূর্বে সিরিয়াতে সংগ্রাম করবে৷ সে এমন এক অত্যাচারি যে হত্যা করতে কোন পরওয়া করে না এবং তার শত্রুদের সাথে অতি ভয়ানক আচরণ করবে৷
ইমাম জাফর সাদিক (আ.) তার সম্পর্কে বলেছেন:
যদি সুফিয়ানিকে দেখ তাহলে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম লোককে দেখলে (কামালুদ্দিন খণ্ড- ২, বাব ৫৭, হাঃ ১০, পৃ.-৫৫৭)৷
সে রজব মাসে তার সংগ্রাম শুরু করবে৷ সে সমগ্র সিরিয়াকে তার আয়ত্বে আনার পর ইরাকে হামলা করবে এবং বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটাবে৷
হাদীসের বর্ণনা মতে তার সংগ্রাম থেকে হত্যা হওয়া পর্যন্ত পনের মাস সময় লাগবে (গাইবাতে নোমানি, বাব ১৮, হাঃ ১, পৃ.-৩১০)৷
(খ)- খুসুফে বাইদা : খুসুফ অর্থাৎ তলিয়ে যাওয়া এবং বাইদা হচেছ মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী স্থান৷ খুসুফে বাইদার ঘটনাটি হচেছ যে, সুফিয়ানি ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাথে যুদ্ধের জন্য মক্কার উদ্দেশ্যে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করবে৷ তার সৈন্যরা যখন বাইদায় পৌঁছাবে অলৌকিকভাবে তারা মাটির নিচে তলিয়ে যাবে৷
ইমাম বাকের (আ.) এসম্পর্কে বলেছেন: সুফিয়ানির সেনা প্রধান জানতে পারবে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.) মক্কার দিকে রওনা হয়েছেন৷ অতঃপর সৈন্য বাহিনেকে তাঁর দিকে প্রেরণ করবে কিন্তু তাঁকে দেখতে পাবে না৷ যখন তার সেনাবাহিনী বাইদায় পৌঁছবে গায়েবী আওয়াজ আসবে "হে বাইদা তাদেরকে ধবংস কর" অতঃপর সেই স্থান তাদেরকে তলিয়ে নিবে (ঐ বাব ১৪, হাঃ ৬৭, পৃ.-২৮৯)৷
(গ)- ইয়ামানির আবির্ভাব: ইয়ামান থেকে এক নেতার সংগ্রাম একটি নিদর্শন যা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের কিছু পূর্বে ঘটবে৷ তিনি একজন মুমিন ও মোখলেস বান্দা৷ তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবেন এবং সর্বশক্তি দিয়ে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়বেন৷ তবে সে সম্পর্কে আমাদের বিস্তারিত কিছু জানা নেই৷
ইমাম বাকের (আ.) এসম্পর্কে বলেছেন: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের পূর্বে যতগুলো সংগ্রাম হবে তার মধ্যে ইয়ামানির সংগ্রামের পতাকা হেদায়েতপূর্ণ৷ তার পতাকাই হচেছ হেদায়েতের পতাকা৷ কেননা, সে তোমাদেরকে তোমাদের ইমামের দিকে আহবান করে (ঐ বাব ১৪, হাঃ ১৩, পৃ.-২৬৪)৷
(ঘ)- আসমানি আওয়াজ: আর্বিভাবের পূর্বে অপর যে নিদর্শনটি দেখা যাবে তা হল আসমানী আওয়াজ৷ এই আসমানী আওয়াজ হাদীসের ভাষ্যমতে হযরত জীব্রাইলের আওয়াজ এবং তা রমযান মাসে শুনতে পাওয়া যাবে (গাইবাতে নোমানি, পৃ.-২৬২)৷ ইমা মাহ্দী (আ.)-এর সংগ্রাম যেহেতু বিশ্বজনীন এবং প্রত্যেকেই তার অপেক্ষায় রয়েছে সুতরাং এ আওয়াজের মাধ্যমেই প্রত্যেকে খবর পাবে যে, ইমাম মাহ্দী (আ.) আবির্ভূত হয়েছেন৷
ইমাম বাকের (আ.) এসম্পর্কে বলেছেন: আসমানী গায়েবী আওয়াজ না আসা পর্যন্ত আমাদের কায়েম কিয়াম করবেন না, যে আওয়াজ পূর্ব ও পশ্চিমের সকলেই শুনতে পাবে (গাইবাতে নোমানি, হাঃ ১৪, পৃ.-২৬৫)৷
এই আওয়জ মুমিনদের জন্য যেমন আন্দদায়ক অসৎকর্মশীলদের জন্য তেমন কঠিন৷ কেননা, তাদেরকে অন্যায় ত্যাগ করে সৎকর্মশীল হতে হবে৷
এই আওয়াজ সম্পর্কে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: আহবানকারী ইমাম মাহ্দী (আ.) ও তাঁর পিতার নাম ধরে আহবান করবেন (গাইবাতে নোমানি, বাব ১০, হাঃ ২৯, পৃ.-২৬৫)৷
(ঙ)- নাফসে যাকিয়ার হত্যা: নাফসে যাকিয়ার অর্থ হচেছ যে ব্যক্তি পূর্ণতায় পৌঁছেছে অথবা পবিত্র ও নিষপাপ ব্যক্তি যে কোন হত্যাকান্ডে লিপ্ত হয় নি বা অন্যায় করে নি৷ ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের কিছু পূর্বে একজন নিষপাপ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তি তার বিরোধিদের হাতে নিহত হবেন৷
হাদীসের ভাষ্যমতে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের ১৫ দিন পূর্বে এ ঘটনাটি ঘটবে৷ ইমাম জাফর সাদিক (আ.) এ সম্পর্কে বলেছেন:
ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাব এবং নাফসে যাকিয়ার নিহত হওয়ার মধ্যে মাত্র ১৫টি রাতের ব্যবধান (কামালুদ্দিন, খণ্ড- ২, বাব ৫৭, হাঃ ২, পৃ.-৫৫৪)৷
ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের আরও অনেক নিদর্শন রয়েছে তার মধ্যে হচেছ: দজ্জালের আগমন (একটি ভন্ড ও নিকৃষ্ট চরিত্র যে অনেক মানুষকে গোমরাহ করবে) রমযান মাসে চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণ৷ ফিত্নাসমূহ প্রকাশ পাবে এবং খোরাসান থেকে এক ব্যক্তি সংগ্রাম করবে৷

মন্তব্য

একটি মন্তব্য

* একটি তারকা চিহ্নিত ফিল্ড অবশ্যই মান থাকা আবশ্যক।