আদর্শ মানব হযরত মুহাম্মদ (সা.) –৪র্থ পর্ব

আদর্শ মানব হযরত মুহাম্মদ (সা.) –৪র্থ পর্ব

রাসূল (সাঃ) মদীনায় তাঁর দশ বছরের জীবনে যা কিছু করেছিলেন তার উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের উচ্চতর মূল্যবোধগুলোর বাস্তবায়ন৷ মদীনায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কার ছিল এরই অংশ৷ আমরা আগেও বলেছি বিশ্বনবী (সাঃ) ইসলামের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্যে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিসহ জাতীয় ঐক্যের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন৷ তিনি ভুল রীতি ও কু-প্রথাগুলোর পরিবর্তে মহান আল্লাহর বিধানকে সমাজের চালিকাশক্তিতে পরিণত করেন৷ তাওহীদ বা একত্বাদ সমাজের মানুষের মধ্যে অহংকার বা বিভেদ ও বিভক্তির সীমারেখাগুলো মুছে ফেলে এবং এটাই হয়ে ওঠে মুসলমানদের একতার কেন্দ্রবিন্দু৷
মদীনার মানুষের মন থেকে জাহেলী যুগের ধারণাগুলো মুছে ফেলা ছিল সেখানে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিশ্বনবী (সাঃ)'র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ৷ অযৌক্তিক প্রথা ও রীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে ও বিবেকের অনুসারী হতে রাসূল (সাঃ)'র আহবান ছিল তাঁর প্রবর্তিত ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কর্মসূচী৷ সেযুগে সাংস্কৃতিক অনাচার তথা ভুল ধারণাগুলো সমাজের অস্তিত্বের জন্যে হুমকী হয়ে উঠেছিল৷ উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সেযুগে দয়াহীনতা বা নির্দয় আচরণকে সাহসিকতা বলে মনে করা হতো এবং রক্তপাত ও হত্যাকান্ডকে মনে করা হতো বীরত্ব! বলদর্পীতা ছিল শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড এবং গোত্রীয় বা বংশীয় গর্ব ও অহংকার ছিল মূল্যবোধ বা সম্মানজনক বিষয়! জনগণের মধ্যে আলোচনা ও মত বিনিময়ের আসর ছিল বিশ্বনবী (সাঃ)'র অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় কর্মসূচী৷ এর ফলে জ্ঞান-চর্চার এক বাঁধ-ভাঙ্গা জোয়ার সৃষ্টি হয় এবং জনগণের সৃষ্টিশীল চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটে৷ রাসূলে খোদা (সাঃ) সবার মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্যে মদীনায় একটি প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছিলেন৷
বিশ্বনবী (সাঃ) সবার মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে শিক্ষিত বা অক্ষর-জ্ঞান সম্পন্ন সবাইকে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন৷ তিনি জ্ঞান অর্জনকে ফরজ বা অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব বলেও ঘোষণা করেন৷ গবেষকদের মতে রাসূল (সাঃ)'র রাষ্ট্র পরিচালনার রীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল নিখুঁত এবং সুসমন্বিত৷ একদল সচিব বা লেখক রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশ্বনবী (সাঃ)-কে সহায়তা করতেন৷ এঁদের মধ্যে চারজন সম্মানিত সাহাবী পবিত্র কোরানের বাণী লিপিবদ্ধ করতেন৷ এছাড়াও দুজন লেখক জনগণের মধ্যে প্রতিদিন যা ঘটতো তা লিখিত প্রতিবেদন হিসেবে রাসূল (সাঃ)'র কাছে পেশ করতেন৷ অন্য দুজন লেখক বিভিন্ন গোত্র সম্পর্কিত বিষয় নথিবদ্ধ করতেন৷ বিশ্বনবী (সাঃ) বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়েও দুজন লেখক নিয়োগ করেছিলেন৷ হযরত জায়েদ বিন সাবেত (রাঃ) সেযুগের রাষ্ট্রপতি বা নেতৃবৃন্দের কাছে রাসূলের পক্ষ হয়ে চিঠি লিখতেন৷ প্রাত্যহিক বিষয়গুলো লিপিবদ্ধ থাকায় রাষ্ট্রের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হতো এবং রাষ্ট্রে শৃংখলাও বজায় ছিল৷
বিশ্বনবী (সাঃ)'র প্রবর্তিত রাষ্ট্রের প্রথম দিকে এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বেশ সাদামাটা ছিল৷ পরবর্তিকালে এসব প্রতিষ্ঠান বিস্তৃত ও পরিপূর্ণ রূপ নেয়৷ রাসূল(সাঃ) শ্রম বিভাজন ও বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কারের লক্ষ্যে যোগ্য লোক বা প্রতিনিধি নিয়োগ করতেন এবং তাদেরকে মদীনার আশপাশে পাঠাতেন৷ এসব মিশনে প্রত্যেকের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট ছিল এবং তিনি দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে তাদের কাজের রিপোর্ট নিতেন৷ এমনকি বিশ্বনবী (সাঃ) তাঁর প্রতিনিধিদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের জন্যে একদল লোক নিয়োগ করেছিলেন যারা ঐ প্রতিনিধিদের যোগ্যতা বা দূর্বলতা সম্পর্কে রিপোর্ট দিতেন৷ এসব ব্যবস্থা থেকে বোঝা যায় আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রপ্রধান বিশ্বনবী (সাঃ) রাষ্ট্রীয় তদারকির নিখুঁত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন৷
মহানবী (সাঃ) তাঁর ইসলামী রাষ্ট্রে বিচার বিভাগও গড়ে তুলেছিলেন৷ এই বিচার ব্যবস্থা থেকেই পরবর্তিকালে ইসলামী বিচার ব্যবস্থার সংস্কৃতি বা নীতিমালা বিকশিত হয়েছে৷ ইসলামের আবির্ভাবের আগে শুধু দাবী পেশ ও যুদ্ধ বা বলপ্রয়োগ অথবা গোত্রপ্রধানের পক্ষপাতমূলক নির্দেশই ছিল আইন বা অধিকার সংক্রান্ত বিরোধ মীমাংশার পদ্ধতি৷ আর গোত্র-প্রধানও সাধারণতঃ ধনী বা শক্তিশালী লোকদের পক্ষে রায় দিতেন৷ কিন্তু বিশ্বনবী (সাঃ)'র প্রবর্তিত বিচার- ব্যবস্থায় এসব অন্যায় প্রথা নিষিদ্ধ করা হয় এবং আইনের দৃষ্টিতে সবাইকে সমান বলে ঘোষণা করা হয়৷ জাহেলী যুগে কোনো গোত্রের এক ব্যক্তি কোনো অপরাধ করলে কখনও কখনও পুরো গোত্রকে সে জন্যে দোষী সাব্যস্ত করা হত৷ কিন্তু ইসলামের নবী (সাঃ) জাহেলী যুগের ঐ নিয়ম বাতিল করে ঘোষণা করেন যে, কোনো ব্যক্তির অপরাধের জন্যে অন্য কেউই সাজা পাবে না৷
বিশ্বনবী (সাঃ) নিজেই ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি ছিলেন৷ জনস্বার্থ বিষয়ক কাজে রাসূল (সাঃ)কে বিচারক হিসেবে মেনে নিতে পবিত্র কোরআনেও নির্দেশ এসেছিল৷ যেমন, সূরা নিসার ৬৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তোমার পালনকর্তার কসম, যারা তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে (রাসূল-সঃ)কে বিচারক হিসেবে মেনে নিবে না ও তোমার মীমাংশার ব্যাপারে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হবে না তারা ঈমানদার হবে না ৷
এমনকি রাসূল (সাঃ)'র সাথে মদীনার বিভিন্ন গোত্রের যে চুক্তি হয়েছিল সেসবেও বিভিন্ন বিরোধ মীমাংশার ক্ষেত্রে বিশ্বনবী (সাঃ)কে বিচারক হিসেবে মেনে নেয়া হয়েছিল৷ যেমন, চুক্তির একটি ধারায় বলা হয়েছেঃ এই চুক্তির অনুসারীদের মধ্যে যদি এমন বিরোধ ও দ্বন্দ্ব দেখা দেয় যে তার ফলে অশান্তি বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে তাহলে ঐসব বিরোধ মীমাংশার জন্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কাছে রুজু করা হবে৷
অর্থাৎ জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় শৃঙখলা বা জননিরাপত্তায় কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টির আশঙ্কা থাকলে সেক্ষেত্রে রাসূলই ছিলেন বিচারক৷ অবশ্য পরবর্তিতে ইসলামী সমাজের পরিধি বিস্তৃত হতে থাকায় জনগণের বিবাদ মীমাংশার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্যে রাসূল (সাঃ) পর্যায়ক্রমে মদীনার বাইরে বিভিন্ন শহরে কয়েকজন যোগ্য ব্যক্তিকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ করেন৷
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশ্বনবী (সাঃ)'র প্রধান লক্ষ্য ছিল ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্য দূর করা৷ সমাজের স্থায়ীত্ব ও বিকাশের জন্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য৷ মহান আল্লাহ নিজে ন্যায় বিচারক এবং তাঁর ন্যায় বিচার বিশ্বের সব ক্ষেত্রেই বিস্তৃত৷ প্রত্যেক মানুষ তার সৎ কাজ ও মন্দ কাজের পরিমাণ অনুযায়ী প্রতিফল পাবে৷ রাসূলে খোদা (সাঃ) ন্যায়বিচারকে তাঁর রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রধান মূলনীতি হিসেবে গণ্য করতেন এবং নিজের আচরণ ও তৎপরতার মাধ্যমে ন্যায়বিচারকে সমাজদেহের মূল প্রাণশক্তি হিসেবে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন৷ রাসূলে খোদা (সাঃ)'র রাষ্ট্রে অভিজাত শ্রেণীর জন্যে কোনো বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা ছিল না৷ বিশ্বনবী (সাঃ)'র রাষ্ট্রে প্রত্যেক ব্যক্তি ছিল নিজের গন্তব্য ও পেশা নির্ধারণে স্বাধীন৷ বিবাহ-বন্ধন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অধিকারের ক্ষেত্রে সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে সমান সুযোগ ছিল৷ এমনকি দাস-দাসীরাও এক্ষেত্রে সমান অধিকার ভোগ করতো৷ এভাবে নিপীড়িত ও মজলুম মানুষের ধ্যানের ছবি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) প্রত্যাশিত ন্যায়বিচারের সুফলকে সবার ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন এবং মুক্তিকামী মানবতা তাঁর ন্যায় বিচারের ছোঁয়ায় সুন্দর ও সুখময় ভবিষ্যতের ব্যাপারে আশাবাদী হয়েছিল৷
মানবাতার মূক্তিদূত বিশ্বনবী (সাঃ) এমন সময় ইসলামের প্রগতিশীল বিধিবিধান আরব সমাজে তুলে ধরেন যখন বিশ্বের অন্যান্য স্থান ছিল অবিচার ও জঙ্গলী আইনের আঁধারে কলুষিত৷ ঐসব সমাজের আইন ও বিচার ছিল অত্যাচারীর পক্ষে ও নিপীড়িত বা মজলুমের বিপক্ষে৷ সমাজের অধিকাংশ সুযোগ সুবিধা ছিল শুধু অভিজাত ও উঁচু শ্রেণীর করায়ত্ত৷
কিন্তু অমানিষার আঁধারে আকীর্ণ এই পৃথিবীর এক অংশে মহানবী (সাঃ) এমন এক আলোকিত আদর্শ রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলেন যেখানে ছিল না অন্যায়-অবিচার ও অজ্ঞতার অন্ধকার, ছিল শুধুই আলোর বণ্যা এবং অধিকারহারা মানুষ পেয়েছিল কাঙ্ক্ষিত স্বাধিকার৷ পৃথিবীর নিকষ অন্ধকারে মদীনার ইসলামী রাষ্ট্র ছিল যেন এক অত্যুজ্জ্বল হীরকখন্ড, যার বিস্ময়কর দ্যুতি ও আলোকপ্রভা কয়েক শতকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল সুদুর ইন্দোনেশিয়া থেকে মরোক্কো এবং মক্কা থেকে ইউরোপের গ্রানাডা পর্যন্ত৷
ন্যায়বিচারের সর্বোত্তম আদর্শ বিশ্বনবী (সাঃ) ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে এতই সচেতন ছিলেন যে জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি মদীনার মসজিদে ঘোষণা করেছিলেন, আমার কাছে যদি কারো কোনো প্রাপ্য অধিকার কিংবা আমার বিরুদ্ধে কারো কোনো অভিযোগ থেকে থাকে তাহলে সে যেন তা পেশ করে৷ এক ব্যক্তি বলে উঠলো, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি একদিন অসচেতনতাবশতঃ আপনার হাতের লাঠি বা চাবুক দিয়ে আপনার বাহনে আঘাত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তা আমার গায়ে লেগেছিল এবং আমি এখন তার প্রতিশোধ নিতে চাই৷" রাসূল (সাঃ) তখনই ঐ লাঠি বা চাবুক আনার নির্দেশ দিলেন৷ এরপর তিনি তাঁর ওপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে সেই চাবুক বা লাঠি ঐ ব্যক্তির হাতে দিলেন৷ কিন্তু ঐ ব্যক্তি নত হয়ে রাসূলের পবিত্র দেহে চুমো খেয়ে বললো, আসলে আমি দেখতে চেয়েছিলাম ন্যায় বিচার কায়েমের জন্যে আপনি কতটা নিষ্ঠাবান৷

নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) তাঁর অসাধারণ গুণাবলী, চরিত্র-মাধুর্য ও সততার মাধ্যমে জনগণের ভালবাসার কেন্দ্রবিন্দু ও ইসলামী সমাজের মধ্যমণিতে পরিণত হয়েছিলেন৷ তাঁর যেসব মহতী গুণ ইতিহাসে চিরবিস্ময়ের আকর হয়ে আছে সেসবের মধ্যে অন্যতম হলো পরস্পর বিচিছন্ন ও মারমুখো জাতি বা গোত্রগুলোকে এক অভিন্ন সত্তায় সীসা-ঢালা-প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধ করা৷ বিশ্বনবী (সাঃ)'র অলৌকিক চরিত্র মাধূর্যের পরশ-পাথরের ছোঁয়ায় জাতিগত বৈষম্য, বংশীয় বা গোত্রীয় আধিপত্যকামিতা ও উগ্র জাতীয়তার সমস্যা বিলুপ্ত হয়ে মুসলিম সমাজের সর্বত্র ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের অটুট বন্ধন সৃষ্টি হয়েছিল৷ বিশ্বনবী (সাঃ) এটা জানতেন যে প্রত্যেক জাতির শক্তিমত্তা ও অগ্রগতি সে জাতির সংহতি ও ঐক্যের ওপর নির্ভরশীল৷
আরবের জাহেলী সমাজে কোনো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিধান না থাকায় তারা ছিল অনৈক্য ও বিভেদে অভ্যস্ত৷ এ অবস্থায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বিভিন্ন লিখিত চুক্তির মাধ্যমে মদীনার গোত্রগুলোর মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলেন৷ আকাবার অঙ্গীকার বা চুক্তি স্বাক্ষরের সময় তিনি বিভিন্ন গ্রুপ বা গোত্রের প্রতি বলেছিলেন, নিজেদের মধ্য থেকে ১২ ব্যক্তিকে প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করুন যাতে তারা নিজ নিজ গোত্রের মধ্যে সংঘটিত ঘটনার ব্যাপারে দায়িত্বশীল ও তত্ত্বাবধায়ক হতে পারেন৷ " রাসূল (সাঃ)'র এ পদক্ষেপ জনগণকে এত খুশী করেছিল যে যখন ঐ গোত্রগুলোর প্রতিনিধিদল আকাবার কাছে রাসূল (সাঃ) কে দেখতে ও তাঁর বক্তব্য শুনতে পায় তখন তারা বলেছিল যে, আল্লাহ হয়তো আপনার মাধ্যমেই আমাদের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ও পরস্পরের বিবাদের মীমাংসা করবেন৷"
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) মদীনার জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব , সহমর্মিতা ও প্রীতির বন্ধন ফুলের সুরভির মতো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন৷ তাঁর কথা ও বাণী সবখানেই মধুময় অমিয় সুধার মতো মানুষের অন্তরে স্থান করে নিত৷ তিনি বলেছেন, সংঘবদ্ধতার মধ্যেই রয়েছে রহমত এবং বিচিছন্নতার মধ্যে রয়েছে শাস্তি বা যাতনা৷ বিশ্বনবী (সাঃ) আরো বলেছেন, মুমিনদের পারস্পরিক সহমর্মিতা, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা এক অভিন্ন দেহের মতো৷ এ দেহের কোনো এক অংশে ব্যাথা জাগলে শরীরের অন্য অংশেও তা অনুভুত হয়৷
মহানবী (সাঃ) একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজ ও একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র-ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্যে সব মুসলমানকে মদিনায় হিজরত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন৷ তিনি প্রথমে এ জন্যে এক সভার আয়োজন করেন৷ ঐ সভায় তিনি তিনশ মুহাজির ও আনসারকে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করেন৷ তাঁরা এই মর্মে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন যে সত্যের পথে একে অপরকে সাহায্য করবেন এবং এমনকি মৃত্যুর পরও তাঁরা পরস্পরের সম্পদের উত্তরাধিকারী হবেন৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) তাঁদের প্রত্যেকের হাতকে অন্য এক মুসলিম ভাইয়ের হাতের ওপর ন্যস্ত করেন৷তবে হযরত আলী (আঃ) সঙ্গী বা যুগলবিহীন থেকে যান৷ এ অবস্থায় হযরত আলী (আঃ) বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, সবাইতো ভাই পেয়ে গেল, আমাকে তো কারো সাথে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করলেন না৷ রাসূল (সাঃ) বললেন, মহান আল্লাহর শপথ ! তুমি আমার ভাই, আমার স্থলাভিষিক্ত ও আমার পরামর্শদাতা৷ তোমার সাথে আমার সম্পর্ক হারুন ও মূসার সম্পর্কের মতো, তবে পার্থক্য হল আমার পরে কোনো নবী আসবেন না৷
নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) তাঁর দূরদৃষ্টির মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে ও ঘটনায় মুসলিম সমাজের মদ্যে বিভেদ ও অনৈক্যের বীজ বা অংকুরগুলো বিনষ্ট করে দিতেন৷ ওহদ যুদ্ধের সময় এক মুসলিম যুবক শত্রুদের সাথে লড়াই করার সময় কবিতা আবৃত্তি করে বলছিলেন, মাথা পেতে নাও এ আঘাত তরবারির এ আঘাত আরব যুবকের বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ঐ মুসলিম যুবককে বললেন, বল, আমি আনসার যুবকদের অন্যতম৷ এভাবে বিশ্ব মানবতার নবী (সাঃ) যুদ্ধের ময়দানেও গোত্রবাদ তথা জাতিভেদ বা জাতিপূজার ধারণা প্রতিহত করতেন এবং খোদাভীতি ও সৎকর্মকেই শ্রেষ্ঠত্ব বা গৌরবের মানদন্ড মনে করতেন৷
ইসলাম ধর্ম গোটা আরবে ছড়িয়ে পড়লে আবু আমের নামের এক ইহুদির গাত্রদাহ অসহনীয় হয়ে ওঠে৷ সে ইসলামের বিস্তারে বাধা সৃষ্টি এবং ইসলামী ঐক্যে ফাটল ধরানোর দূরাশা নিয়ে আওস ও খাজরাজ গোত্রের মোনাফেকদের সাথে আন্তরিক সহযোগিতা শুরু করে৷ সে এক চিঠিতে তার মোনাফেক বন্ধুদের কাছে লিখেছিল, কোবা গ্রামে মুসলমানদের মসজিদের পাশে আরেকটি মসজিদ নির্মাণ কর এবং নামাজের সময় এই নতুন মসজিদে সমবেত হও যাতে মুসলমানদের নৈতিক মনোবল হ্রাস পায়৷ এই মসজিদে ফরজ এবাদত-বন্দেগীর অজুহাতে ইসলামকে পরাজিত করার ব্যাপারে শলা-পরামর্শ করবে৷
বিশ্বনবী (সাঃ) তাবুক সফরের উদ্দেশ্যে রওনা হলে মোনাফেকদের প্রতিনিধিদল তাঁর কাছে এসে বললো, বৃষ্টিভেজা রাতে বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা ঘর থেকে কোবা মসজিদে পৌঁছতে সক্ষম নন৷ তাই মহল্লার ভেতরেই মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দিবেন কি? রাসূল (সাঃ) বেশ অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকালেন এবং কিছুই বললেন না৷ তারা আবারও এ বিষয়ে মহানবী(সাঃ)'র মত জানতে চাইলে তিনি সফর থেকে ফিরে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান৷ কিন্তু মোনাফেকরা রাসূল (সাঃ)'র অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে মসজিদের নামে ইসলাম বিরোধী তৎপরতার ঐ আস্তানা গড়ে তোলে৷ বিশ্বনবী (সাঃ) সফর থেকে ফিরে আসলে মোনাফেকরা তাঁর কাছে ধর্ণা দিয়ে বলে যে আল্লাহর রাসূল(সাঃ) যেন সেখানে কয়েক রাকাত নামাজ পড়ে তথাকথিত ঐ মসজিদ উদ্বোধন করেন৷ এ অবস্থায় আল্লাহ ওহী নাজিল করে ঐ আস্তানাকে মসজিদে জেরার বা ক্ষতিকারক মসজিদ নামে অভিহিত করে শত্রুদের ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দেন৷ সুরা তওবার ১০৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,
যারা মুসলমানদের ক্ষতি সাধন, সত্য প্রত্যাখ্যান, বিশ্বাসীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি এবং অতীতে আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে, তারাই নিজের গোপন ঘাঁটি হিসেবে এ মসজিদ নির্মাণ করেছে৷ অবশ্য তারা শপথ করে বলবে যে আমরা সৎ উদ্দেশ্য নিয়েই এ মসজিদ নির্মাণ করেছি, কিন্তু আল্লাহ স্বাক্ষ্য দিচেছন যে, ওরা মিথ্যাবাদী৷
এ আয়াত নাজিল হবার পর নূরনবী (সাঃ) তথাকথিত ঐ মসজিদ বা মোনাফেকদের আস্তানাটি ধবংস করে দেন৷ জেরার মসজিদ ধবংসের ফলে মুসলিম সমাজে রাজনৈতিক অনৈক্য সৃষ্টির ষড়যন্ত্র অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছিল৷ এ ছাড়াও মুসলমানদের ঐক্য ধরে রাখার জন্যে বিশ্বনবী (সাঃ) বিভিন্ন ধরনের শির্ক ও মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে চিন্তাগত বা ধর্মীয় সংলাপ ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন৷ তিনি একত্ববাদ বা এক আল্লাহর এবাদতকে হযরত ইব্রাহীম (আঃ)'র ধর্ম বা দ্বীনে হানিফ হিসেবে অভিহিত করেন এবং তৌহিদ বা একত্ববাদের চেতনাকে সমাজে বিস্তৃত করেন৷ একদিকে নূরনবী (সাঃ)'র প্রচেষ্টা ও অন্যদিকে পবিত্র কোরআনের সুন্দর বাণী মানুষের মধ্যে ঐক্যের চেতনা জোরদার করেছে৷ বিশ্বনবী (সাঃ)'র আকর্ষণীয় আচার ব্যবহার মুসলমানদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি করতো এবং অমুসলমানরাও তাতে প্রভাবিত হত৷
একবার যাইদ নামের এক ইহুদি পন্ডিত রাসূল (সাঃ)'র কাছ থেকে কিছু পাওনা আদায় করার জন্যে তাঁর জামা ধরে অত্যন্ত রুক্ষভাবে বললো, তোমরা আবদুল মোত্তালেবের সন্তানরা ঋণ শোধ করতে দেরী করে থাক৷ বিশ্বনবী (সাঃ)'র একজন সাহাবী অত্যন্ত উচ্চ স্বরে ঐ ইহুদি পন্ডিতের এ আচরণের প্রতিবাদ জানায়৷ কিন্তু রাসূল(সাঃ) মুচকি হেসে বললেন, আমার আর তার অন্য কোনো কথা বা আচরণ৷ আমাকে বল যে, আমি যেন সুবিবেচক হই, আর তাকে বল, কোমল আচরণের মাধ্যমে পাওনা দাবী কর৷ এরপর তিনি ইহুদি পন্ডিতকে বললেন, চুক্তি অনুযায়ী এখনও তোমার পাওনা ফিরিয়ে দেয়ার জন্যে তিন দিন সময় বাকী আছে৷ এরপর রাসূল (সাঃ) তাঁর সাহাবীকে বললেন, তার পাওনা ফিরিয়ে দাও, যেহেতু সে তার পাওনা আদায়ের ব্যাপারে চিন্তিত ছিল সে জন্যে পাওনার চেয়েও তাকে কিছু বেশী দিয়ে দাও৷ মহানবী (সাঃ)'র এ রকম উন্নত ও পরিমার্জিত আচরণের ফলে ঐ ইহুদি পন্ডিত মুসলমান হয়ে যান৷
ঐক্য সৃষ্টি জগতের জন্যে অপরিহার্য ও অমূল্য এক সম্পদ৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) পবিত্র কোরআনের বাণীর আলোকে মুসলমানদেরকে আল্লাহর দাসত্বের মাধ্যমে খোদায়ী রশি দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরার দাওয়াত দিতেন৷ আর মুসলমানরাও বিশ্বনবী (সাঃ)'র উপদেশ অনুযায়ী কাজ করে কয়েক শতকের মধ্যেই জ্ঞান, সভ্যতা ও অগ্রগতির পতাকাবাহী হয়েছিল৷ আসলে নূরনবী (সাঃ)'র নিজেই যুগে যুগে মুসলমানদের জন্যে ঐক্যের মাধ্যম হয়ে আছেন৷ বর্তমানেও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সমস্ত মুসলমানের জন্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও ঐক্যের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে বিরাজ করছেন৷ মহান আল্লাহ নূরনবী ও তাঁর পবিত্র বংশধারার ওপর অশেষ দরুদ ও শান্তি বর্ষিত করুন৷

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ছিলেন একাধারে নতুন জাতি, রাষ্ট্র ও নতুন সভ্যতার রূপকার৷ সম্পূর্ন প্রতিকূল পরিবেশে বা স্রোতের সম্পূর্ণ বিপরীতে তৎকালীন আরব সমাজের জাহেলী প্রথা ও রীতি এবং বৈষম্যমূলক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোগুলোকে ভেঙ্গে-চুরে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কল্যাণকর সংস্কার সাধন করে আদর্শ সভ্যতার বুনিয়াদ গড়ে তোলা ছিল এক অবিশ্বাস্য সাফল্য৷ সময়োপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ এবং বিচক্ষণ ব্যবস্থাপনা বা নেতৃত্বের মাধ্যমে নেতিবাচক পরিবেশকে ইতিবাচক ও উন্নত পরিবেশে রূপান্তরিত করার অনন্য সাফল্য ছিল আদর্শ মহাপুরুষ হিসেবে বিশ্বনবী (সাঃ)'র শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম দিক৷
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বিভিন্ন গোত্রের সাথে লিখিত চুক্তির ভিত্তিতে মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্র গড়ে তোলার পর বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন৷ এসব সমস্যার কোনো কোনোটি ছিল রাজনৈতিক, আবার কোনো কোনো সমস্যা ছিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক৷ রাসূল (সাঃ)'র পরামর্শে ও তাঁর উৎসাহ পেয়েই মক্কার মুসলমানরা মদীনায় হিজরত করেছিলেন৷ কিন্তু তারা মদিনায় জীবন-উপকরণ ও জীবিকার সমস্যায় পড়েন৷ কারণ, তারা ঘর-বাড়ী ছেড়ে এসেছিলেন এবং এর ফলে নতুন জায়গায় চাকরী বা আয় উপার্জনের সুযোগ তাদের ছিল না৷ এ অবস্থায় মহানবী (সাঃ)'র পরামর্শে মদীনার আনসারদের প্রত্যেকেই একটি করে মুহাজির পরিবারের আর্থিক চাহিদা মেটানোর দায়িত্ব গ্রহণ করেন৷ এরপর মুহাজিররাও বিভিন্ন কাজ ও উৎপাদনমূলক তৎপরতা শুরু করেন৷ কিন্তু বেশীরভাগ সম্পদ ও অর্থ কতিপয় বিশেষ ব্যক্তির মালিকানাধীন হওয়ায় অন্যরা যতই কাজ করুক না কেন, তারা কখনও অর্থ-সম্পদ সঞ্চয় করতে পারছিলেন না ৷
এ অবস্থায় ইসলাম-পূর্ব যুগ থেকে প্রচলিত অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা বা বৈষম্য অব্যাহত থাকায় আয়-উপার্জনের উৎস বা পুঁজি তখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হচিছল না এবং উৎপাদনের ব্যাপক ক্ষেত্র তখনও অব্যবহৃত থেকে যাচিছল৷ আরবের জাহেলী সমাজে দূর্বল ও বঞ্চিত শ্রেণীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বলতে কিছুই ছিল না৷ তারা সর্দার বা জমিদার শ্রেণীর মানুষের জন্যে বেগার খাটতো বা বিনা মজুরীতে শুধু ক্ষুধা মেটানোর বিনিময়ে কাজ করতো৷ অনেক শ্রমিক তাদের শ্রমের ফসল গোত্রের সর্দারের কাছে দিয়ে দিতে বাধ্য ছিল৷ অর্থ উপার্জনের কোনো পরিকল্পিত সামাজিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় মানুষ বিভিন্ন পন্থায় বা একেক সময় একেক পন্থায় পরস্পরের অর্থ-সম্পদ দখল করতো৷
বিশ্বনবী (সাঃ) এইসব কঠিন অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্যে প্রথমে জনগণের কাছে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন৷ তিনি ইসলামের এ মূলনীতি তুলে ধরেন যে প্রত্যেকেই ঠিক ততটুকু অর্থ-সম্পদের মালিক যা সে নিজের প্রচেষ্টায় অর্জন করেছে৷ তবে এক্ষত্রে শর্ত হলো, কাজটি হতে হবে কল্যাণকর বা লাভজনক এবং দ্বিতীয় শর্ত হলো কর্মপন্থা হতে হবে বৈধ৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) মানুষকে কাজের জন্যে উৎসাহ দিতেন এবং তাদের কাজের পরিবেশ বা ক্ষেত্রও গড়ে দিতেন৷ যেমন, তিনি অনেক সময় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পাওয়া গনীমতের সম্পদের একটি অংশ দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতেন৷ তিনি বেকার থাকার তীব্র বিরোধীতা করতেন৷ আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল (সাঃ) এ প্রসঙ্গে বলেছেন, যারা নিজ জীবনের বোঝা মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয় তারা আল্লাহর রহমত পাবে না এবং যারা নিজ পরিবারের সদস্যদের ব্যায়ভার নির্বাহ না করে তাদের জীবনকে ধবংস করে তারা অভিশপ্ত৷
বেলচা ও রশি দিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র সাহাবী সা'দ আনসারী (রাঃ)'র হাত খুবই অমসৃন বা খসখসে হয়ে গিয়েছিল৷ একদিন রাসূল (সাঃ) তা জানতে পেরে সা'দের হাতে চুমু খেয়ে বলেছিলেন, জাহান্নামের আগুন এই হাতকে পোড়াতে পারবে না৷
বিশ্বনবী (সাঃ) নিজেও রাষ্ট্রীয় তৎপরতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক তৎপরতায়ও লিপ্ত থাকতেন৷ তিনি নিজে কাজ করে একটি বাগান গড়ে তুলেছিলেন৷ মদীনায় ঘর ও মসজিদ নির্মাণের সময় অন্য মুসলমানদের মতো তিনি নিজেও বড় বড় পাথর বহন করতেন৷ এমনকি তিনি বন্যার ফলে নস্ট হয়ে যাওয়া রাস্তাগুলো পাথর বিছিয়ে মেরামত করতেন৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বাগান করা ও কৃষিকাজকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন৷ তিনি কৃষকদের অধিকার ক্ষুন্ন করার ব্যাপারে সতর্কবানী রেখে গেছেন৷ একবার তিনি হযরত আলী (আঃ)কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছেন, হে আলী! সাবধান! কখনও যেন কৃষকদের ওপর জুলুম করা না হয়৷ (বাজনা)
একদিন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র একদল সাহাবী তাঁর পাশে বসে আলোচনায় মশগুল ছিলেন৷ মসজিদের ভেতরে এ আলোচনা চলছিল৷ মসজিদের বাইরে সূঠামদেহী এক যুবক সকাল থেকে কাজ করে যাচিছল৷ তাঁর কাজ ছিল খুবই পরিশ্রমের৷ আল্লাহর রাসূলের পবিত্র দৃষ্টি ঐ যুবকের ওপর নিবদ্ধ হলো৷ সেই মুহূর্তে মহানবীর পাশে বসা একজন সাহাবী মহানবী(সাঃ)'র এ বিশেষ দৃষ্টি লক্ষ্য করে বললেনঃ
এ যুবক তার কাজে এতো ব্যস্ত যে সে তার চারপাশের অবস্থা সম্পর্কেও অচেতন৷ সে তার শক্তিকে আল্লাহর পথে ব্যয় করছে না৷ এটা কি খুব দুঃখজনক বিষয় নয়? সে যদি আল্লাহর জন্যে কাজ করতো, তাহলে সে প্রশংসা পাবার যোগ্য হতো৷ বিশ্বনবী তাঁর একজন সাহাবীর কাছ থেকে একথা শুনে কিছুক্ষণ নীরব রইলেন৷ এরপর নীরবতা ভেঙ্গে তিনি বললেন,  এ রকম কথা বলো না৷ কয়েকটি কারণে এ যুবকের কাজ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে৷ সে যদি জীবিকা অর্জনের জন্যে কাজ করে থাকে, তাহলে জেনে রাখ, সে আল্লাহর পথেই দৃঢ়ভাবে কাজ করছে৷ যদি সে তার বাবা-মা বা নিজ সন্তানের জীবিকা অর্জনের জন্যে কাজ করে থাকে, তাহলেও সে আল্লাহর পথেই কাজ করছে৷ কিন্তু যদি সে শুধু নিজের সম্পদ বাড়ানোর জন্যে অথবা শুধু গরীবদের কাছে অহংকার প্রদর্শনের জন্যে কাজ করে থাকে, তাহলে জেনে রাখ যে, সে শয়তানের পথ ধরেছে এবং সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে৷ বিশ্বনবী (সাঃ)'র প্রজ্ঞাপূর্ণ এ কথাগুলো শুনে যুবকটি সম্পর্কে যে সাহাবী অবিবেচনাসূলভ ও তড়িঘড়ি মন্তব্য করেছিলেন তিনি অনুতপ্ত হলেন৷ এরপর পরই আল্লাহর রাসূল (সাঃ) জামাতে নামাজ আদায় করার জন্যে প্রস্তুত হলেন৷ সাহাবীগণের কেউ কেউ সেই কর্মঠ যুবকটিকে তার কাজ শেষ করতে সাহায্য করার জন্যে এগিয়ে গেলেন, যাতে দ্রুত কাজ সেরে সেই যুবকটিও নামাজের জামাতে শামিল হতে পারে৷
বিশ্বনবী (সাঃ) সমাজে সম্পদের সুষম বন্টণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন এবং এ জন্যে উপযুক্ত পদক্ষেপও নিয়েছিলেন৷ আরবের জাহেলী যুগে এক গোত্রের লোকেরা অন্য গোত্রের কোনো লোককে অপহরণ করে তাকে দাস বানিয়ে রাখতো৷ সেসময় গরীব লোকেরা ঋণের সুদ পরিশোধ করতে না পেরে পাওনাদারের কাছে নিজেকে দাস হিসেবে সমর্পন করতো৷ আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল (সাঃ) এই প্রথাকে অন্যায্য বলে ঘোষণা দেন এবং বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করা নিষিদ্ধ করেন৷ অর্থনৈতিক চুক্তি বা লেনদেনগুলো উভয় পক্ষের স্বাধীন ইচেছ ও সন্তুষ্টির ভিত্তিতে হতে হবে বলে তিনি ঘোষণা করেন৷ এ ছাড়াও বিশ্বনবী (সাঃ) অর্থনৈতিক শোষনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার সুদ প্রথাও রহিত করেন৷ সুদ প্রথার ফলে আরবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্র বিভিন্ন সংকটে জর্জরিত হয়ে পড়েছিল৷ শ্রোতা-ভাইবোনেরা আগামী অনুষ্ঠানে আমরা বিশ্বনবী (সাঃ)'র অন্যান্য অর্থনৈতিক পদক্ষেপ বা সংস্কার সম্পর্কে আলোচনা করবো৷ আশা করি তখনও আমাদের সঙ্গ দিতে ভুলবেন না৷

অর্থনৈতিক শোষনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার সুদ প্রথা রহিত করা ছিল বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা (সাঃ)'র অন্যতম স্মরণীয় সাফল্য ৷ জাহেলী যুগের আরব সমাজ ছিল সুদ প্রথার অভিশাপে জর্জরিত ৷ সুদ প্রথার ফলে ঋণগ্রহীতাকে ঋণ পরিশোধের সময় অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হয়৷ ফলে ঋণদাতা বা পুঁজিপতিরা আরো সম্পদশালী হতো এবং দরিদ্র ব্যক্তিরা আরো দরিদ্র হতো ৷ এ অবস্থার অবসানের জন্যে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে সুদ নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন ৷ সূরা বাকারার ২৭৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, হে বিশ্বাসীরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং যদি তোমরা বিশ্বাসী হও, তবে পাওনা থেকে সুদের অংশ বর্জন কর৷
এ আয়াত নাজিল হবার পর রাসূল (সাঃ) জাহেলী যুগের সমস্ত সুদের দাবী পরিহার করতে হবে বলে জানিয়ে দেন৷ অন্যদিকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সুদের পরিবর্তে কারজুল হাসানা বা সুদবিহীন ঋণ প্রথা চালু করেন৷ পবিত্র কোরআনের বেশ কয়েকটি আয়াতে এই প্রথার প্রশংসা করা হয়েছে৷ মুষ্টিমেয় লোকের হাতে সম্পদ যাতে পুঞ্জিভূত না হয় সেজন্যে বিশ্বনবী (সাঃ) উদ্যোগ নিয়েছিলেন৷ পবিত্র কোরআন দান ও সাদাকার জন্যে ব্যাপক সাওয়াব বা প্রতিদানের কথা ঘোষণা করেছে৷ জাহেলী যুগে আরব দেশের অধিকাংশ ধনী বা অভিজাত শ্রেণীর মানুষ দান খয়রাত বা অর্থ সাহায্য দেয়াকে ক্ষতি বলে মনে করতো৷ অধিকাংশ ধনী ব্যক্তি নিঃস্ব বা গরীবদেরকে চিরকালই গরীব বা নিঃস্ব দেখতে চাইতো৷ তারা মনে করতো অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়ে পড়লে গরীবরা আর ধনীদের সামনে মাথা নত করবে না৷ একবার একদল ধনী রাসূল (সাঃ)'র কাছে এসে বললোঃ আমরা আপনার ওপর বিশ্বাস বা ঈমান আনতে প্রস্তুত রয়েছি, তবে এ জন্যে দুটি শর্ত রয়েছে৷ প্রথমতঃ নামাজের সময় আমাদের জন্যে রুকু মাফ করা হোক৷ কারণ, নত হওয়াটা আমাদের জন্যে এক ধরনের অবমাননার শামিল৷ দ্বিতীয় শর্ত হলো, আমরা জাকাত দিতে পারবো না৷ কারণ, জাকাত দেয়ার ফলে প্রজারা শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং এর ফলে তারা আর আমাদের আনুগত্য করবে না৷
ইসলাম পূর্ব-যুগে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বন্টণের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক প্রথার প্রচলন ছিল৷ মৃত ব্যক্তির সম্পদ তার বড় পুত্র বা মৃত ব্যক্তির ভাইয়ের হস্তগত হতো৷ বিশ্বনবী (সাঃ) এই বৈষম্যমূলক প্রথা রহিত করেন৷ তিনি মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ও বৈধ মাত্রায় বন্টণের নিয়ম চালু করেন৷ এভাবে মানবতার অর্থনৈতিক মুক্তিসহ সব ধরনের মুক্তির সর্বোত্তম দিশারী বিশ্বনবী (সাঃ) গুটিকয়েক লোকের হাতে সম্পদের পাহাড় গড়ে ওঠার প্রবণতা প্রতিরোধের আরো এক কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন৷ রাসূলে খোদা (সাঃ) বিভিন্ন ধরনের কল্যাণকর কর প্রথা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে ন্যায্য মাত্রায় বন্টণের নিয়ম চালু করে মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে সক্ষম হয়েছিলেন৷ খোমস, জিজিয়া, খারাজ ও যাকাত ছিল রাষ্ট্রীয় সম্পদের অন্যতম প্রধান উৎস৷ রাসূলে খোদা (সাঃ) এসব কল্যাণকর সম্পদের তত্ত্বাবধান করতেন এবং এসব সম্পদ দরিদ্র লোকদের মধ্যে বন্টণ করতেন৷
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র যুগে মদীনার বাজারের অবস্থা কেমন ছিল? তাহলে শোনা যাক সে সময়কার মদীনার কোনো এক বাজারের ঘটনা৷ জমজমাট ঐ বাজারে হঠাৎ দুই ব্যক্তির তর্কের আওয়াজ যেন বাজারের হৈচৈকে ছাপিয়ে উঠলো৷ পণ্যের মূল্য নিয়ে দর কষাকষি করতে গিয়ে ক্রেতা বিক্রেতাকে ছাড় দেয়ার আহবান জানাচিছল৷ অন্যদিকে বিক্রেতাও ছাড় দিতে রাজী হচিছল না৷ এ অবস্থায় বিশ্বনবী (সাঃ) ঐ বাজারে আসলে সেই দুই ব্যক্তি নীরব হয়ে যায়৷ তাদের একজন রাসূল (সাঃ)কে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ)! এই বিক্রেতাকে ন্যায়কামী হতে বলুন এবং পণ্যের বেশী দাম নিতে নিষেধ করুন৷ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, তোমরা নিজ নিজ সম্পদের মালিক৷ আমি আশা করি শেষ বিচার বা কিয়ামতের দিনে আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবো যে সেদিন আমি যেন তোমাদের কারো ওপর অবিচারকারী হিসেবে সাব্যস্ত না হই৷ এর পর ন্যায় বিচারের প্রতিচছবি বিশ্বনবী (সাঃ) আকাশের দিকে হাত তুলে এ প্রার্থণা করলেন যে, (ইকো)
হে আল্লাহ তার ওপর রহমত বা অনুগ্রহ নাজিল করুন যে কেনা-বেচার সময় দয়াশীল হয় এবং দান ও বিচার-বিবেচনার ক্ষেত্রে কঠোর না হয়৷
বিশ্বনবী (সাঃ)'র এ আলোকোজ্জ্বল বাণী ঐ দুই ব্যক্তির ওপর গভীর প্রভাব ফেললো৷ তারা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে ও রাসূল (সাঃ)'র দোয়ায় বর্ণিত রহমতের অধিকারী হবার জন্যে একে অপরের সাথে আপোস করলো৷
বিশ্বনবী (সাঃ)'র কাছে যখন সুরা তালাকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় আয়াত নাজিল হয়, তখন একদল মুসলমান কাজ কর্ম ছেড়ে দিয়ে সারাক্ষণ ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল হয়ে পড়ে৷ এ দুই আয়াতের অংশ বিশেষে বলা হয়েছিল, যে কেউ আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার পথ করে দিবেন, তাকে এমন উৎস থেকে জীবিকা দান করবেন যা তার ধারণাতীত ৷
যখন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) দেখলেন, একদল লোক কাজ কর্ম ছেড়ে দিয়েছে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে জীবিকা পাবার আশায় কেবল ইবাদতে মশগুল হয়েছে, তখন তিনি মর্মাহত হলেন৷ বিশ্বনবী (সাঃ) বললেন, যারাই কাজ কর্ম ছেড়ে দেয়ার পথ গ্রহণ করেছে, তাদের ইবাদত গ্রহণযোগ্য হবে না৷ কাজ করা এবং উপার্জন করা তোমাদের জন্যে জরুরী ৷ কাজ ও চেষ্টার খোদায়ী নেয়ামতের মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর সাহায্য চাও৷"
সবশেষে অর্থনীতি বা জীবন ও জীবিকা সম্পর্কিত বিষয়ে বিশ্বনবী (সাঃ)'র কয়েকটি বাণী শুনিয়ে আজকের এ আলোচনা শেষ করবো৷ তিনি বলেছেনঃ
**সবচেয়ে অনুমোদনযোগ্য খাবার হলো তা যা কোনো ব্যক্তি নিজের প্রচেষ্টা বা কাজের মাধ্যমে অর্জন করে খেয়ে থাকে৷
**জিহাদ বলতে মহান আল্লাহর পথে সবসময় শুধু তরবারি ব্যবহার করাকেই বোঝায় না৷ জিহাদ বলতে জীবন নির্বাহের, বাবা-মা ও সন্তানের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নেয়াকেও বোঝায়৷"
** যে দুনিয়ার ব্যাপারে উদাসীন, সে পরকালের ব্যাপারে আরো বেশী উদাসীন হয়৷ সেরা বা শ্রেষ্ঠ মুসলমান তারাই যারা ইহকাল ও পরকাল উভয় জগত থেকেই উপকৃত হয়৷ "
** জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রে সুবিবেচক বা সংযমী তথা মধ্যপন্থী হও৷

মানবতার মুক্তির দূত, অন্ধকারের আলোকবর্তিকা, মজলুম মানবতার ধ্যানের ছবি ও বিশ্বজগতের জন্যে মহান আল্লাহর সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র জীবনধারা ছিল আলোকোজ্জ্বলতম জীবনধারা, যাতে রয়েছে জীবনের সবক্ষেত্রের পথনির্দেশনা ও সব সমস্যার কাঙ্ক্ষিত সমাধান ৷ তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় নীতিও ছিল পুরোপুরি ভারসাম্যপূর্ণ ৷ পবিত্র সেই জীবনের পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা ও ন্যায়বিচারের মহত্তম আদর্শের দৃষ্টান্ত ৷ অথচ আজকের বিশ্বে এই দিকগুলোর বড়ই অভাব৷ বলতে গেলে সমাজ ও রাষ্ট্রনীতি থেকে আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতা প্রায় পুরোপুরি নির্বাসিত হয়েছে ৷
সম্প্রতি ইরানের পবিত্র কোম শহরে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র রাজনৈতিক জীবন ও শাসন পদ্ধতি শীর্ষক এক সেমিনারে রাষ্ট্রনীতি বা রাজনীতিতে আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে৷ ইসলামী বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত একটি গবেষণা সংস্থা এ সেমিনারের আয়োজন করে৷ এ সেমিনারে বিশিষ্ট গবেষক ডক্টর ইয়াজদানী মোকাদ্দাম রাসূলে পাক (সাঃ)'র প্রবর্তিত রাষ্ট্র বা সরকারে নেতৃত্বের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, মানবীয় ধর্ম মানুষের প্রকৃতিগত বাস্তবতাগুলোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ৷ পবিত্র কোরআনের প্রখ্যাত তাফসীরকারক মরহুম আল্লামা তাবাতাবাইর মতে মানবীয় ধর্মের বা মানুষের জন্যে যে ধর্ম তার তিনটি মানদন্ড রয়েছে৷
প্রথমতঃ খোদায়ী বিধান বা বাস্তবতাগুলো সার্বজনীন হয়ে থাকে, এসব বিধান একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী বা গ্রুপের জন্যে সিমীত নয়৷
দ্বিতীয়তঃ খোদায়ী পথনির্দেশনা বা হেদায়াতের পথ যৌক্তিক ও সবার জন্যে সহজলভ্য হয়ে থাকে৷ অন্য কথায় ধর্ম অসম্ভব বা অযৌক্তিক কিছু হতে পারে না৷ কারণ যুক্তিহীনতা বা বিবেকহীনতা মানুষের অধঃপতনের সমতুল্য৷
তৃতীয়তঃ মানবীয় ধর্মের শিক্ষাগুলোকে সমাজে বাস্তবায়নযোগ্য হতে হবে৷ আর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র ধর্ম ও জীবন পদ্ধতিতে এ তিন বৈশিষ্ট্য বা মানদন্ড ছিল স্পষ্ট৷
মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক, পরিচালক ও নেতা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র সামাজিক এবং রাজনৈতিক অবদান প্রসঙ্গে ডক্টর ইয়াজদানী মোকাদ্দাম আরো বলেছেন, রাসূলে পাক (সাঃ) কাউকে বঞ্চিত করা ছাড়াই সাধারণ ও অসাধারণ শ্রেণী নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষকে পরস্পরের সাথে ঘনিষ্ঠ করেছেন৷ তিনি যুক্তি বা বিবেকের মর্যাদাও রক্ষা করেছেন৷ রাসূলে পাক (সাঃ) বলেছেন, আমরা মানুষের বিবেকের কার্যক্ষমতা অনুযায়ী মানুষের সাথে আচরণ করি৷ আর এটাই পরিপূর্ণতা বয়ে আনে৷
নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) জটিল ও অবোধগম্য বিষয়ের অবতারণা করতেন না৷ তিনি মানুষের প্রচছন্ন বা সুপ্ত বিবেক ও প্রতিভাগুলোকে খোদায়ী বিধানের কল্যাণে বিকশিত করতেন৷ স্থান ও যুগের চাহিদা এবং পারস্পরিক পরামর্শের নীতি ছিল আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল (সাঃ)'র কৌশলের মূল দিক৷
কোমের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ডক্টর আলী বেহরুজী বলেছেন, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হলো তাঁর এই জীবন ছিল কল্যাণকামীতা ও মহৎগুণাবলী-কেন্দ্রীক৷ তাঁর শাসন পদ্ধতির লক্ষ্য ছিল মানুষের উন্নতি ও মানবীয় গুণাবলীর বিকাশ সাধন৷ রাসূলে পাক (সাঃ)'র সমস্ত রাজনৈতিক আচরণ এ লক্ষ্যেই কেন্দ্রীভূত ছিল৷ তাঁর মানবীয় গুণাবলীর মধ্যে দয়া, উদারতা, আন্তরিকতা, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা, বিভিন্ন বিষয় স্বচছকরণ এবং সত্য ও ন্যায়বিচারকে সমুন্নত রাখার মত প্রভৃতি গুণ ছিল বিশ্বনন্দিত৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র সমস্ত রাজনৈতিক চিঠিতে শান্তিকামীতা, নৈতিক শিক্ষা ও ন্যায়বিচারের শিক্ষা এবং ইসলামী দয়াশীলতার ছাপ ছিল অত্যন্ত জোরালো৷
এবারে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র দয়া সম্পর্কিত একটি ঘটনা শোনা যাক ৷ আনাস বিন মালিক (রাঃ) বলেছেন, একদিন নবী করিম (সাঃ)'র সাথে একটি পথ ধরে কোথাও যাচিছলাম৷ রাসূল (সাঃ)'র কাঁধে ছিলএকটি আলখাল্লা৷ আলখাল্লার প্রান্ত ছিল খসখসে ও মোটা৷ এ সময় এক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ)'র কাছে এসে ঐ কাপড় ধরে অত্যন্ত জোরে টান দেয়৷ এর ফলে ঐ আলখাল্লার প্রান্তভাগ রাসূল (সাঃ)'র কাধে টানের চিহ্ন বসিয়ে দেয়৷ এরপর লোকটি অত্যন্ত অভদ্রভাবে বললো, মোহাম্মাদ, আল্লাহ ও তোমার কাছে যে সম্পদ আছে তা থেকে আমাকে কিছু দেয়ার নির্দেশ দাও৷ দয়ার নবী (সাঃ) এই অভদ্র আচরণকে উপেক্ষা করে অত্যন্ত মমতাভরা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন৷ এরপর তাকে চুমো খেয়ে বললেন, সে যা চাচেছ তাকে তা দিয়ে দাও৷
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র রাজনৈতিক জীবন ও শাসন পদ্ধতি শীর্ষক ঐ সেমিনারে ডক্টর মোঃ সুতুদেহ রাসূলুল্লাহর (সাঃ) রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতি সম্পর্কে বলেছেন, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) নবুওত লাভের পর বিশ্ববাসীর কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্যে প্রথমে তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন ও চারপাশের জনগণের কাছে এবং এরপর মক্কা নগরীর সবার কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন৷ পরবর্তকালে মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তিনি তাওহীদ বা একত্ববাদের বাণী বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে দেয়ার পদক্ষেপ নেন৷ বিশ্বনবী (সাঃ) মুসলমানদের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন ও তাদের কল্যাণের জন্যে প্রথমে ইসলামী রাষ্ট্রের ভেতরে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং মদীনার বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে ঐক্যের বন্ধর গড়ে তোলেন৷ রাসূলে পাক (সাঃ) মদীনা সনদে সরকারের সাথে জনগণের সম্পর্ক ও জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণ করেন এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা সংহত করেন৷ এরপর তিনি মদীনাকে অভ্যন্তরীণ ও বাইরের হুমকী থেকে নিরাপদ রাখার ওপর জোর দেন৷ মদীনার নতুন সরকার-কাঠামোয় রাসূল (সাঃ)'র চিন্তাগত, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপগুলো মুসলিম উম্মাহর শক্তি ও ঐক্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে তাঁর প্রচেষ্টার নিদর্শন৷ তিনি সব সময় সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন৷ আর এ বিষয়টি পররাষ্ট্রনীতি ও বিরোধীদের মোকাবেলার ক্ষেত্রে বিশ্বনবী (সাঃ)'র ডিপ্লোমেসি বা কৌশল ও গতিশীলতা বৃদ্ধি করতো৷ বিশ্বনবী (সাঃ) বৈদেশিক নীতি নির্ধারণের জন্যে সে যুগের অন্যান্য দেশের সরকার ও সাম্রাজ্যগুলো সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখতেন৷ তিনি বিভিন্ন দেশের সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং ঐসব দাওয়াতের প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী ইসলামের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের জন্যে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতেন বা নীতি নির্ধারণ করতেন৷ বিশ্বনবী (সাঃ)'র সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে গভীর গবেষণা করলে দেখা যায় ইসলাম ধর্ম মানবপ্রেমের ধর্ম৷ কাফের ও মুশরিকরা তাদের কুফরী বা শির্কের মাধ্যমে নিজের ধবংস ডেকে আনছে বা সৌভাগ্য তথা মুক্তি থেকে বঞ্চিত হচেছ দেখে রহমতের নবী (সাঃ) যারপরনাই ব্যাথিত হতেন৷ তাই তিনি তাদেরকে সুপথে আনার জন্যে সচেষ্ট ছিলেন৷ বিশ্বনবী (সাঃ) বলতেন, তোমাদের মধ্যে সে-ই নেতা হবার যোগ্য যে আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম ও মর্যাদাবান৷
আওস ও খাজরাজ গোত্র ছিল পরস্পরের ঘোর শত্রু ৷ কিন্তু ইসলামের ছায়াতলে আসার পর বিশ্বনবীর প্রচেষ্টায় এই ঘোর শত্রুতা রূপ নেয় প্রগাড় বন্ধুত্ব, ভাতৃত্ব ও ভালোবাসায়৷ আওস গোত্রের এক বৃদ্ধ তার কৃষিকাজে সহায়তার জন্যে খাজরাজ গোত্রের সাহায্য চেয়েছিলেন৷ বৃদ্ধ জানান তার সন্তান কলেরা রোগে মারা গেছে এবং দেনা পরিশোধ করতে না পারলে এক ইহুদি তার উট ও গরু নিয়ে যাবে৷ খাজরাজ গোত্র সাথে সাথে তার এ আহবানে সাড়া দিয়ে কয়েকজন শক্তিশালী খাজরাজ যুবককে আওস ঐ বৃদ্ধের কাছে পাঠিয়ে দেয়৷ এমনকি খাজরাজ গোত্রের দুই ব্যক্তি গরু ও উট রক্ষার জন্যে তাকে বেশ কিছু মুদ্রা দেন৷ এসময় এক ব্যক্তি কোরানের এই আয়াত তেলাওয়াত করছিলেন যাতে বলা হয়েছে- কে যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করবে যাতে আল্লাহ তা তার জন্যে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেন? আল্লাহই বান্দাদের রিজিক হ্রাস ও বৃদ্ধি করেন এবং তোমাদেরকে তাঁর দিকেই ফিরে যেতে হবে৷
এভাবে খাজরাজ গোত্র আল্লাহর আহবান বাস্তবায়িত করতে পেরে খুশী হয়েছিল৷ অন্যদিকে আওস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে সংঘাত বা ফেতনা সৃষ্টির জন্যে সক্রিয় শা'স বিন ক্বেইস নামের এক ব্যক্তি এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তার এক ইহুদি বন্ধুকে বললো, মুহাম্মাদ গোত্রগুলোর গণমাণ্য ব্যক্তিদের এতো ঘনিষ্ঠ করে ফেলেছেন যে তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা সম্ভব নয় ৷ দুই গোত্রের মধ্যে সংঘটিত এই ঘটনার কথা শুনে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) অত্যন্ত সন্তুষ্ট চিত্তে বলেছিলেন, ইসলামই এতসব দয়া ও সহমর্মিতা দান করেছে ৷
নবী-রাসূলগণের প্রধান দায়িত্ব ছিল মানব সমাজকে সত্য, সৌভাগ্য ও পরিপূর্ণতার দিকে পরিচালিত করা ৷ আর এ জন্যে তাঁদের আচার আচরণ ছিল মূলতঃ দয়া ও ভালোবাসার সর্বোত্তম নিদর্শন৷ বিশ্বনবী (সাঃ) ছিলেন এক্ষেত্রে সবার শীর্ষে৷ রাসূল (সাঃ)'র ঘোর বিরোধীরাও তাঁর আন্তরিক দয়া ও ভালবাসার অমিয় ফল্গুধারায় সিক্ত হতো৷ তিনি যতটা সম্ভব শত্রুদের ভুল-ত্রুটি মার্জনা করতেন বা সেগুলো এড়িয়ে যেতেন৷ এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে বিরোধীদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে বিশ্বনবী (সাঃ)'র দয়া ও ভালোবাসার কি কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা ছিল? অন্য কথায় সে যুগের সমাজে বিরোধীদের মর্যাদা বা অবস্থান কি ছিল?
ইসলাম জোরজবরদস্তি বা কঠোরতার ধর্ম নয়৷ জনগণের সাথে নমনীয় আচরণ ইসলামের একটি মৌলিক বা জরুরী নীতি৷ মানুষের জন্যে পরিপূর্ণ আদর্শ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এ সম্পর্কে বলেছেন, সে-ই সবচেয়ে বুদ্ধিমান যে অন্যদের সাথে বেশী আপোস বা নমনীয় আচরণ করে৷
ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী মানুষের সাথে নমনীয় আচরণ বা নমনীয়তার অর্থ এই নয় যে মুসলমানরা ইসলামী বিধান ও দুনিয়ার বিষয়ে নিস্ক্রিয় থাকবে বা শৈথিল্য প্রদর্শন করবে৷ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বিশ্বনবী (সাঃ)কে ক্ষমাশীলতা ও আপোস করার পরামর্শ দিয়েছেন৷ কিন্তু অংশীবাদী ও মূর্তিপূজারীদের ভুল-ত্রুটি বা বিচ্যুতির ব্যাপারে রাসূল (সাঃ)কে বলা হয়েছে, হে নবী! আপনি বলুন, আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছুর এবাদত বা উপাসনা করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে৷ অর্থাৎ ইসলামের মূল নীতিগুলো মেনে চলার ক্ষেত্রে শৈথিল্যের কোনো অবকাশ নেই এবং বাতিল বা ভুল চিন্তাধারার মোকাবেলায়ও নীরব থাকার কোনো সুযোগ নেই৷
অন্য কথায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র সাফল্যের রহস্য হলো, একদিকে নমনীয়তা ও অন্যদিকে দৃঢ়তা৷ রাসূলে পাক (সাঃ) ধর্মীয় গ্রন্থের অনুসারী হবার দাবীদারদের সাথে যতটা সম্ভব আলোচনায় বসতেন, কখনও কখনও তাদের সাথে চুক্তি করেছেন এবং তারাও যেন মুসলমানদের পাশে শান্তিতে বসবাস করতে পারে সে জন্যে চেষ্টা করেছেন৷ এভাবে তিনি বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বা চিন্তার সাথে পারস্পরিক পরিচয় এবং এসব চিন্তা বা মতের বিকাশ ও পূর্ণতার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন৷ অমুসলমানরাও এসব চুক্তি ও ঐক্যের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিল৷ কারণ শান্তি বা নিরাপত্তার পরিবেশ ছিল সমাজের সবার জন্যেই কল্যাণকর৷ পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ও উত্তেজনামূক্ত থাকায় অমুসলমানরা ইসলামকে সহজে উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছিল ৷ আর মূলতঃ এ কারণেই তৎকালীন যুগে আরবের অমুসলমানদের অধিকাংশই ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিল৷
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বিরোধীদের কাছে ধর্মপ্রচারক কিংবা বিশেষ প্রতিনিধিদল পাঠিয়ে, বা চিঠি পাঠিয়ে ইসলাম ধর্ম প্রচারের সময় এটা বুঝিয়ে দিতেন যে, ইসলাম যুক্তিতে ও সংলাপে বিশ্বাসী৷ জোরজবরদস্তি বা ভয় প্রদর্শন ইসলামের নীতি নয়৷ বারট্রান্ড রাসেল এ প্রসঙ্গে বলেছেন, আধুনিক যুগে সুন্দর আচরণ হিসেবে বিবেচিত কিছু কিছু নির্বাচিত গুণের কথা বলা হয়৷ অতীতে প্রাচ্যে এসব গুণের অধিকাংশেরই চর্চা হত৷ ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানদের উদারতা ও নমনীয় আচরণ, বিশেষ করে মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের এই উদারতা এবং খৃষ্টানদের সাথে মুসলমানদের আচরণ ছিল অত্যন্ত পৌরুষোচিত৷ ইসলামের নবীর আচরণ বা কর্মপন্থা ছিল উদারতাপূর্ণ বা নমনীয়৷ ইউরোপের মধ্যযুগের কাপুরুষোচিত রীতির বিপরীতে তিনি ভিন্ন মত বা ভিন্ন চিন্তা দমনের জন্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা সৃষ্টি করেন নি, কিংবা ঐসব প্রতিষ্ঠানের মতো নির্যাতন ক্যাম্প বা কারাপ্রকোষ্ঠও গড়েন নি৷
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম বা অনুসারীবৃন্দ ১৩ বছর ধরে মক্কার লোকদের জুলুম অত্যাচার সহ্য করেছেন, কিন্তু তাঁরা কখনও এর প্রতিশোধ নেননি৷ মদীনাসহ বিভিন্ন স্থানে জাহেলী আচরণে অভ্যস্ত আরবের মানুষকে সুশিক্ষার আলো দেয়ার জন্যে রাসূলে পাক (সাঃ)'র মনোনীত ধর্ম প্রচারকরা পবিত্র কোরআনের বাণী প্রচার করতেন৷ আর কোরআনের বাণী মানুষের চরিত্র পরিবর্তনে অসাধারণ ভূমিকা রাখতো৷ বলা হয়ে থাকে যে মদীনা জয় করা হয়েছিল পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে ৷ একবার এক ইহুদি যুবক বিশ্বনবী (সাঃ)'র কঠোর বিরোধীদের উস্কানীতে প্রভাবিত হয়ে আওস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে এমন ফেতনা সৃষ্টি করে যে তাতে এই দুই গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যাবার উপক্রম হয়৷ কিন্তু রাসূলে পাক (সাঃ)'র পরামর্শ ও হস্তক্ষেপে ঐ বিরোধের অবসান ঘটে৷ তিনি এই ফেতনা সৃষ্টিতে ঐ ইহুদি যুবকের ভূমিকার কথা জানা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি৷
বিশ্বনবী (সাঃ) তাঁর অনেক জানী দূষমন বা ইসলামের ঘোরতম শত্রুকেও অনুতপ্ত বা ক্ষমাপ্রার্থী হবার কারণে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন৷ তবে ইসলাম বিরোধীদের তৎপরতা যখন বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছতো ও ইসলামী রাষ্ট্র মারাত্মক বিপদের সম্মুখীন হতো তখন তা মোকাবেলা করা ছাড়া রাসূল (সাঃ)'র জন্যে অন্য কোন পথ খোলা থাকতো না৷ ইসলামের মূল ভিত্তি যখন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতো তখন তিনি কোনো অবস্থাতেই নমনীয়তা বা শৈথিল্য দেখাতেন না ৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, জুলুমের মোকাবেলা, শির্ক, খোদাদ্রোহীতা, অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের মোকাবেলায় ছিলেন অসাধারণ মাত্রায় কঠোর৷ তাঁর দৃষ্টিতে আল্লাহর বিধানই সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব পাবার যোগ্য৷ আর এভাবেই সব মানুষের অধিকার ন্যায়সঙ্গতভাবে রক্ষা করা সম্ভব বলে তিনি মনে করতেন৷ তিনি কখনও এ নীতির অন্যথা করেন নি৷ যেমন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বা বায়তুল মালের আত্মসাৎকারীর ব্যাপারে তিনি কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন, বা যারা সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্ন করেছিল তাদের সাথেও তিনি কঠোর আচরণ করেছেন ৷
পবিত্র কোরআনের ভাষায় বিশ্বনবী (সাঃ) ছিলেন সারা বিশ্বের জন্যে রহমত ও বরকতের উৎস৷ রাসূল (সাঃ)'র ক্ষমা ও দয়ার বহু দৃষ্টান্ত মানবতার ইতিহাসে ত্যাগ ও মহানুভবতার প্রজ্জ্বোল আলোকবর্তিকা হয়ে আছে৷ এবার এমনই এক ঘটনা শোনা যাক৷
মক্কা বিজয়ের পর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেন৷ তা সত্ত্বেও ইসলামের অন্যতম ঘোর শত্রু আবু জাহেলের পুত্র আকরামা প্রাণভয়ে ইয়েমেনের দিকে পালিয়ে যান৷ আকরামার স্ত্রী উম্মে হাকিম ছিল বেশ বুদ্ধিমতি ও সচেতন৷ মক্কা বিজয়ের প্রথম দিকেই মুসলমান হয়ে উম্মে হাকিম তার স্বামীর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে রাসূল (সাঃ)'র কাছে যায়৷ দয়ার নবীর দয়াদ্র দৃষ্টি ও শান্ত বা মৃদৃ ভাষণ উম্মে হাকিমকে আশান্বিত করে তুললো৷ সে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমার স্বামী আকরামা প্রাণভয়ে ইয়েমেনের দিকে পালিয়ে গেছেন, আমি আপনার কাছে তার নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি যাতে সে মক্কায় ফিরে আসতে পারে এবং তার অতীত কাজের ক্ষতিপূরণ করতে পারে৷
ক্ষমা ও মহানুভবতার প্রতিচছবি রাসূল (সাঃ) এই নিরাশ্রয় মহিলার আবেদন মঞ্জুর করে তাকে নিরাপত্তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন ৷ রাসূলে খোদা(সাঃ)র কাছ থেকে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি পেয়ে উম্মে হাকিম তার স্বামীর কাছে ছুটে গেল৷ আকরামা তখন সাগর পথে ইয়েমেনে পালিয়ে যাবার প্রস্তুতি নিচিছল৷ উম্মে হাকিম তাকে বললো, আকরামা, তুমি তোমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন কর৷ আমি এমন এক ব্যক্তির কাছ থেকে এসেছি যিনি সবচেয়ে উত্তম ও আদর্শ মানুষ৷ তুমি তাঁর সম্পর্কে তড়িঘড়ি বিচারবিবেচনা করেছ৷ মুহাম্মাদ (সাঃ) ভদ্রতম ব্যক্তি৷ তিনি অন্য সবার চেয়ে বেশী বিশ্বস্ত৷ আমি তাঁর কাছ থেকে তোমার জন্যে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি আদায় করেছি৷
স্ত্রীর কথা শুনে আকরামার পা যেন নিশ্চল হয়ে পড়লো৷ সে বসে পড়লো৷ তার স্ত্রী আরো বললো, আকরামা, মুহাম্মাদ (সাঃ) যুদ্ধের জন্যে আসেননি, তিনি শান্তি ও প্রীতির বাণীবাহক৷ তিনি ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে থেকেও তাঁর সমস্ত শত্রুকে ক্ষমা করে দিয়েছেন ও তাদেরকে নিরাপত্তা দিয়েছেন ৷ তাঁর চেয়েও মহানুভব কেউ কি আছে? মুহাম্মাদ (সাঃ) বলেন যে শুধু এক আল্লাহর এবাদত কর, পরস্পর যুদ্ধ করো না, আমানতগুলো রক্ষা করো এবং একে অপরকে ভালোবাস৷ এসব কথা কি আমাদের মুক্তির রক্ষাকবচ নয়?
স্ত্রী উম্মে হাকিমের এসব কথা শুনে আবু জাহেলের পুত্র আকরামার প্রাণ জুড়িয়ে গেল৷ সে স্ত্রীর সাথে মক্কায় ফিরে এল৷ মক্কায় সে রাসূলে খোদা (সাঃ)'র কাছে হাজির হলো অত্যন্ত অনুতপ্ত অবস্থায়৷ বিশ্বনবী (সাঃ)'র দয়াদ্র ও চিত্তাকর্ষক চেহারা তাকে আকৃষ্ট করলো৷ অমন প্রবল প্রতাপান্বিত ক্ষমতায় থেকেও কেউ যে এতটা দয়াদ্র ও বিনম্র হতে পারে তা আকরামার জানা ছিল না৷ আকরামা রাসূল (সাঃ)কে বললো, আমার স্ত্রী আমাকে জানিয়েছে যে আপনি আমাকে নিরাপত্তা দান করেছেন৷ রাসূল (সাঃ) বললেন, সে সত্যই বলেছে৷ তুমি নিরাপদ৷ এ কথা শুনে মহাবিস্মিত আকরামার স্মৃতিপটে রাসূল (সাঃ) ও তাঁর সঙ্গীদের ওপর তার পিতা আবু জাহেলের ভয়ানক অত্যাচারগুলোর দৃশ্য জেগে উঠলো৷ সে মনে মনে ভাবলো, রাসূল (সাঃ) ক্ষমতার এই শীর্ষ পর্যায়ে থেকে ইচেছ করলে তার কাছ থেকেই তারা পিতার অত্যাচারগুলোর বদলা নিতে পারেন৷ কিন্তু রাসূল (সাঃ)'র দয়াদ্র আচরণ দেখে সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলো এবং রাসূল (সাঃ) তার পাপগুলো ক্ষমা করে দেয়ার জন্যে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন৷
বিমুগ্ধ আকরামা বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে যে কোনো আদেশ বা উপদেশ দিন, আমি তা পালন করবো৷ দয়ার নবী বললেন, অঙ্গীকার কর যে আল্লাহর পথে সেবা ও জিহাদ করবে৷ আকরামা জবাবে বললো, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! শির্ক ও মূর্তিপূজার পেছনে যতটা ব্যায় করেছি ইসলামের অগ্রগতির জন্যে তার চেয়ে দ্বিগুণ পেশ করবো৷

মানব জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র ব্যক্তিত্ব গবেষকরা বিভিন্ন মূল্যবান বই বা গ্রন্থ লিখে গেছেন৷ এ বইগুলো স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের কারণে প্রশংসনীয়৷ কিন্তু যখন পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলছেন, হে মুহাম্মাদ, আপনি বলুন যে, আমি তোমাদর মতোই একজন মানুষ, তখন এটাই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে মুহাম্মাদ (সাঃ)কে তোমরা নিজ সম্প্রদায় তথা মানবজাতির মধ্যকার এমন একজন হিসেবে বিবেচনা কর যিনি একইসাথে আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী৷
পবিত্র কোরআনের আলোকে বলা যায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ছিলেন মানব জাতির জন্যে দয়া ও রহমত৷ মানবজাতির জন্যে তিনি চিরন্তন আদর্শ এবং সব নবী-রাসূলের সত্যতার সাক্ষী৷ মহান আল্লাহ তাঁকে রাউফ ও রাহীম তথা দয়াদ্র ও দরদী বলে অভিহিত করেছেন৷ আল্লাহ তাঁর প্রিয়তম বান্দা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র নামকে বার বার তাঁর নামের পাশে উল্লেখ করেছেন৷ যেমন, পবিত্র কোরআনের সূরা মুনাফেকীন, নিসা ও আনফালে এসেছে- ‘‘ সম্মান তো কেবল আল্লাহ ও রাসূলের৷'' ‘‘আল্লাহ ও রাসূলের অনুসরণ কর৷'' ‘‘ আল্লাহ ও রাসূলের আহবানে সাড়া দাও ৷" সূরা আহযাবের ৪৫ ও ৪৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন, হে নবী! আমরা নিশ্চয়ই তোমাকে পাঠিয়েছি একজন সাক্ষী, একজন সুসংবাদদাতা ও একজন সতর্ককারীরূপে, আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে মানুষকে তাঁর দিকে আহবায়করূপে, আর একটি উজ্জ্বল প্রদীপরূপে৷ পবিত্র কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী দয়ার নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) মানুষের জন্যে তাঁর অন্তরে এতো দয়া ও গভীর ভালোবাসা অনুভব করতেন যে অনেক সময় মনে হতো যে মানুষের জন্যে চিন্তা ও উদ্বেগে তিনি হয়তো প্রাণত্যাগ করবেন৷
একবার এক আরব বেদুইন রাসূল (সাঃ)'র কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে তিনি তাকে কিছু দিয়ে প্রশ্ন করলেন এতে সে সন্তুষ্ট হয়েছে কিনা৷ উত্তরে ঐ অকৃতজ্ঞ লোক বললো, না, আপনি ভালো কাজ করেন নি৷ উপস্থিত সাহাবাদের মধ্যে কেউ কেউ তার এই অপছন্দনীয় আচরণের কঠোর জবাব দিতে চাইলনে৷ কিন্তু দয়ার নবী তাদের বাধা দিলেন৷ রাসূল (সাঃ) পরে তাকে আবার ডেকে পাঠান এবং তাকে আরো কিছু জিনিষ উপহার দেন৷ পরদিন ঐ বেদুইন মসজিদে এসে রাসূল (সাঃ)'র উদ্দেশ্যে বলল, আল্লাহ আপনাকে আপনার পরিবার ও জাতির মাধ্যমে কল্যাণ দান করুন৷ এ সময় রাসূলে পাক (সাঃ) জনতার দিকে ফিরে বললেন, আমার ও এই ব্যক্তির গল্প সেই ব্যক্তির ঘটনার মতো যার উট ভয় পেয়ে পালিয়ে গেছে৷ কিন্তু মানুষ ভাবলো, উটের মালিককে সাহায্য করার দরকার৷ তাই তারা উট ধরার জন্যে ছুটে গেলো৷ ওদিকে মানুষের দৌড় ও চিৎকারের ফলে উট আরো বেশী দূরে পালিয়ে গেল৷ এরপর উটের মালিক বললো,‘‘ তার ও উটের আশপাশ যেন খালি রাখা হয়৷ আমি জানি কিভাবে এ উটকে বশ করতে হবে এবং এই উটের ব্যাপারে আমার দয়া মায়া অন্যদের চেয়ে বেশী ৷'' এরপর মানুষ চলে গেলে উটের মালিক ধীরে ধীরে উটের কাছে গিয়ে তার লাগাম ধরে৷ ঠিক আমিও গতকাল যদি তোমাদেরকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিতাম এবং তোমরা ক্রুদ্ধ হয়ে এই লোকটিকে মেরে ফেলতে, তাহলে সে কাফের বা অবিশ্বাসী হিসেবে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিত৷ কিন্তু নমনীয়তা ও দয়ার মাধ্যমে তাকে শান্ত ও খুশী করা সম্ভব হলো ৷
পবিত্র কোরআনে রাসূলর (সাঃ) বিভিন্ন নাম ও উপাধি দেখা যায়৷ আর এসব নামই বিশ্বনবী (সাঃ)'র শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার নিদর্শন৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র সবচেয়ে প্রসিদ্ধ নাম মুহাম্মাদ ও আহমাদ৷ এর অর্থ প্রশংসিত৷ শেষ নবী (সাঃ) পৃথিবীতে মুহাম্মাদ ও উর্দ্ধলোকে আহমাদ হিসেবে অভিহিত হন৷ পবিত্র কোরআনে রাসূলে পাক (সাঃ)কে আবদুল্লাহ বা আল্লাহর দাস, খাতামান্নাবিয়িন বা সর্বশেষ নবী, রাহমাতুললিল আলামিন বা বিশ্বজগতের জন্যে আল্লাহর অনুগ্রহ বা রহমত ও আরো কয়েকটি নামে অভিহিত করা হয়েছে৷ লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হলে মহান আল্লাহ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)কে ইয়া আইয়ুহাররাসূল বা হে (প্রিয়) রাসূল! ও ইয়া আইয়ুহান্নাবী বা হে (প্রিয়) নবী! বলার মাধ্যমে তাঁকে উচ্চতর সম্মান দেখিয়েছেন৷ আল্লাহর বান্দা বা দাস হওয়া মানুষের জন্যে সর্বোচচ মর্যাদার বিষয়৷ কারণ আল্লাহর বন্দেগী বা দাসত্ব করার মাধ্যমে মানুষ আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতা অর্জন করে ৷
বিশ্বনবী (সাঃ) আল্লাহর এবাদতের প্রতি এত বেশী অনুরক্ত ছিলেন যে কখনও কখনও তিনি এবাদতে আত্মহারা হয়ে যেতেন এবং অত্যধিক নামাজ আদায় করতে গিয়ে তাঁর পবিত্র পা-যুগল ফুলে যেতো ৷ পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাঁর এই অত্যধিক এবাদতের প্রশংসা করে বলেছেন, নিজেকে এভাবে কষ্ট দেয়ার জন্যে আমরা কোরআন নাজেল করিনি৷ পবিত্র কোরআন মহান আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল (সাঃ)কে বিভিন্ন অপবাদ ও তাঁর নিন্দার মোকাবেলা করে এবং তাঁর পবিত্রতার সাক্ষ্য দিয়েছে৷ সেই সূদূর অতীতকাল থেকে ইসলাম ও সত্য বিরোধী মহল বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র আলোকোজ্জ্বল চরিত্রকে কালিমালিপ্ত করার অপচেষ্টা চালিয়ে এসেছে যাতে বিশ্বের মানুষের কাছে তাঁর ও ইসলাম ধর্মের নজিরবিহীন প্রভাব ক্ষুন্ন বাধাগ্রস্ত করা যায়৷ কিন্তু মহান আল্লাহ তাদের বিরোধীতার জবাব দিয়েছেন৷ যেমন, ইসলাম বিরোধী কোনো কোনো মহল বলে, নবী (মুহাম্মাদ-সাঃ) যা বলেছেন তা জ্ঞানীদের কাছ থেকে শিখেছেন অথবা নিজের মন থেকে বানিয়ে বলেছেন বা নিজের খেয়ালী প্রবৃত্তি থেকে সেগুলো বলেছেন৷ কিন্তু পবিত্র কোরআন সূরা নজমে এসব ভিত্তিহীন দাবীর জবাব নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, সে কখনও মনগড়া কথা বলে না৷ কোরআন তো ওহী বা প্রত্যাদেশ যা তার ওপর নাজেল হয়েছে৷ তাকে শিখিয়েছেন বিরাট শক্তিমান৷
ইসলামের কোনো কোনো শত্রু রাসূল (সাঃ)কে কবি বলে অভিহিত করেছে৷ পবিত্র কোরআনের সূরা ইয়াসিনের ৬৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ এর জবাবে বলেছেন, আমরা কখনও তাকে কবিতা শিক্ষা দেইনি৷ তা তার জন্যে শোভনীয়ও নয়৷ এতো এক উপদেশ ও সুস্পষ্ট কোরআন৷ বিশ্বনবীকে কেউ কেউ যাদুকর, গনক বা অপ্রকৃতস্হ বলে যেসব অপবাদ দিয়েছে পবিত্র কোরআনের অন্য আয়াতে আল্লাহ তার যুক্তিগ্রাহ্য ও শক্ত জবাব দিয়েছেন এবং তিনি সঠিক সরল পথে আছেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন৷
একবার রাসূল (সাঃ)'র কোনো এক স্ত্রীর কাছে কোনো এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেন যে নূরনবী (সাঃ)'র চরিত্র কেমন ছিল? উত্তরে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, তুমি কি কোরআন পড়েছ? ঐ ব্যক্তি জবাব দিল, হ্যা পড়েছি৷ তখন রাসূল (সাঃ)'র স্ত্রী বললেন, তিনি নিজেই তো কোরআন৷ নূরনবী (সাঃ)'র জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তাঁর আচার আচরণ ও কর্মতৎপরতা ছিল পবিত্র কোরআনের উচ্চতর শিক্ষার জীবন্ত নমুনা৷ পবিত্র কোরআনের ভাষায় বিশ্বনবী (সাঃ) ছিলেন গোটা মানব জাতির জন্যে সতর্ককারী, যেমনটি পবিত্র কোরআন নিজেই সতর্ককারী৷ পবিত্র কোরআন মানুষের জন্যে রহমত বা আল্লাহর মহাঅনুগ্রহ, তেমনি নূরনবী (সাঃ)ও পবিত্র কোরআনের মতো মানুষকে অজ্ঞতার অাঁধার থেকে মুক্ত করে তাদের জন্যে রহমত হিসেবে নিয়োজিত হয়েছেন৷ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বিশ্বনবী (সাঃ)কে সিরাজুম মুনিরা বা প্রদীপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন৷ অথচ এখানে অন্য কোনো উপমা যেমন সূর্য বা নক্ষত্র বলা যেতো৷ কিন্তু তা না বলে তাঁকে প্রদীপ বলা হয়েছে৷ এর তাৎপর্য সম্ভবতঃ এটাই যে এক প্রদীপের আলো থেকে লক্ষ কোটি প্রদীপ বা বাতি জ্বালানো যায়৷ হেদায়াতের আলো এভাবে বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে বলে বিশ্বনবী (সাঃ)কে মহান আল্লাহ এই বিশেষ অভিধায় অভিহিত করে তাঁর উচ্চতম মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়েছেন৷

মানব জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র জীবন সেই শৈশব থেকে ওফাত পর্যন্ত মোজেজা বা মহাবিস্ময়কর অনেক ঘটনায় ভরপূর ছিল৷ আমরা জানি মোজেজা বা অলৌকিক ঘটনা সাধারণ মানুষ বা সাধারণ কার্য-কারণ বা চালিকা শক্তির মাধ্যমে ঘটানো সম্ভব নয়৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র জীবনের অলৌকিক অথচ সন্দেহাতীত ঘটনাগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে তিনি মহান আল্লাহর পরম প্রিয়পাত্র এবং তাঁরই মনোনীত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ৷
মোজেজা বা অলৌকিক ঘটনা সব নবী-রাসূলের জীবনেই ঘটেছে৷ কারণ প্রত্যেক নবী ও রাসূলের সাথে আল্লাহর যোগাযোগ ছিল৷ অন্য কথায় নবী-রাসূলগণ আল্লাহর কাছ থেকে বাণী ও দিকনির্দেশনা লাভ করতেন৷ তাঁরা নবুওত বা রেসালাতের বিষয়টি প্রমাণের জন্যে প্রয়োজনে যুক্তির পাশাপাশি মোজেজা বা অলৌকিক ঘটনাও ঘটাতেন৷ মোজেজা আল্লাহর নির্দেশেই ঘটতো এবং এ ধরনের ক্ষমতা আল্লাহ-প্রদত্ত ক্ষমতারই নিদর্শন৷ পবিত্র কোরআনে হযরত মূসা ও হযরত ঈসা (আঃ)'র মো'জেজাসহ অতীতের অনেক নবীর মো'জেজার কথা বলা হয়েছে৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)ও তাঁর পূর্ববর্তী নবীগণের মো'জেজার বা অলৌকিক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন৷
বিশ্বমানবতার মুক্তির মহাকান্ডারী ও একত্ববাদের বিজয়-গাঁথার সর্বশ্রেষ্ঠ নিশানবরদার রাসূলে পাক (সাঃ)ও অনেক মো'জজা দেখিয়েছেন৷ পবিত্র কোরআন তাঁর সর্বত্তোম মো'জেজা এবং তাঁর রেসালাত ইসলাম ধর্মের সত্যতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ৷ এ মহাগ্রন্থ খোদায়ী নিদর্শন ও জ্ঞানে পরিপূর্ণ৷ তাই পবিত্র কোরআন চিরন্তন ও অবিনশ্বর৷ কোরআনের বাণী নির্দিষ্ট স্থান, জাতি ও কালের গন্ডীতে সিমীত নয়৷ এর বাণী, বিষয় ও শিক্ষা সব সময়ই নতুন, হৃদয়স্পর্শী ও স্পষ্ট এবং মানব জীবনের সর্বোত্তম দিশারী৷ মহান আল্লাহই এ মহাগ্রন্থের রচয়িতা বলে কোরআনের বাণীর মতো বাণী আর কেউই সৃষ্টি করতে সক্ষম নয়৷ কিন্তু পবিত্র কোরআনের বাণী এত আকর্ষণীয় ও অলৌকিক হওয়া সত্ত্বেও অজুহাতকামী ও একগুঁয়ে শ্রেণীর লোকেরা বিশ্বনবী (সাঃ)'র আহবানে সাড়া দেয় নি, বরং তারা রাসূলে পাক (সাঃ)কে যাদুকর বলে অপবাদ দিয়েছে৷ তারা বলতো কেবল বাহ্যিক কিছু অলৌকিক ঘটনা দেখালেই আমরা আপনাকে নবী হিসেবে মেনে নেব৷ পবিত্র কোরআনেই অযৌক্তিক ঐসব দাবী সম্পর্কে বলা হয়েছে, আমরা অবশ্যই এ কোরআনে মানুষের জন্যে সব কিছুর নিদর্শন বর্ণনা করেছি৷ কিন্তু অধিকাংশ মানুষই অবিশ্বাস করেছে৷ তারা বলেছে, আমরা কখনও তোমাকে নবী বলে বিশ্বাস করবো না যদি না তুমি শুস্ক প্রান্তরে ঝর্ণা প্রবাহিত কর, অথবা তোমার জন্যে থাকুক খেজুর ও আঙুরের বাগান যাতে তুমি ঝরণারাজি উৎসারিত করে বইয়ে দেবে, অথবা আকাশকে খন্ড-বিখন্ড করে আমাদের ওপর নামাবে যেভাবে তুমি ইচেছ কর, কিংবা তুমি আল্লাহ ও ফেরেশতাগণকে সরাসরি আমাদের সামনে হাজির কর৷ অথবা স্বর্ণখচিত একটি ঘর বা বাড়ি তোমার জন্যে নিয়ে আস, কিংবা আকাশের দিকে উড়ে যাও৷ আকাশে বা উধর্বলোকে তোমার আরোহনকে আমরা কখনও বিশ্বাস করবো না যতক্ষণ না তুমি আকাশ থেকে একটি চিঠি বা বই আমাদের জন্যে নামিয়ে আনবে যা আমরা পড়তে পারি৷ আর কেবল তা পারলেই আমরা তোমাকে নবী বলে মনে করবো৷ হে রাসূল! আপনি বলুন, সকল মহিমা আমার প্রভুর, আমি কি একজন মানুষ ও আল্লাহর রাসূল ছাড়া অন্য কিছু?
পবিত্র কোরআন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র অতুলনীয় ব্যক্তিত্বের সমর্থনে বক্তব্য রেখেছে এবং তাঁর সম্পর্কে যাদুকর বা অপ্রকিতস্থ হবার অপবাদ খন্ডন করেছে৷ পবিত্র কোরআন বিশ্বনবী (সাঃ)'র কয়েকটি মো'জেজা বা অলৌকিক ঘটনার কথাও উল্লেখ করেছে৷ উধর্বলোকে তাঁর সফর বা মেরাজ গমন এমনই একটি মোজেজা৷ কোনো এক রাতে রাসূলে পাক (সাঃ) আল আকসা মসজিদ থেকে উধর্বজগতে আরোহন করে বেহেশত ও দোযখসহ সমস্ত বিশ্ব জগত ভ্রমণ করেন৷ এ সংক্ষিপ্ত অথচ অলৌকিক সফরে অতীতের নবীগণের সাথে তাঁর সাক্ষাৎসহ অনেক বিস্ময়কর ব্যাপার ঘটেছে এবং তিনি অনেক বিস্ময়কর বিষয় প্রত্যক্ষ করেন৷ আমাদের এই ধারাবাহিক আলোচনার একটি অনুষ্ঠানে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে৷ পবিত্র কোরআনে বিশ্বনবী (সাঃ)'র অন্য যেসব মো'জেজার কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেসবের মধ্যে চাঁদকে দ্বিখন্ডিত করার ঘটনা অন্যতম৷
আবুজেহেল ও ওয়ালিদ বিন মুগিরাহসহ মক্কার কোরাইশ ও মুশরিকদের একদল নেতা একবার বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র কাছে আসেন৷ সে সময় রাতের বেলায় পূর্ণ চাঁদ দেখা যাচিছল৷ ওরা রাসূলে পাক (সাঃ)কে বললো, তোমার নবুওতের দাবী যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে এই চাঁদকে দ্বিখন্ডিত হতে বল৷ রাসূলে খোদা (সাঃ) বললেন, এ কাজ করলে কি তোমরা ঈমান আনবে? তারা বললো হ্যা৷ রাসূল (সাঃ) আল্লাহর কাছে এ মো'জেজা ঘটানোর প্রার্থনা করেন৷ হঠাৎ সবাই দেখলো, চাঁদ এত স্পষ্টভাবে দুই খন্ড হয়ে গেছে যে দ্বিখন্ডিত চাঁদের মাঝখানে হেরা পর্বত দেখা যাচেছ৷ এরপর দ্বিখন্ডিত চাঁদ আবার জোড়া লেগে যায় এবং তা পূর্ণ চাঁদে পরিণত হয়৷ এ সময় রাসূলে পাক (সাঃ) বলছিলেন, সাক্ষী থাক ও দেখ৷ মুশরিকরা তো এই অসাধারণ দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে হতবাক! কিন্তু তাদের কেউ কেউ ঈমান না এনে বললো, মুহাম্মাদ আমাদেরকে যাদু করেছে৷ পবিত্র কোরআনে এ ঘটনা সম্পর্কে বলা হয়েছে, সেই সময় বা কিয়ামত সমাগত এবং চাঁদ দ্বিখন্ডিত হয়েছে৷ আর যখন ওরা কোনো নিদর্শন বা মো'জেজা দেখেছে তখন ওরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে৷ ওরা বলে, এ এক চিরাচরিত যাদু৷ ফাখরে রাজী তাফসীরে মাফাতিহুল গাইবে সূরা ক্বামারের তাফসীরে লিখেছেন, সমস্ত তাফসীরকার এ ব্যাপারে একমত যে চাঁদে ফাটল বা ভাঙ্গন দেখা দিয়েছিল এবং গোটা চাঁদ দ্বিখন্ডিত হয়েছিল৷ এ ঘটনা সম্পর্কে হাদীসের প্রায় বিশটি বর্ণনা রয়েছে এবং এ ঘটনার সত্যতার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই৷ এবার আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আঃ) ও ওয়ারাকা বিন নওফেলের মাধ্যমে বর্ণিত বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র এক মো'জেজার বর্ণনা দেব৷ আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আঃ) বলেছেন, একদিন আমি রাসূলে পাক (সাঃ)'র সাথে থাকা অবস্থায় কোরাইশ গোত্রের একদল লোক তাঁর কাছে এসে বললো, হে মুহাম্মাদ, তুমি বেশ বড় মাপের দাবী করছ৷ এ ধরনের দাবী তোমার পূর্বপুরুষ ও আত্মীয়-স্বজন কখনও করেনি৷ তুমি যদি আমাদের একটি বিশেষ দাবী পূরণ করতে পার তাহলে আমরা তোমার রেসালাতে বিশ্বাস করবো৷ আর তুমি তা না পারলে তোমাকে স্রেফ যাদুকর ও মিথ্যাবাদী ছাড়া অন্য কিছু মনে করবো না৷ রাসূলে আকরাম (সাঃ) বললেন, তোমরা কি চাও? ওরা বললো, আমরা চাই তোমার নির্দেশে এই গাছটি যেন শেকড়সহ মাটি থেকে উঠে তোমার কাছে চলে আসে৷ রাসূলে পাক (সাঃ) বললেন, মহান আল্লাহ সর্বশক্তিমান৷ তিনি তোমাদের এ দাবী পূরণ করলে তোমরা কি ঈমান আনবে এবং সত্যের সাক্ষ্য দেবে? ওরা বললো, হ্যা৷ রাসূলে খোদা (সাঃ) বললেন, তোমাদের দাবী পূরণ করবো, তবে আমি জানি যে তোমরা ঈমান আনবে না৷ এরপর তিনি ঐ গাছকে সম্বোধন করে বললেন, যদি আল্লাহ ও বিচার বা পুণরুত্থান দিবসে বিশ্বাস কর এবং আমাকে আল্লাহর রাসূল বলে মনে কর তাহলে আল্লাহর নির্দেশে আমার কাছে চলে আস৷ হযরত আলী (আঃ) আরো বলেন, আল্লাহর কসম, গাছটি শেকড়সহ মাটি থেকে উঠে রাসূল (সাঃ)'র দিকে এগুতে লাগলো৷ এ সময় পাখীদের উড়াল দেয়া বা পাখা ঝাপটানোর শব্দের মতো শব্দ শোনা গেল৷ গাছটি রাসূলে করিম (সাঃ)'র সামনে এসে থেমে যায় এবং গাছটি তার কিছু শাখা-প্রশাখা তাঁর পবিত্র মাথার ওপর মেলে দেয় এবং কিছু শাখা আমার কাঁধের ওপর ছড়িয়ে দেয়৷ আমি রাসূলে খোদা (সাঃ)'র ডান পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম৷ কোরাইশরা এ ঘটনা দেখার পরও ঔদ্বত্য দেখিয়ে বললো, এই গাছকে বল তার অর্ধেক যেন তোমার কাছে আসে এবং অর্ধেক নিজ অবস্থানে থেকে যায়৷ রাসূলে(সাঃ)'র নির্দেশে তাও বাস্তবায়িত হয়৷
এরপরও ঐ কুরাইশরা বললো, গাছের যে অর্ধেক তোমার কাছে এসেছে তা তার বাকী অর্ধেকের কাছে ফিরে গিয়ে আবার পরিপূর্ণ গাছে পরিণত হোক৷ রাসূল (সাঃ)'র নির্দেশে গাছটি আবার পরিপূর্ণ হল৷ আমীরুল মুমিনিন আলী (আঃ) বলেন, এ ঘটনার পর আমি বললাম, এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো খোদা বা প্রভু নেই, হে প্রিয় রাসূল৷ আমিই প্রথম আপনার প্রতি ঈমান এনেছি এবং আমি সাক্ষ্য দিচিছ যে এই গাছের যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তা আল্লাহর নির্দেশে হয়েছে এবং আপনি যে আল্লাহর রাসূল তা প্রমাণের জন্যেই ঘটেছে৷ কিন্তু কোরাইশ লোকগুলো বললো, তুমি তো বিস্ময়কর যাদুকর ও মিথ্যাবাদী৷ এরকম লোক (হযরত আলী আঃ) ছাড়া আর কেউ কি তোমাকে আল্লাহর রাসূল মনে করে? নবী-রাসূলগণের দাওয়াত বা সত্যের আহবান অস্বীকার বা উপেক্ষার ঘটনা শুধু অতীতকালেই সিমীত থাকে নি৷ এখনও অনেক লোক খোদায়ী বাস্তবতা বা সত্যকে বুঝতে অক্ষম৷ আজও এক শ্রেণীর দাম্ভিক ও স্বার্থান্ধ লোক নবী-রাসূলগণকে যাদুকর বলে অপবাদ দেয়৷ তারা এটা বোঝে না যে নবী-রাসূলগণ বাহানাবাজদের কথামত চলেন না৷ নবী-রাসূলগণ দর্শকদের জন্যে বিস্ময়কর কিছু দেখাতে অভ্যস্ত গাঁজাখোরি গল্পের অভিনেতা বা ভেলকীবাজ নন৷ বরং তাঁরা মহান ও এক আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্যে প্রাণ-সঞ্চারী ও জরুরী বার্তা প্রচারের জন্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন ৷ মানুষকে সুপথ দেখানো ও তাদের মুক্তি বা কল্যাণের ব্যবস্থা করাই ছিল নবী-রাসূলগণের মিশনের উদ্দেশ্য ৷

বিশ্বের সমস্ত মুসলমান এ ব্যাপারে একমত যে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবী ও রাসূল এবং ইসলামী বিধান বা শরিয়ত খোদায়ী ধর্মগুলোর মধ্যে পরিপূর্ণতম৷ রাসূল (সাঃ) যে সর্বশেষ নবী এ বিশ্বাস ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বিশ্বাসগুলোর মধ্যে অন্যতম৷ এই বিশ্বাসের সপক্ষে পবিত্র কোরআন ও হাদীসে অনেক স্পষ্ট দলীল-প্রমাণ রয়েছে৷ এ ছাড়াও ইসলামী বিধি-বিধানের প্রকৃতি থেকেও ইসলামী বিধানের স্থায়ীত্ব ও সার্বজনীনতা স্পষ্ট৷ (বাজনা) পবিত্র কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র পর আর কোনো নবী আসবেন না৷সূরা আহযাবের ৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যকার কোনো পুরুষের পিতা নয়, কিন্তু তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী৷ আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে অবহিত৷
অন্যদিকে পবিত্র কোরআনের আয়াতে ইসলামকে চিরন্তন ও সর্বজনীন ধর্ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে৷ ইসলামের বিধানও কোনো স্থান বা সময়সীমার গন্ডীতে সিমীত নয়৷ যেমন, সূরা ফোরক্বানের এক নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, কত মহান তিনি যিনি তাঁর দাসের প্রতি ফোরকান (কোরআন) নাজিল করেছেন, যাতে সে বিশ্বজগতের জন্যে সতর্ককারী হতে পারে৷
মহান আল্লাহ নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন মানুষকে শির্ক বা অংশীবাদিতা থেকে একত্ববাদ এবং অজ্ঞতা থেকে বুদ্ধিবৃত্তি ও কল্যাণকর বা সৌভাগ্যময় জীবনের দিকে আহবান জানাতে৷ যুগে যুগে মানুষের চাহিদার পরিবর্তন ঘটায় ধর্ম-বিধান পরিবর্তিত হয়েছে এবং প্রত্যেক যুগেই মানব জাতির জন্যে নতুন বাণীর প্রয়োজন হয়েছিল৷ অতীতে আসমানী ধর্মগ্রন্থগুলোর বাণী ও শিক্ষা বিকৃত হতো বলেও যুগে যুগে নতুন নবী-রাসূল পাঠাতে হয়েছিল৷ কিন্তু মানবজাতি যখন বিকাশের এমন এক পর্যায়ে উপনীত হল যখন সে খোদায়ী ধর্মের শিক্ষা ও নীতিগুলোকে সংরক্ষণ করতে শিখেছে তথা বিকৃতি ও পরিবর্তনের হাত থেকে সেগুলোকে মুক্ত রাখবার মত সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং সেগুলো খাঁটি, অবিকৃত অবস্থায় প্রচার করতে সক্ষম তখন অতীতের মতো নতুন নবী পাঠানোর প্রয়োজন আর থাকে না৷
পরিপূর্ণতা অর্জনের ক্ষেত্রে মানব জাতিকে এমন এক কাফেলার সাথে তুলনা করা যায় যে কাফেলা তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্যে রওনা দিয়েছে, কিন্তু ঐ লক্ষ্যে পৌঁছার পথ তারা ভালোভাবে চিনে না৷ পথে কারো সাথে দেখা হলে তার কাছ থেকে পথ নির্দেশনা নিয়ে কাফেলা কিছুটা পথ অগ্রসর হয়৷ এরপর নতুন ও অপরিচিত স্থানে পৌঁছার পর নতুন পথ প্রদর্শক ও নতুন দিক নির্দেশনা তার জন্যে জরুরী হয়ে যায়৷ এভাবে ধীরে ধীরে ঐ কাফেলা ব্যাপকতর অভিজ্ঞতা ও উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করতে থাকে এবং এক পর্যায়ে তাকে পুরো পথের মানচিত্র দেয়া হয়৷ আর এই সামগ্রীক মানচিত্র ও পথনির্দেশনা পাবার পর তাদের কাছে ভবিষ্যতের পথও স্পষ্ট হয়ে যায়৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)ও মহান আল্লাহর সর্বশেষ নবী ও রাসূল হিসেবে মানব কাফেলার কাছে সামগ্রীক পথ নির্দেশনা ও সামগ্রীক সৌভাগ্যের পথ তথা ইসলাম ধর্ম উপহার দিয়ে গেছেন৷ আর এ সময় মানব জাতি চিন্তাগত দিক থেকে এই মহান ধর্মের সত্যতা উপলব্ধি কর এবং এ ধর্মের শিক্ষাগুলো রক্ষার মতো পরিপক্কতা অর্জন করেছিল৷
মানুষ চিন্তাগত ও সামাজিক দিক থেকে পরিপক্কতা অর্জন করতে পেরেছে বলেই পবিত্র ইসলাম ধর্ম ও কোরআন বিকৃতি বা পরিবর্তনের শিকার হয় নি৷ এটাও লক্ষ্যনীয় যে ইসলাম ধর্ম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মই সর্বশেষ খোদায়ী ধর্ম হবার দাবী করেনি৷ অতীতের সমস্ত নবী তাঁর পরবর্তী নবীর আগমনের সুসংবাদ দিয়ে যেতেন৷ যেমন হযরত আদম (আঃ) হযরত নূহ (আঃ) ও অন্যান্য আগমন ঘটার সুসংবাদ দিয়ে গেছেন৷ হযরত নূহ (আঃ) ও পরবর্তী নবীগণ তাঁদের পরে হযরত মূসা, হযরত ঈসা ও মুহাম্মাদ (সাঃ)'র আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন৷ কিন্তু পবিত্র কোরআন এবং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র ঘোষণা থেকে স্পষ্ট যে তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবেন না৷
খতমে নবুওত অর্থ ধর্মের সমাপ্তি নয়৷ বরং এ থেকে বোঝা যায় ধর্মের বাস্তবতা অতীতের চেয়েও বেশী স্পষ্ট৷ বর্তমান যুগে মানুষের মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে এমন ধর্ম তথা ইসলাম ধর্মের প্রয়োজনীয়তা অতীতের চেয়েও বেশী অনুভূত হচেছ৷ প্রশ্ন হলো নবুওত তো শেষ হয়ে গেছে, তাহলে মানুষকে কারা পথ দেখাবেন? এর উত্তর হলো, পবিত্র কোরআন অবিকৃত রয়ে গেছে এবং পবিত্র কোরআন ও হাদীস থেকে যুগোপযোগী ব্যাখ্য বা বিধান দিতে সক্ষম আলেমরাই মানুষকে পথ দেখানোর দায়িত্ব পালন করবেন৷
এখানে এটাও মনে রাখা দরকার খোদায়ী ধর্মগুলোর মূল নীতিতে কখনও কোন পার্থক্য ছিল না যেরকম পার্থক্য নেই প্রাকৃতিক আইনে৷ যেমন, মাধ্যাকর্ষণ বা দিন ও রাতের পরিবর্তনের বিধান যেমন চিরকালই অপরিবর্তনীয়, তেমনি ন্যায়বিচারকামীতা, মানবপ্রেম বা পরোপকার, সততা- এগুলো সবযুগেই প্রশংসিত হয়ে আসছে৷ তদ্রুপ মিথ্যাচার, দূর্নীতি, ব্যাভিচার, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা ও অন্যের অধিকার লংঘন করা সব যুগেই মানুষের কাছে নিন্দনীয়৷ মোটকথা ইসলামের মৌলিক বিধানগুলো অপরিবর্তনীয় ও সার্বজনীন এবং সেগুলো স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে সব যুগেই প্রযোজ্য৷ সময় ও যুগের পরিবর্তনের ফলে যেসব নতুন চাহিদা সৃষ্টি হয় ইসলামী আইনে বিশেষজ্ঞ আলেমগণ পবিত্র কোরআন ও হাদীস থেকে সেসবের জন্যে ব্যাখ্যা বা নতুন বিধান দিতে সক্ষম৷ আর এ জন্যেই বলা হয়েছে, আলেমরা নবী-রাসূলের উত্তরাধিকারী৷ পবিত্র কোরআনে মানব জীবনের সমস্ত দিকের ও নতুন যুগের চাহিদার যোগান রয়েছে৷ পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,আমরা তোমার ওপর এ কিতাব অবতীর্ণ করেছি যাতে রয়েছে প্রত্যেক বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও পথ নির্দেশ৷
এভাবে এটা স্পষ্ট বিশ্বনবী (সাঃ)'র ধর্ম ও পবিত্র কোরআন মানুষের জ্ঞানগত ও চিন্তাগত পরিপূর্ণতা সৃষ্টির মাধ্যম৷ এ কারণেই ইসলাম জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং চিন্তা ও গবেষণার ওপর অসীম গুরুত্ব দিয়েছে৷ বিশ্বনবী (সাঃ) শুধু কথা নয় কাজের মাধ্যমেও শিক্ষা ও জ্ঞান চর্চার ওপর অশেষ গুরুত্ব দিয়ে গেছেন৷ জ্ঞানার্জন সংক্রান্ত তাঁর বাণীগুলো জগত-বিখ্যাত৷ যেমন, তিনি বলেছেন, জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক মুসলিম নরনারীর জন্যে ফরজ; জ্ঞান মুমিনের হারানো ধন, যেখানে পাও তা কুড়িয়ে নাও; জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও উত্তম; জ্ঞান অর্জনের জন্যে প্রয়োজনে চীন দেশে যাও৷ জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব সম্পর্কিত রাসূল(সাঃ)'র জীবনের একটি ঘটনা শুনিয়ে আজকের এই আলোচনা শেষ করবো৷
একদিন বিশ্বনবী (সাঃ) মসজিদে ঢুকে মসজিদের লোকদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন৷ তিনি দেখলেন, একদল মুসলমান দোয়া, মোনাজাত এবং মহান আল্লাহর পবিত্র নামগুলোর যিকির আযকারে মশগুল এবং অন্য দলটি শিক্ষাদান, আলাপ আলোচনা ও পড়াশোনায় মগ্ন৷ রাসূল (সাঃ) উভয় গ্রুপের দিকে তাকিয়ে বললেন, এ উভয় দলই কল্যাণ ও সমৃদ্ধির পথে নিয়োজিত, কিন্তু আমি জ্ঞানের আলোচনায় নিয়োজিত দলটিকে বেশী পছন্দ করি৷ এই বলে জ্ঞানী ও গুণীদের দিশারী বিশ্বনবী (সাঃ) জ্ঞান সংক্রান্ত আলোচকদের দলেই যোগ দিলেন যাতে সবাই এটা বুঝতে পারেন যে মহান আল্লাহর কাছে ও তাঁর রাসূলের (সাঃ) কাছে তথা ইসলাম ধর্মে জ্ঞান চর্চা কত বেশী গুরুত্বপূর্ণ!

সত্য ও মিথ্যার মধ্যে দ্বন্দ্বের ইতিহাস মানুষের ইতিহাসের মতোই প্রাচীন এবং এ দ্বন্দ্ব আজও অব্যাহত রয়েছে৷ যেদিন মহান রাববুল আলামীন হযরত আদম (আঃ)কে সৃষ্টি করে তাঁকে সিজদা করতে সব ফেরেশতাকে নির্দেশ দিলেন সেদিন সব ফেরেশতা তাঁকে সিজদা করলেও আযাযিল নামের জিন-যে কিনা তার ব্যাপক এবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে ফেরেশতাক‚লের সর্দার হয়েছিল- সে অহংকারবশতঃ আদম (আঃ)কে সিজদা করা থেকে বিরত থাকে৷ ফলে আজাজিল আল্লাহর অভিশাপের পাত্র হয় এবং এই আজাজিলই অভিশপ্ত শয়তান হিসেবে গোটা মানব জাতির সবচেয়ে বড় শত্রুতে পরিণত হয়৷
শয়তানের দৃষ্টিতে হযরত আদম (আঃ)'র মিশন ও মর্যাদা ছিল তার খোদাদ্রোহী প্রবৃত্তির স্বার্থ ও অহংকারের পথে বাধা৷ তাই সে প্রতিশোধ হিসেবে গোটা মানব জাতিকে বিভ্রান্ত করার শপথ নিয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হয় এবং মানুষের মনে ক‚মন্ত্রণা দিয়ে তাদেরকে বিভ্রান্ত বা পথভ্রষ্ট করাই হয়ে পড়ে তার প্রধান কাজ৷ কিন্তু বিবেকসম্পন্ন ও সচেতন মানুষকে শয়তান কখনও ধোকা দিতে পারে না৷ তাই শয়তান মানবজাতির পথ প্রদর্শক তথা নবী ও রাসূল, মহান ইমাম, ওলি-আওলিয়া ও ঈমানদারদের কাছেও ভিড়তে পারে না৷ অন্যদিকে অসচেতনতা ও ক‚প্রবৃত্তির কাছে বিবেককে নতজানু রাখতে অভ্যস্ত মানুষেরা হয়ে পড়ে শয়তানের সঙ্গী বা বন্ধু৷ এ ধরনের মানুষ ক্ষমতার লোভ বা পার্থিব পদমর্যাদা, ধন-সম্পদ কিংবা অহংকার ও কৃত্রিম বা মিথ্যা গৌরব বজায় রাখার জন্যে সত্যের বা বিবেকের আহবানে সাড়া না দিয়ে সত্যের এবং সত্যের প্রচারক ও অনুসারীদের ঘোর শত্রুতে পরিণত হয়৷ তারা যুক্তির মাধ্যমে সত্যের মোকাবেলা করতে পারে না বলে মিথ্যা প্রচার, অপবাদ, ছল-চাতুরি, যুদ্ধ, সন্ত্রাস এবং বিভিন্ন ধরনে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সত্যের আলো নিভিয়ে দেয়ার জন্যে সর্বাত্মক চেষ্টায় লিপ্ত হয়৷
নবী-রাসূলগণের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় প্রত্যেক নবী ও রাসূল সত্য প্রচার করতে গিয়ে তাগুতি শক্তি বা শয়তানের অনুসারীদের সর্বাত্মক বাধার সম্মুখীন হয়েছেন৷ যেমন, হযরত ইব্রাহীম (আঃ) বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন বাবেলের প্রবল ক্ষমতাধর সম্রাট নমরুদের মাধ্যমে, হযরত মূসা (আঃ) বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন জালিম শাসক ফেরাউনের মাধ্যমে, হযরত দাউদ (আঃ) বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন জালুতের মাধ্যমে এবং ক‚চক্রী ইহুদিরা হযরত ঈসা (আঃ)কে বাধাগ্রস্ত করেছিল৷ তেমনি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)ও বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন আবু জাহেল, আবু লাহাব ও তাদের সঙ্গী বা দলবল, ক‚চক্রী ইহুদি এবং মুনাফিকদের মাধ্যমে৷ কিন্তু অতীতেও ক‚চক্রী ও তাগুতি শক্তির সত্য-ধর্ম বিরোধী সব প্রচেষ্টা, বলপ্রয়োগ এবং ষড়যন্ত্র যেমন ব্যর্থ হয়েছিল, তেমনি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র প্রচারিত সত্য ধর্মের মোকাবেলায়ও সব শয়তানী ও তাগুতি শক্তির পরাজয় ঘটেছিল৷ অবশ্য তা সত্ত্বেও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর প্রচারিত ধর্ম ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুদের ষড়যন্ত্র ও মিথ্যা প্রচার কখনও থেমে থাকে নি৷ ইসলামের সত্যতা ও অকাট্য যুক্তির মোকাবেলায় কাফের, মুশরিক এবং শয়াতানী শক্তির কাছে কোনো গ্রহণযোগ্য যুক্তি ছিল না৷ তাই তারা আশ্রয় নিত মিথ্যচার বা অপপ্রচারের৷
অবশ্য বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে মিথ্যা প্রচার চালানো বা তাঁর সম্পর্কে অপবাদ দেয়া সহজ ছিল না৷ রাসূল (সাঃ)'র নির্মল চরিত্র, সত্যবাদীতা, আমানতদারী এবং অন্যান্য অনেক মহৎ গুণের জন্যে সব মহলেই সুখ্যাতির অধিকারী ছিলেন৷ বিশ্বস্ততা, সত্যবাদীতা ও আমানতদারীর জন্যে সুখ্যাতি থাকায় তাঁকে বলা হতো আল আমীন৷ তাই ইসলাম প্রচার শুরু হবার পরও মক্কার কাফের মুশরিকরা রাসূল (সাঃ)'র কাছে তাদের অর্থ-সম্পদ আমানত হিসেবে জমা রাখতো৷ এই ধারা হিজরতের সময় পর্যন্ত অর্থাৎ দশ বছর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল৷ যাই হোক, কাফের মুশিরকরা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর প্রচারিত সত্য ধর্মের মোকাবেলায় সুপরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক ও প্রচারণাগত ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে৷ এজন্যে তারা কখনও নূরনবী (সাঃ)কে পাগল, মিথ্যাবাদী, কবি ও যাদুকর বলে অপবাদ দিয়েছে৷ রাসূল (সাঃ)'র চাচা আবু লাহাব ওকাজের বাজারে তাঁকে ছায়ার মতো অনুসরণ করতো৷ নূরনবী (সাঃ) যখনই কোনো কথা জনগণের উদ্দেশ্যে বলতেন সাথে সাথে আবু লাহাব বলতো, মুহাম্মাদ মিথ্যা কথা বলছে, তার কথা বিশ্বাস করো না৷
এছাড়াও কাফের মুশরিকরা বিশ্বনবী (সাঃ)'র রেসালত, ওহী নাজিল, মেরাজের ঘটনা, পুনরুত্থান, পরকালের শাস্তি ও পুরস্কার প্রভৃতি বিষয়ের উল্লেখ করে ঠাট্রা-মশকরা করতো৷ তারা বলতো, মুহাম্মাদ কেন বেহেশতের নেয়ামতগুলো পৃথিবীতেই মানুষকে দান করছে না? কখনও কখনও তারা এমন এক তার্কিক ব্যক্তিকে রাসূলে খোদা (সাঃ)র পেছনে লেলিয়ে রাখতো যে তিনি কোথাও ধর্মের বাণী প্রচার শুরু করার সাথে সাথে ঐ তার্কিক অতীতের রাজা-বাদশাহদের গল্প শুরু করে জনগণের মনোযোগ নষ্ট করে দিত৷ নাজর বিন হারেস নামের ঐ কোরাইশ তার্কিক নূরনবী (সাঃ)'র বক্তব্যকে গুরুত্বহীন হিসেবে তুলে ধরার জন্যে বলতো, হে জনতা, আমার কথাও তো মুহাম্মাদের মতোই৷ মুহাম্মাদ অতীতের এমন সব লোকের কথা বলে যারা আল্লাহর আজাব বা ক্রোধের শিকার হয়েছিল৷ আর আমিও এমন সব লোকের কথা বলি যারা ধন-সম্পদের প্রাচুর্যের মধ্যে ডুবে ছিল এবং বহু বছর ধরে পৃথিবীতে শাসন ক্ষমতার অধিকারী ছিল৷
বিশ্বনবী (সাঃ)'র দাওয়াতি মিশনের মোকাবেলায় হুমকী ও অবমাননা এতো ছড়িয়ে দেয়া হয় যে অনেক বিশ্বাসী ব্যক্তির বিশ্বাসে চিড় ধরে এবং অনেকে মনোবল হারিয়ে ফেলেন৷ তাদের কেউ কেউ রাসূলে পাক (সাঃ)কে কাফের মুশরিকদের সাথে আপোষ করার পরামর্শ দিতেন৷ কিন্তু বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সত্যের আহবানের ক্ষেত্রে বা জিহাদের ক্ষেত্রে এক মুহূর্তের জন্যেও দ্বিধান্বিত বা বিচলিত হন নি৷ বরং তিনি দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে মুসলিম সমাজকে ক্ষমতা ও সম্মানের শীর্ষে উন্নীত করেন৷ বিশ্বনবী (সাঃ) যুদ্ধ ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সাফল্য অর্জনের পর অত‚লনীয় সম্মানের অধিকারী হন৷ কিন্তু তখনও ইসলামের শত্রুরা তাঁর সম্পর্কে এবং ইসলাম সম্পর্কে অপবাদ, মিথ্যাচার ও অবমাননা অব্যাহত রাখে৷ ইউরোপে মধ্যযুগে ইসলাম-বিদ্বেষী একদল খৃষ্টান পাদ্রী বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)কে অবমাননা করেছেন৷ এমনকি পাশ্চাত্যের অনেক ইতিহাসবিদও এ ধরনের জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হয়েছেন৷ পাশ্চাত্যে ইসলাম অবমাননার এই ধারা গত শতাব্দীতেও অব্যাহত ছিল৷
ইসলাম-বিদ্বেষী পাশ্চাত্যের কোনো কোনো লেখক এমন কথাও লিখে গেছেন যে মুহাম্মাদ (সাঃ) মূর্তি পূজা করতেন! এ ধরনের বই পাশ্চাত্যের অনেক অমুসলমানকে এখনও বিভ্রান্ত করছে৷ অনেকে ইসলাম সম্পর্কে এমন অপবাদ আজও প্রচার করছেন যে এ ধর্মের অনুসারীরা মক্কায় গিয়ে কাবা ঘরের ও সেখানে রাখা একটি পাথরের পূজা করে থাকে! অথচ কাবা ঘর মুসলমানদের জন্যে এবাদতের দিক-চিহ্নের নির্দেশক বা কেবলা স্বরূপ৷ মুসলমানরা যাতে একই এলাকায় সবাই বিভিন্ন মূখী হয়ে এবাদত না করে সেজন্যে বিশ্বের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত কাবাঘরকে এবাদতের কেবলা বানানো হয়েছে৷ এখানেই ছিল বিশ্বের প্রথম এবাদত ঘর৷ সেই আদি এবাদত-ঘর পুননির্মাণ করেছিলেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)৷ ঐ ঘরের ধবংসাবশেষের একটি পাথর অবশিষ্ট থাকায় মুসলমানরা তা সংরক্ষণ করেছে এবং তা শ্রদ্ধাভরে স্পর্শ করে ও চুমো খায় মাত্র৷ এ পাথরকে ও কাবা ঘরকে কোনো মুসলমান উপাস্য মনে করে না৷ কাবা ঘরকে উপাস্য মনে করলে কোনো মুসলমান পা গলিয়ে সে ঘরের ওপরে উঠে সেখান থেকে আযান দিত না৷
যাই হোক্‌ , বিশ্বনবী (সাঃ)সহ ইসলাম ও মুসলমানদের অবমাননা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জোরদার হয়েছে৷ ক্রমবর্ধমান ইসলামী জাগরণ ঠেকানোর জন্যেই ইসলামের শত্রুরা এ পুরনো কৌশল জোরদার করেছে৷ পশ্চিম গণমাধ্যমগুলো ইসলামকে এবং বিশ্বনবী (সাঃ)সহ মুসলমানদের সন্ত্রাসী বলে অপবাদ দিচেছ৷ পাশ্চাত্য বিশ্বনবী (সাঃ)সহ মুসলমানদের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের ইমেজ বা চেহারাকে কালিমালিপ্ত করার প্রচেষ্টাকে যেন নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে৷ আর এ জন্যেই মুসলমান নামধারী ভাড়াটে লেখক সালমান রুশদীকে দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে "স্যাটানিক ভার্সেস" বা শয়তানের পদাবলী নামক বই৷ ইসলাম ও রাসূল (সাঃ)কে অবমাননাকারী এই লেখককে বৃটিশ সরকার নাইট উপাধি দিয়েছে৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশও মূর্তাদ সালমান রুশদীকে সমর্থন জানিয়েছে অথবা তাকে পুরস্কার দিয়েছে৷
পাশ্চাত্যের ইসলাম-বিদ্বেষী নীতির অব্যাহত ধারায় ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ডেনমার্কের একটি পত্রিকায় বিশ্বনবী (সাঃ)'র ১২টি ব্যাঙ্গচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে৷ বাক স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে ইউরোপের আরো ক'টি দেশের বেশ কিছু পত্র পত্রিকা এ ছবিগুলো পুণঃপ্রচার করে৷ রাসূল (সাঃ)কে অবমাননাকারী ডেনমার্কের ঐ সাংবাদিককেও পুরস্কৃত করা হয়৷
বিশ্বের সচেতন জনগণের কাছে এটা স্পষ্ট যে ইসলামের ক্রমবর্ধমান আকর্ষণ প্রতিরোধের জন্যেই পাশ্চাত্য পরিকল্পিতভাবে রাসূলে পাক (সাঃ)'র অবমাননা করে যাচেছ৷ ইসলাম অবমাননাকারী মহলগুলো ভালো করেই জানে, ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম বা মতাদর্শ মানুষের কাছে প্রাণবন্ত নয় এবং তাদের সমস্যাগুলোর সমাধানের কোনো দিক নির্দেশনাও ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম বা মতবাদের নেই৷ এ অবস্থায় ইসলামী জাগরণের জোয়ার ও এ ধর্মের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় পাশ্চাত্য আতঙ্কিত৷ লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হলো পাশ্চাত্যের তরফ থেকে ইসলাম ও বিশ্বনবী (সাঃ)'র এতো অবমাননা এবং এ ধর্মের বিস্তার প্রতিরোধের জন্যে এতো অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও বিশ্বনবী (সাঃ)'র প্রতি জনগণের সম্মান কমেনি বরং বেড়েছে৷ একইসাথে ইসলামের প্রতি জনগণের আকর্ষণও বৃদ্ধি পেয়েছে৷ অন্যকথায় বিশ্বনবী (সাঃ)'র পুত-পবিত্র চরিত্র এবং তাঁর অসাধারণ মহতী গুণাবলীকে কালিমালিপ্ত করার জন্যে আধুনিক যুগের আবু জাহেল ও আবু লাহাবদের ষড়যন্ত্রগুলো ব্যর্থ হয়েছে৷ তাই আমরা দেখছি অনেক অমুসলিম মনীষী বিশ্বনবী (সাঃ)কে সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বলতে কুন্ঠিত হন নি৷ মাইকেল এইচ হার্টের মতো আধুনিক যুগের মার্কিন মনীষীও বিশ্বের ইতিহাসের একশ জন সেরা মহামানবের তালিকায় বিশ্বনবী (সাঃ)'কে এক নম্বরে বা সর্বাগ্রে স্থান দিতে বাধ্য হয়েছেন৷ আসলে মানুষকে চিরকাল অজ্ঞ ও বোকা বানিয়ে রাখা যায় না এবং পবিত্রতা, সত্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দীপ্তিও কখনও ঢেকে রাখা যায় না৷ তাই বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের অত্যুজ্জ্বল দীপ্তিও ঢেকে রাখা কখনও সম্ভব হয় নি এবং কখনও তা সম্ভব হবে না ৷ যারা বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবকে অবমাননার বৃথা চেষ্টায় লিপ্ত তারা আসলে নিজেদেরই ছোট করছে এবং তারাই অতীতের মতোই ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে৷

ইসলামের শত্রুরা কেবল অন্ধ একগুয়েমী ও হিংসার কারণেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর প্রচারিত পবিত্র ইসলাম ধর্মের অবমাননা করছে৷ পাশ্চাত্যের তরফ থেকে ইসলাম ও বিশ্বনবী (সাঃ)'র এতো অবমাননা এবং এ ধর্মের বিস্তার প্রতিরোধের জন্যে এতো অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও মানবজাতির সর্বোত্তম কল্যাণের দিশারী বিশ্বনবী (সাঃ)'র প্রতি জনগণের সম্মান কমেনি বরং তা বেড়েই চলেছে৷ একইসাথে ইসলামের প্রতি জনগণের আকর্ষণও বৃদ্ধি পাচেছ৷ অন্যকথায় বিশ্বনবী (সাঃ)'র পুত-পবিত্র চরিত্র এবং তাঁর অসাধারণ মহতী গুণাবলীকে কালিমালিপ্ত করার জন্যে আধুনিক যুগের আবু জাহেল ও আবু লাহাবদের ষড়যন্ত্রগুলো অতীতের মতোই ব্যর্থ হয়েছে৷ যেসব লোক অপরিচছন্ন ও সংকীর্ণ চিন্তাধারায় অভ্যস্ত এবং নৈতিকতা ও যুক্তির ধার ধারে না, তারা সাধারণতঃ অন্যদেরকেও বিশেষ করে মহাপুরুষকেও নিজের মতোই খারাপ, যুক্তি-বিরোধী ও অপবিত্র মনে করে৷ ইরানী প্রবাদবাক্যে বলা হয় একজন অবিশ্বাসী বা কাফের অন্যদেরও কাফের মনে করে৷ অন্যদিকে যারা সত্যসন্ধানী, যুক্তিবাদী ও চিন্তাশীল তারা মানব জাতির পথ প্রদর্শক ও মহান ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা করে থাকেন৷ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অনেক অমুসলিম লেখক, গবেষক, মনিষী ও চিন্তাবিদ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র সম্পর্কে নিরপেক্ষ বিচার-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রকৃত বা বস্তুনিষ্ঠ এবং বিদ্বেষমুক্ত মতামত তুলে ধরেছেন৷ গত অনুষ্ঠানে আমরা এ ধরনের কয়েকজন খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বের মতামত তুলে ধরেছি৷ আজও আমরা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র নূরাণী ও তুলনাহীন ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধরনের আরো কয়েকজন খ্যাতনামা অমুসলিম ব্যক্তিত্বের মতামত তুলে ধরবো৷ পাশ্চাত্যের বিখ্যাত ঐতিহাসিক আর. এফ. বুডলি মুহাম্মাদ (সাঃ)'র জীবনী শীর্ষক বইয়ে মহান আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল (সাঃ) সম্পর্কে মিথ্যা অভিযোগ ও অপবাদের নিন্দা করে লিখেছেন, মুহাম্মাদের জীবনী সংক্রান্ত একটি বই পড়েছি৷ এ বইয়ের লেখক যে কখনও বৃটেনের বাইরে পা রাখেন নি তা খুবই স্পষ্ট৷ কারণ, তিনি শুধু গীর্যাকে রক্ষার জন্যেই লিখেছেন৷ তিনি তার তিনশ পৃষ্ঠার বইটিকে অন্যায্য কথা দিয়ে কলংকিত করেছেন৷ এ লেখক তার বইটিতে মুহাম্মাদের নাম নিতে গিয়ে দজ্জাল শব্দটি ছাড়া অন্য কিছু ব্যবহার করেন নি৷ অথচ লেখক এ বিষয়েরও কোন ব্যাখ্যা দেন নি যে এরকম একজন ব্যক্তি কী করে মানবজাতির অগ্রগতির জন্যে এত উন্নত ও সমৃদ্ধ বিধান দিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন? তিনি কিভাবে এমনসব মানুষকে গড়ে তুলেছেন যারা অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে এক বিশাল ও উন্নত সভ্যতার গোড়াপত্তন করতে এবং প্রথম দিকেই বড় বড় জাতিগুলোকে নিজেদের সাথে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন? মিস্টার বুডলি আরো লিখেছেন, মরূচারী এবং বেপরোয়া জীবনে অভ্যস্ত দূর্দান্ত আরবদের অনুগত করতে পারাটা মুহাম্মাদের অন্যতম বিস্ময়কর সাফল্য৷ এ বিষয়টিকে তার সবচেয়ে বড় মো'জেজা বা অলৌকিক ঘটনাগুলোর সমতুল্য বলা যায়৷ তিনি সব আরব গোত্রকে বিস্ময়কর সূত্রে ঐক্যবদ্ধ করেন৷ মুহাম্মদের জীবনী নিয়ে চিন্তা করলে চিন্তাশীল ব্যক্তি মাত্রই তাঁর প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার ব্যাপারে বিস্ময়ে হতবাক হতে বাধ্য এবং তারা মুহাম্মাদকে এক চিরঞ্জীব ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখতে পান৷
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে বৃটেনের চিন্তাবিদ টমাস কার্লাইল বলেছেন, বর্তমান যুগের একটা বড় ত্রুটি হলো এ যুগের সুসভ্য মানুষ এমন কিছু লোকের কথা শুনছে যারা মনে করেন ইসলাম মিথ্যা ধর্ম এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) একজন প্রতারক! এ ধরনের ভিত্তিহীন ও লজ্জাজনক বক্তব্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার সময় এসেছে৷ কারণ যে ধর্ম-বিধান ও মিশন মুহাম্মাদ (সাঃ) এনেছেন তা শত শত বছর ধরে এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকার মতো আলো ছড়িয়ে দিচেছ৷ ভ্রাতৃবৃন্দ! আপনারা কি কখনও এমন কাউকে দেখেছেন যে একজন মিথ্যাবাদী ব্যক্তি একটি নতুন ধর্ম প্রনয়ন করতে এবং একই সাথে ঐ ধর্মকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে? প্রভুর শপথ, এ ধরনের অপবাদ খুবই অদ্ভুত বা বিস্ময়কর! কারণ একজন অজ্ঞ ব্যক্তি একটি ঘর নির্মাণেরও ক্ষমতা রাখে না, অথচ এমন অজ্ঞ ব্যক্তি ইসলামের মতো এক ধর্মকে মানব সমাজে কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হলেন? কার্লাইল আরো লিখেছেন, এটা খুবই বড় ধরনের সমস্যা ও দুঃখ যে বিশ্বের জাতিগুলো যুক্তি ও প্রজ্ঞা ছাড়াই এ ধরনের অপবাদ মেনে নিচেছ৷ আমি বলবো এটা অসম্ভব যে এই মহান ব্যক্তি তথা হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বাস্তবতা বা সত্য-বিরোধী কথা বলেছেন৷ তাঁর জীবন-ইতিহাসে দেখা যায় তিনি যৌবনকাল থেকেই জ্ঞানী ও চিন্তাশীল ছিলেন৷ রাসূলে পাক (সাঃ)'র সমগ্র জীবন ও সুন্দর গুণাবলীসহ তাঁর সমস্ত তৎপরতা ছিল সত্য ও পবিত্রতা ভিত্তিক৷ আপনারা তাঁর বাণীর দিকে লক্ষ্য করুন- তাঁকে কবি বা নবী যা-ই মনে করুন- তাঁর বাণীকে কি অনুপ্রেরণা ও খোদায়ী প্রত্যাদেশ মনে হয় না? এই মহান ব্যক্তি অস্তিত্বের অসীম উৎসের বার্তাবাহক বা রাসূল যিনি মানুষের জন্যে বার্তা বয়ে এনেছেন৷ বিধাতাই এই মহাপুরুষকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা শিখিয়েছেন৷" অমুসলিম চিন্তাবিদ বা মনীষীরা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে এটি উল্লেখ করেছেন যে মূলতঃ অসাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং উন্নত ধর্মের কারণেই রাসূলে পাক (সাঃ)'র নাম বিশ্বে অমরত্ব বা স্থায়ীত্ব লাভ করেছে৷ পবিত্র কোরআন ও এর প্রাণসঞ্জীবক শিক্ষা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র জীবন ও আত্মার মর্মমূলে প্রবেশ করেছিল এবং তিনি ছিলেন আদর্শ ও সর্বোত্তম মানুষের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত৷ রাসূলে পাক (সাঃ) তাঁর বিচক্ষণ দৃষ্টির মাধ্যমে এ বিশ্ব জগতের বাহ্যিক পর্দা বা আবরণের আস্তর ভেদ করে বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারতেন৷ তিনি ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপূর্ণতা ও সচেতনতার অধিকারী৷ তাঁর চিন্তাভাবনা ছিল পুরোপুরি যথাযথ এবং তিনি মানবজাতির মুক্তির জন্যে সবচেয়ে ভালো কর্মসূচী উপহার দিয়েছেন৷ তাঁর অনুসারীরা ছিল নিষ্ঠাবান ও পবিত্র৷ পবিত্র অন্তর ও আলোকিত চেহারা নিয়ে তারা রাসূলে পাক (সাঃ)'র পাশে বসবাস করতেন৷ আসলে বুদ্ধিবৃত্তি বা বিবেকের সাথে ইসলামের সঙ্গতি থাকাতেই এই মহান ধর্মের আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত কল্যাণ মানুষকে প্রভাবিত করেছে৷ বিখ্যাত ইংরেজ চিন্তাবিদ জন ডেভেনপোর্ট বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ An apology for Muhammad And Quraan,বা মুহাম্মাদ (সাঃ) ও কোরআনের কাছে ক্ষমা শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, যারা ইসলামের নবী (সাঃ) সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টির চেষ্টা করছে তাদের জেনে রাখা উচিত বৃহৎ লক্ষ্য অর্জনের জন্যে তাঁর অধ্যাবসায় ও দৃঢ়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ আর এ বিষয়টিকে তিনি তাঁর জীবনের লক্ষ্যবস্তুতে বা টার্গেটে পরিণত করেছিলেন এবং তা বাস্তবায়নে অসাধারণ জোর দিতেন৷ আর এ কারণে সবাই তাঁর প্রশংসা করতে বাধ্য হন৷ এছাড়াও যারা মনে করেন, ইসলামের নবী (সাঃ) তরবারীর মাধ্যমে তাঁর ধর্ম ছড়িয়ে দিয়েছেন, তারা মারাত্মক ভুল করছেন৷ কারণ সকল পর্যবেক্ষক ও চিন্তাবিদ অত্যন্ত স্পষ্ট ও নিরপেক্ষভাবে এ সত্যের স্বীকৃতি দিয়েছেন যে মুহাম্মাদ (সাঃ) রক্তপাত বা সহিংসতার অবসান ঘটিয়েছিলেন৷ তিনি মানুষকে দেব-দেবী বা মূর্তির জন্যে হত্যার বা উৎসর্গ করার প্রথা বাতিল করে মানব জাতির জন্যে নামাজ ও যাকাতের প্রথা চালু করেছেন এবং তাঁর ধর্ম স্থায়ী যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিবর্তে মানুষের আত্মায় সঞ্চারিত করেছে কল্যাণকামীতা, মানবপ্রেম ও সামাজিক গুণাবলীর চেতনা৷ জন ডেভেনপোর্ট তার বইয়ের একটি অধ্যায়ে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র ওপর আরোপিত অপবাদগুলোর জবাব দিয়েছেন৷ তিনি এক জায়গায় লিখেছেন, হিজাজ বা গোটা আরব ভূখন্ড মূর্তি পূজার মতো ক‚প্রথায় নিমজ্জিত ছিল৷ মুহাম্মাদ (সাঃ) এই ভূখন্ডে আমূল ও স্থায়ী সংস্কার সাধনের মতো অসাধ্য সাধন করেন৷ তিনি শিশুদের হত্যা করা ও কণ্যা শিশুদের জীবন্ত কবর দেয়াকে নিকৃষ্ট ও অপছন্দনীয় বলে মনে করতেন এবং মদপান ও জুয়া খেলাকে নিষিদ্ধ করেন৷ আর এ ধরনের ব্যক্তিত্বের রেসালাত কি তার নিজের আবিষকৃত হতে পারে? মুহাম্মাদ (সাঃ) কখনও দুনিয়ার ক্ষমতা ও দুনিয়াবী শান-শওকতের প্রত্যাশী ছিলেন না৷ তিনি মানুষকে ন্যায়সঙ্গত আচার-আচরণ করতে বলতেন৷ তিনি মানবিকতা, দয়া ও উদারতার প্রেমিক ছিলেন৷ নিঃসন্দেহে পৃথিবী মুহাম্মাদের (সাঃ) মতো পবিত্রতম ও দূর্লভ ব্যক্তিত্ব আর সৃষ্টি করতে পারে নি৷ তাঁকে পৃথিবীর সবচেয়ে মহত ও অতুলনীয় মহান ব্যক্তিত্ব বলে মেনে নেয়া উচিত এবং পৃথিবী তাঁর এই মহত্তম সন্তানকে নিয়ে সব সময়ই গর্ব করতে পারে৷ শ্রোতা ভাই-বোনেরা আমরাও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র শানে মহান আল্লাহর পর সবচেয়ে সুন্দর ও সবচেয়ে উপযোগী প্রশংসা নিবেদন করে আজকের এই আলোচনা শেষ করছি এবং সত্যের পথে চলার ব্যাপারে রাসূলে পাক (সাঃ)'র মদদ বা সাহায্য কামনা করছি৷

ইসলাম ধর্মের আহবান জানাতে গিয়ে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর সঙ্গী-সাথীগণকে ঠাট্রা-বিদ্রুপ থেকে শুরু করে অশেষ লাঞ্ছনা, নির্যাতন এবং এমনকি শাহাদতের মতো সর্বোচচ ত্যাগও স্বীকার করতে হয়েছে৷ আসলে ন্যায়বিচার, সাম্য, সত্য ও মুক্তির আহবান শোষক, নির্যাতক ও মানুষের ওপর প্রভুত্বের দাবীদার কায়েমী স্বার্থবাদীদের জন্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হত৷ তাই তাঁরা সত্যের আহবান প্রতিরোধের জন্যে সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে-এটাই স্বাভাবিক৷ নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ও তাঁর সঙ্গী-সাথীরা যদি সত্যের আহবান জানাতে গিয়ে এত ব্যাপক বা অস্বাভাবিক নির্যাতন ও প্রতিরোধের শিকার না হতেন তাহলে সেটাই হতো অস্বাভাবিক ও বিস্ময়ের ব্যাপার৷ সত্যের আহবান যত সুদৃপ্ত ও যত খাঁটি হয়ে থাকে মিথ্যার বা বাতিলের প্রতিরোধ এবং নির্যাতনও তত কঠোর বা নির্মম হয়ে থাকে৷ সত্যের পথকে চেনার ও বোঝার এটাও অন্যতম পন্থা৷ তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো সত্যের আহবান জানাতে গিয়ে তিলে তিলে অসহ যন্ত্রণা, নির্যাতন এবং সঙ্গী-সাথী বা পরিবারের ঘনিষ্ঠ সহযোগীর শাহাদতের মতো দূঃসহ পরিস্থিতির মধ্যেও দয়ার অতলান্ত সাগর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বিভ্রান্ত ও বিরুদ্ধবাদী জনতাকে অভিশাপ দেননি৷ বরং তিনি মহান আল্লাহর দরবারে তাদের জন্যে দোয়ার হাত প্রসারিত করে আল্লাহর দরবারে এ প্রার্থনা জানাতেন যে, হে আল্লাহ, এরা বোঝে না, তুমি তাদের সুপথ দেখাও বা বোঝার তৌফিক দান কর৷ তায়েফে ইসলামের আহবান জানাতে গিয়ে পাথর বৃষ্টির শিকার হবার পরও চরম ধৈর্য ধারণ করেছিলেন আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল৷ তাঁর ওপর নির্যাতন এত চরমে উঠেছিল যে ফেরেশতারা পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছিল, হে আল্লাহর সর্বশেষ রাসূল! আপনি যদি আদেশ করেন তাহলে এ অবাধ্য জনগণের ওপর পাহাড় চাপিয়ে দিয়ে তাদের ধবংস করে দেব৷ কিন্তু দয়ার অতলান্ত সাগর নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) তাদের অভিশাপ না দিয়ে তাদের মঙ্গল কামনা করেছিলেন৷ তিনি বলেছিলেন, এরা মুসলমান না হলেও এদের সন্তানরা হয়তো একদিন মুসলমান হবে৷ রাসূলে পাক (সাঃ) জানতেন আল্লাহর ধর্ম এক সময় বিজয়ী হবেই৷ যে মক্কার লোকেরা তাঁর ওপর এত নৃশংস নির্যাতন চালিয়েছিল মক্কা বিজয়ের সময় তিনি তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন৷ আর এই ক্ষমাশীলতা ও মহানুভবতা দেখে দলে দলে মক্কার কাফের ও মুশরিকরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে৷ তাই এটা স্পষ্ট তরবারীর মাধ্যমে নয়, বরং পবিত্র কোরআনের বাণী ও বিশ্বনবী (সাঃ)'র অবিশ্বাস্য মহানুভবতা, বিস্ময়কর সততা, অশেষ খোদাভীরুতা, অভূতপূর্ব চারিত্রিক সৌন্দর্য ও অনুপম আচার-আচরণে আকৃষ্ট হয়েই তৎকালীন আরব ভূখন্ডের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল৷ দুঃখের বিষয় হলো সভ্যতার বিশ্বের উজ্জ্বলতম আদর্শের অধিকারী নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) এই আধুনিক যুগেও এক শ্রেণীর কায়েমী স্বার্থবাদী ও বিবেকহীন লোকদের বিদ্বেষী প্রচারণা ও অবমাননার শিকার হচেছন৷ চলতি বছরে ইরানের অন্যতম সেরা গ্রন্থ হিসেবে নির্বাচিত বই "নবী-চরিত, বাস্তব যুক্তির লেখক অধ্যাপক ডক্টর মোস্তফা দেলশাদ তেহরানী এ সম্পর্কে বলেছেন, ইন্টারনেট ও কম্পিউটার প্রযুক্তির মতো তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক অগ্রগতির এই যুগে বিভিন্ন গণমাধ্যম বিশ্ববাসীর কাছে অনেক বাস্তবতা তুলে ধরতে সক্ষম৷ কিন্তু এসব গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রকরা বিশ্ববাসীকে কোনো কোনো বিশেষ বিষয়ে অজ্ঞ রাখতে চান৷ যেমন, এসব গণমাধ্যম ইসলাম ও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে সত্যের ব্যাপক বিকৃতি ঘটিয়ে যাচেছ৷ সত্যি বলতে কি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) আমাদের এই যুগে অতীতের চেয়েও বেশী মজলুম বা জুলুমের শিকার হচেছন৷ বিভিন্ন মিথ্যা তথ্য ও সূত্রের ওপর ভিত্তি করে কোনো কোনো ওয়েবসাইট বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র নামে এমনসব অপবাদ রটনা করছে যা পুরোপুরি অবাস্তব৷ এ ধরনের রটনা খুবই যন্ত্রণাদায়ক৷ আধুনিক যুগের মানুষকে এটা যথাযথভাবে বুঝতে হবে যে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র অবমাননা কেবল একজন পবিত্র মানুষের অবমাননা নয়৷ বরং তাঁর অবমাননা মানুষের চিরকাংখিত সব ধরনের মহত্ত, সৌন্দর্য ও সৎগুণাবলীকে পর্যুদস্ত করার সমতুল্য৷ ডক্টর মোস্তফা দেলশাদ তেহরানী আরো বলেছেন, নৈতিকতা ও মানবতার এই সীমাগুলোকে বিপর্যস্ত করার মাধ্যমে নৈরাজ্য প্রতিষ্ঠার পথই সুগম করা হচেছ৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) গোটা মানবজাতির সম্পদ এবং তিনি মানবজাতির কাছে যা উপহার দিয়েছেন তাও গোটা মানবজাতির সম্পদ৷ তাই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র অবমাননার ব্যাপারে বিশ্বের সমস্ত শিক্ষিত মানুষ ও মুক্তমনা মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত এবং তাদের উচিত এ মহামানবের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ও পবিত্রতার সীমানা সংরক্ষণ করা এবং তাঁর মহান শিক্ষাগুলোকে ছড়িয়ে দেয়া৷ যদিও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) একটি নির্দিষ্ট স্থানে ও যুগে বসবাস করেছিলেন, কিন্তু তিনি মাটির মানুষ হয়েও স্বর্গীয় সুষমার অধিকারী ছিলেন এবং তিনি ছিলেন স্থান ও কালের গন্ডীর উধের্ব৷ বিশ্বনবী (সাঃ) আজও মানবজাতির পথপ্রদর্শক৷ আর এ জন্যেই পবিত্র কোরআনের সূরা আহজাবে তাঁকে সব মানুষের জন্যে আদর্শ বলা হয়েছে এবং মানুষ যদি তাঁর আদর্শের অনুসারী হয় তাহলেই তারা মুক্তি পাবে৷ ইরাকের বিশিষ্ট অধ্যাপক ও গবেষক হুজ্জাতুল ইসলাম বাক্বের শারীফ আল ক্বোরাইশী বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র ব্যক্তিত্ব ও বৈশিষ্ট সম্পর্কে বলেছেন, রাসূলে পাক (সাঃ) সদাচারণ ও উন্নত নৈতিক গুণাবলীর দিক থেকে নজিরবিহীন, তিনি ছিলেন মহান আল্লাহর নিদর্শন৷ তাঁর ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দৃঢ় ও অদম্য ইচছা-শক্তি৷ ইসলামের প্রাথমিক দিনগুলোতে অজ্ঞতার আঁধারে নিমজ্জিত শক্তিগুলো রাসূলে পাক (সাঃ)'র মোকাবেলায় সমস্ত সামর্থ নিয়ে সংঘবদ্ধ এবং নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল৷ কিন্তু বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) বলেছিলেন, তোমরা যদি আমার এক হাতে সূর্য এবং অন্য হাতে চাঁদ এনে দাও তাহলেও আমি সত্য ধর্ম প্রচারের এ দায়িত্ব ত্যাগ করবো না৷ এ ধরনের অদম্য ইচছাশক্তি ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞার মাধ্যমেই বিশ্বনবী (সাঃ) ইতিহাসের গতি বদলে দিয়েছিলেন এবং পাপ-পংকিলতা ও লক্ষ্যহীনতায় মগ্ন সমাজকে সৌন্দর্য, কল্যাণ ও প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ জীবনের দিকে পরিচালিত করেন৷ বিখ্যাত অধ্যাপক ও গবেষক ডক্টর রহীমপুর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)'র প্রতি বিদ্বেষী আচরণ সম্পর্কে বলেছেন, নূরনবী (সাঃ) সম্পর্কে সন্দেহবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল বা নেতিবাচক নীতি সেই জাহেলী যুগ থেকেই প্রচলিত ছিল৷ বিদ্বেষী এই নীতি পরবর্তিতে খৃষ্টান মিশনারীদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় এবং এই ধারা আজও বিভিন্ন পন্থায় ও কলেবরে অব্যাহত রয়েছে৷ সেই যুগে রাসূল (সাঃ)কে অস্বীকার করা হতো৷ আজ তারা বলছে ইসলাম ধর্মের ভাষা সভ্যতা-বর্জিত বা সেকেলে৷ অতীতে তারা বলতো, মুহাম্মাদ (সাঃ) যাদুকর! আজ ইসলাম ও সত্যের বিরোধীরা বলছে, নবীরা ছিলেন ক্যারিজমাটিক তথা জনগণের মধ্যে গভীর প্রভাব সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব এবং তারা সমাজকে সংস্কার করতেন৷ অতীতে তারা রাসূলে খোদা (সাঃ)'র নবুওত ও রেসালাতকে অস্বীকার করতো৷ বর্তমানে তারা প্রতারণামূলক শব্দের আশ্রয় নিয়ে একই অপবাদ দিচেছ৷ নবী-রাসূলগণ ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু বলে তারা ঠিক এখানেই আঘাত করছে৷ ডক্টর রহীমপুর আরো বলেন, নবী-রাসূলগণ মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় সামাজিক, জ্ঞানগত ও নৈতিক বিপ্লবগুলোর উৎস৷ তাই সামাজিক ও চিন্তাগত সমস্ত সাধনা বা প্রচেষ্টা ও সংঘাত নবী-রাসূলগণের আহবানকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে৷ কেউ যদি নবুওতের মূল নীতি বা ধারণাকেই অগ্রাহ্য করতে পারে, কিংবা নবী-রাসূলগণের ব্যক্তিত্বকে এমনভাবে বিকৃত করে তুলে ধরতে পারে যে তাঁদের বক্তব্য ও আচার-আচরণ মানুষের জন্যে আদর্শস্থানীয় বলে বিবেচিত না হয় তাহলে ধর্ম বলে ভালো কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকে না৷ এ অবস্থায় ধর্মের অর্থ হবে অস্পষ্টতা ও কিছু ব্যক্তির খেয়ালীপনা মাত্র এবং ধর্ম হয়ে পড়বে মানুষের জীবনে প্রভাবহীন একটি বিষয়৷ কিন্তু নবী-রাসূলগণ এসেছেন অজ্ঞতা, শির্ক, জুলুম, অবিচার ও অন্যের অধিকার লংঘন প্রতিরোধ করতে এবং মানুষের আচার-আচরণের ধারায় বিপ্লব সৃষ্টি করতে৷ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ছিলেন নবীগণের মধ্যেও সবচেয়ে কোমল ও দয়াদ্র হৃদয়ের অধিকারী৷ মানব-ইতিহাসে তাঁর মতো পবিত্র ও উদার চিত্তের মানুষ আর কখনও আসেনি এবং ভবিষ্যতেও আসবে না৷
ডক্টর রহীমপুর আরো বলেন, আর এসব কারণেই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর সর্বশেষ দূত বা প্রতিনিধি৷ বর্তমান ও ভবিষ্যতেও মানুষের জীবনের সব ধরনের সমস্যা সমাধানের চাবি রয়েছে তাঁরই জীবনাদর্শে৷ তিনি ইতিহাসের সব যুগের জন্যে এবং সব মানুষের জন্যেই রাসূল৷ মানুষের জীবনের সবচেয়ে ক্ষুদ্র বা খুটিনাটি দিক থেকে শুরু করে পরকালীন, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক জীবন থেকে তিনি বিচিছন্ন নন৷ নূরনবী (সাঃ) মানবতা, ন্যায়বিচার ও যুক্তির ওপর জোর দিয়ে মানব জাতির জন্যে সবচেয়ে ভালো পথ প্রদর্শন করেছেন৷ মহান আল্লাহর অশেষ শোকর, আমরা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে আলোচনার সুযোগ পেয়েছি৷ তিনি ছিলেন এমন একজন মহামানব যিনি মানুষকে ভ্রাতৃত্ব ও দয়া শিখিয়েছেন যে মানুষ ছিল সহিংসতা ও নৃশংসতায় অভ্যস্ত৷ ইসলামের শ্রেষ্ঠতম এই ব্যক্তিত্বের প্রতি রইলো আমাদের অসংখ্য সালাম ও দরুদ৷ পবিত্র কোরআনের ভাষায়- মহান আল্লাহ তাঁকে অনুগ্রহ করেছেন ; ফেরেশতাগণও তাঁর জন্যে অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন৷ হে মুমিন বা বিশ্বাসীগণ! তোমরাও নবীর জন্যে অনুগ্রহ প্রার্থনা কর এবং তাঁকে উত্তমরূপে অভিবাদন কর৷ (সূরা আহজাব-৫৬)# (সমাপ্ত )

মন্তব্য

একটি মন্তব্য

* একটি তারকা চিহ্নিত ফিল্ড অবশ্যই মান থাকা আবশ্যক।